নাইক্ষংছড়িতে আ’লীগ নেতার ব্যক্তিগত কাজে সরকারের দু’কোটি টাকা বরাদ্ধ

॥ নুরুল কবির ॥

সরকারী অর্থায়নে ব্যক্তির উন্নয়ন। তবুও দেখার যেন কেউ নেই। বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম সোনাইছড়ি ইউনিয়নের জুমখোলায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক প্রভাবশালী সদস্য সচিব ও এম এ কালাম ডিগ্রী কলেজের অধ্যাপক শফি উল্লাহ’র ( ওরফে জঙ্গী শফিউল্লাহ) এর ব্যক্তিগত বাগানে যেতে পাহাড় কেটে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার ইটের (সলিং) রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। সড়ক নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট-বালি। অধিকাংশ স্থানেই বালির পরিবর্তে রাস্তায় পাহাড়ের বালি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সরকারী অর্থায়নে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্গম সোনাইছড়ি ইউনিয়নের জুমখোলায় জনস্বার্থ বিরোধী একটি রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। চলমান উন্নয়ন কাজটির আশ পাশের প্রায় ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি এবং পাহাড়ী-বাঙ্গালী কোন গ্রাম বা লোকের দেখা নেই। তাহলে কার স্বার্থে, কার উন্নয়নে সরকারী কোটি টাকার অর্থায়নে রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

খোজ নিয়ে দেখা গেছে জঙ্গী সম্পৃক্ততায় অভিযুক্ত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য সচিব ও এম এ কালাম ডিগ্রী কলেজের অধ্যাপক শফি উল্লাহ’র বনায়ন ও ফলজ বাগান রয়েছে ঐ এলাকায়। জনস্বার্থে নয়, স্থানীয় জনগনের আপাতত কোনো কাজেই আসবেনা নির্মাণাধীন রাস্তাটি। সোনাইছড়ি জুমখোলা হয়ে সড়কটি পরবর্তীতে চাকঢালার চাথুই পাড়ায় গিয়ে যুক্ত হবে বলে জানাগেছে। মজার বিষয় হচ্ছে উন্নয়ন কাজটির ঠিকাদারও শফি উল্লাহ।

গোপন টেন্ডারে পাওয়া উন্নয়ন কাজটি মং বাহাইন আকাশের নামীয় সাঙ্গুওয়ে লাইসেন্সে বাস্তবায়ন করছেন আওয়ামীলীগনেতা শফি উল্লাহ নিজেই। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী একনেতার ব্যবসায়ীক পার্টনার সুমন দাশ এবং এক সময়ের শিবির ক্যাডার আমিন।

নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট-বালি। অধিকাংশ স্থানেই বালির পরিবর্তে রাস্তায় পাহাড়ের বালি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। রাস্তা নির্মাণের জন্য দু’পাশের অনেকগুলো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়াই স্কেভেটর দিয়ে কাটা হয়েছে পাহাড়াও।

সাড়ে তিন কিলোমিটার ইটের (সলিং) রাস্তাটি নির্মাণের জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে টেন্ডার দেখানো হয়েছে।

তারমধ্যে শুধুমাত্র মাটি কাটার জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। অথচ মাটি কাটায় দুই লাখ টাকাও ব্যয় হওয়ার কথা নয়।

নির্মাণ কাজের শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, রাস্তা নির্মাণে কাজের ঠিকাদার শফি উল্লাহ। তার অধিনে ফুটে ৬ টাকা দামে রাস্তায় ইট বিছানো এবং বালি দেয়ার কাজটি করছি।

সোনাইছড়ি ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি বিজয় মারমা’ অং থোয়াইচিংসহ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, নির্মাণাধীন সড়কের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি এবং গ্রাম বা লোকের দেখা নেই। তাই বলতে পারি জনস্বার্থে রাস্তাটি করা হচ্ছেনা। শোনেছি শফিউল্লাহ’র বাগান রয়েছে জুমখোলার শেষ প্রান্তে। রাস্তার নির্মাণ কাজও তিনি করছেন শ্রমিক দিয়ে। নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহান মারমা জানান, জুমখোলায় সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি একটি সরকারী টাকার অপচয়। সড়কটি আপাতত জনগনের কোনো কাজই আসবেনা। ঐ এলাকায় কোনো জনবসতি নেই। আশপাশে কোনো গ্রামও নেই। কার স্বার্থে এবং কিসের ভিত্তিতে রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে জানিনা। আমার কোনো পরামর্শও নেয়া হয়নি সড়কটি নির্মাণের ব্যাপারে।

অভিযুক্ত আওয়ামীলীগ নেতা অধ্যাপক শফি উল্লাহ বলেন, সোনাইছড়িতে আমার সাড়ে তিন একর পাহাড়ী জমি আছে। তবে জুমখোলায় আমার কোনো জায়গা নেই। উক্ত রাস্তা নির্মাণ কাজের ঠিকাদার নয় বলে মোবাইল ফোনে অস্বীকার করেন। এ ব্যাপারে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান জানান, সোনাইছড়ির জুমখোলায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। এ প্রতিষ্ঠানে আমি নতুন এসেছি, তাই বিস্তারিত এ মুহুর্তে কিছুই বলতে পারবো না।