পাহাড়ের এক বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধার কথা…..

chttimes24-kalek pic-

॥ আলমগীর মানিক ॥
শরীরে যৌবনের জোয়ার বইছে। ২৩ বছর বয়সের টগবগে যুবক আব্দুল খালেক। বাবা-মা মারা যাওয়ায় একমাত্র বোন-দুলাভাইয়ের সাথে থাকতেন রাঙামাটির মগাছড়িতে। ১৯৭১ সালে দেশ মাতৃকার টানে দলে দলে সকলেই চলে যাচ্ছে ট্রেনিং গ্রহনের জন্য।

ঘরে থাকা একমাত্র বোন ও দুলাভাইয়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নিজেও অন্য সকলের ন্যায় চলে গেলেন। মুক্তিযদ্ধে অংশ নিয়ে প্রথম কাজটি করেন, চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটিতে টানা টেলিফোন লাইনের তার কেটে দেওয়ার মাধ্যমে। রাঙামাটির সাথে টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

এরপর ভারতের পালাটানা ক্যাম্পে ১১ নং সেক্টরে কমান্ডার সর্দার জহিরুল আনোয়ারে কাছে প্রশিক্ষন নিয়ে দেশে ফিরে আসি। চট্টগ্রামের মিরসশ্বরাইয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই। পরে আমি সীতাকুন্ডে ১৩ দিন ধরে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে ভিক্ষুক সেজে-কখনোবা বোবা’র অভিনয় করে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাই।

পরে ইন্দ্রিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারতীয় যৌথবাহিনী পতেঙ্গাতে তুমুলভাবে বোম্বিং শুরু করলে আমিসহ আমাদের দলটি স্থল যুদ্ধে অংশ নিই। এই যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলেও আমিসহ কয়েকজন বেচে যাই।

মুক্তিযুদ্ধে থাকা কালীন সময়ে রাঙ্গুনিয়াস্থ রাজানগরের কোব্বাত চৌধুরী চেয়ারম্যান রাজাকারে ভর্তির জন্য আমাকে ও আমার তালতো ভাইকে ধরে নিয়ে যেতে লোক পাঠান। কিন্তু আমাদেরকে নাপেয়ে তারা আমার একমাত্র ভাগিনাকে ঘরের মধ্যে আগুনদিয়ে পুড়িয়ে ও দুলাভাইকে গুলিকরে মেরে ফেলে।

এসময় আমার বোনকে তুলে নিয়ে যায় কোব্বাতের লোকজন। আমি দেশে আসলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার পরিবারের খবর পেয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে যান তার বাসায়। পরে সেখানে আমার হাতে তিন হাজার টাকা দিলে আমি তা গ্রহণ করিনি। সেসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, কর্নেল ওসমানী, কর্ণেল তাহের, মেজর তাহের, খালেদ মোশারফ, মেজর জলিল, মেজর জিয়াউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

পরে আমাকে সেখানেই বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন এলাকায় গিয়ে যুদ্ধ করো। তখন আমি চট্টগ্রামের শুনে কর্ণেল তাহের আমাকে তুলে দিলেন, সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমানের হাতে। তিনি আমাকে সেনবাহিনীর নায়েক ইব্রাহিমের হাতে তুলে দিয়ে নিজে চলে গেলেন ফটিকছড়িতে চলে গেলেন। আমাকে নেওয়া হলো মিরেসরাইয়ে।

এরপর দেশ স্বাধীন হলো সবাই নিজ নিজ এলাকা চলে গেলেও আমি গেলাম না। কারণ কার কাছে যাবো, আমার তো কেউ-ই বেচে নেই। তাই মনের দুঃখে আমি বাঘাইছড়ির মাচালংয়ে চলে গেলাম। নিজেকে অনেকটা গোপন রেখে চলছিলো আমার দুঃখী জীবন।

দেশের অবস্থা দেখে কাউকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতাম না। কিন্তু ২০০৮ সালে ততকালীন সময়ের মাচালং পুলিশ ফাঁিড়র দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্তা আমার সাথে দেখা করে আমার ঘটনাবহুল জীবনী শুনে তিনি আমার স্বাক্ষর নিয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠান মন্ত্রণালয়ে।

এরপর ২০১০ সালে ততকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পত্র সংখ্যা…২১.৬০.০১.০০.০০.০২.২০০৯ (অংশ) -১৯৯ (৪), তারিখ ৯মে ২০১০ ২৬শে বৈশাখ ১৪১৭ ইং তারিখে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান সংক্রান্ত একটি পত্রের অনুলিপি আসে আব্দুল খালেকের কাছে। এই পত্রটি আরো তিনজন আবেদনকারির হাতেও যায়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক সুব্রত রায মৈত্র স্বাক্ষরিত এই পত্র পাঠানো হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে। পত্রে উল্লেখ ছিলো উপযুক্ত বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রাপ্ত নিম্নেবর্ণিত চারটি আবেদন পত্র বিধিসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে এসাথে প্রেরণ করা হলো।

কিন্তু তারপরও বৃদ্ধ আব্দুল খালেক পাননি মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি, তার ভাগ্যে মেলেনি কোনো সুযোগ-সুবিধা। দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক।

বাঘাইছড়ি থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সবুর সিএইচটি টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, জনাব আব্দুল খালেক মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে তার সনদের জন্য আবেদন করলে তখন আমাদের কাছে পাঠাবে। এরপর আমরা সকলে বসে খালেকের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিবো এবং মতামত দিবো।

জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর আমি নিজে-ই খালেকের জন্য একটি ফরম পূরণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করার লক্ষ্যে আমি যথেষ্ট চেষ্ঠা চালিয়েছিলাম। কিন্তু এই ভদ্রলোকের কাছে কাগজপত্র বলতে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী’র স্বাক্ষরিত একটি কাগজের ফটোকপি ছাড়া আর কিছু-ই নেই। তিনি এই ফটোকপি’র অরিজিনাল কপি দেখাতে পারেননি।

বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধূরী সিএইচটি টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, আমার কাছে এই ব্যাপারে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। সরকার যখন আমাকে নির্দেশনা দেবে তখন আমি বিষয়টি নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিবো।

জীবনের এই শেষ লগ্নে এসে সন্তানদের কাছ থেকেও তেমন একটা সহযোগিতা পান না বৃদ্ধ আব্দুল খালেক। তাই জীবন সায়াহ্নে এসে একটু সম্মাননা আর কোনোরকম আতœসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই একমাত্র ইচ্ছা এই মুক্তিযোদ্ধার। চান সরকার প্রধানের নূন্যতম সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সহায় সম্বলহীন এই অসহায় বৃদ্ধ।

Leave a Reply