মহাকাশে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ (উৎক্ষেপণের ভিডিওসহ)

উৎক্ষেপণের ভিডিওটি দেখার জন্য স্ক্রল করে নিচে নামুন

॥ সৌরভ দে ॥

অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ রাত ২টা ১৪ মিনিটে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর কেপ কেনেডি সেন্টারের লঞ্চিং প্যাড থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ ব্লক-৫  রকেটে উৎক্ষেপিত হয় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি। প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক,  প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সহ বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর কেপ কেনেডি সেন্টারে উপস্থিত থেকে সম্পুর্ণ উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করেন।  এর মাধ্যমে বাংলাদেশ হল ৫৭তম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশ।

এর আগে গতকাল শুক্রবার ভোররাতে এটি উৎক্ষেপণের সমস্ত আয়োজন চূড়ান্ত হলেও শেষ মুহুর্তে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়।স্পেসএক্স এর পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, শনিবার এটি উৎক্ষেপণের জন্য একাধিক টিমের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

দু’টি ধাপে এই উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপটি হলো লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি) এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে স্যাটেলাইট ইন অরবিট। লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট  ধাপে ১০ দিন ও স্যাটেলাইট ইন অরবিট ধাপে ২০ দিন লাগবে। উৎক্ষেপণ স্থান থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে যাবে এ স্যাটেলাইট। ৩৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর রকেটের স্টেজ-২ খুলে যাবে। স্যাটেলাইট উন্মুক্ত হওয়ার পরপর এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনে চলে যাবে। এই তিন স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর নিজস্ব কক্ষপথে (১১৯.৯ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্পট) স্থাপন করা হবে। বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটিতে লেখা থাকবে বিবি এবং থাকবে একটি সরকারি লোগো।

মহাকাশে নিজস্ব অরবিটালে যাওয়ার পর এটি বাংলাদেশে নির্মিত দুটি গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একটি হচ্ছে গাজীপুরের জয়দেবপুর এবং অন্যটি রাঙামাটির বেতবুনিয়া। বেতবুনিয়া সাধারণত ব্যাকআপ ষ্টেশন হিসেবে কাজ করবে, মূল দায়িত্ব থাকবে জয়দেবপুরের স্টেশনের উপর। ইতিমধ্যেই জয়দেবপুরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের  গ্রাউন্ড স্টেশনে সিগনাল আদান-প্রদানে ১০ টন ওজনের দুটি অ্যান্টেনা ইনস্টলেশন করা হয়েছে। স্টেশনে বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর স্থাপন ও বিদ্যুত্ সরবরাহে ছয়টি বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। নির্মানকারী প্রতিষ্ঠান থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস প্রথম ৩ বছর বাংলাদেশের সাথেই এর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এর সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের উপর ছেড়ে দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্পের মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১৩৫৮ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়েছে। এপর্যন্ত কয়েকবার উৎক্ষেপণের তারিখ বদলানো হয়েছে। প্রথমে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বরে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরে নতুন তারিখ ঠিক হয় এ বছরের ১ মার্চ। সেই সম্ভাব্য তারিখও পরিবর্তিত হয়ে  নতুন তারিখ নির্ধারণ হয় মার্চের শেষ সপ্তাহ বা ২৬ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে যেকোনও দিন । এরপর আরও কয়েকদফা দিনক্ষণ পাল্টে অবশেষে আজ  (বৃহস্পতিবার) উৎক্ষপণের চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মুহূর্তটি  উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সরাসরি সম্প্রচার করবে।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির জন্য রাখা হবে। বর্তমানে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এজন্য বছরে ব্যয় হয় প্রায় ১২৫ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে অনেকাংশেই কমে আসবে এ ব্যয়। এছাড়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-রিসার্চ, ভিডিও কনফারেন্স প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভালো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাবে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা  নিশ্চিত করবে।