পার্বত্যাঞ্চলে নারী বান্ধব বাজেট চান পাহাড়ের নারী নেত্রীরা : ৯ দফা সুপারিশ

॥ আলমগীর মানিক ॥

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নশীল প্রতিষ্ঠানগুলো নারীবান্ধব নয় উল্লেখ করে আগামী বাজেটে পাহাড়ের নারীদের জন্যে পৃথক বরাদ্ধ রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ণয় করার দাবি জানিয়েছেন অত্রাঞ্চলের নারী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ। শনিবার রাঙামাটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ এই দাবি জানিয়েছেন।

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রোগ্রেসিভ ও বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের আয়োজনে প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আইনে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরিকরণে করণীয় নির্ধারনে করণীয় সম্পর্কে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে পাহাড়ী নারী নেত্রীরা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদসহ উন্নয়নশীল প্রতিষ্ঠানগুলোতে অত্রাঞ্চলের নারীদের জন্যে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

এখানকার নারীরা এতোটাই অবহেলিত যে, নিজেদের অধিকারের কথা জানানোর মতোও কোনো একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা হয়নি দীর্ঘ বছরেও এমন তথ্য জানিয়ে নারী নেত্রীগণ বলেন, কৃষিজ পন্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ সর্বক্ষেত্রে নারী অংশগ্রহন একটি স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। সারাজীবন নিজেদের উজাড় করে দিয়ে পরিবারের সুখে-দুঃখে জীবিকা অর্জনের জন্য পাহাড়ের নারীরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে চলে তার বিনিময়ে তার প্রাপ্তির ঝুলিতে কোন কিছুই পড়েনা। অর্থ অর্জনের পর সেই অর্থ খরচ এবং পরিবারের অন্যান্য সিন্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতে নারী অংশগ্রহন একেবারেই নেই। এই ধরণের রীতিনীতি কোন অবস্থাতে একজন নারীকে আরো বেশী কর্মদ্দোগী করতে উৎসাহিত করেনা। তাই নারীর আর্থিক স্বাধীনতা এবং সিন্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা জরুরী।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশিকা’র হলরুমে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে প্রোগেসিভের নির্বাহী পরিচালক সুচরিতা চাকমার সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন, নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন হিমাওয়ান্তীর পরিচালক টুকু তালুকদার, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, আইনজীবি এডভোকেট সুস্মিতা চাকমা, হেডম্যান থোয়াই অং মারমা।

সংবাদ সম্মেলনে, নারী নেত্রীগণ আরো বলেন, প্রথাগত বিচার ব্যবস্থা আজ পার্বত্য অঞ্চলের জন্য একটি গৌরবময় অধ্যায়। এই গৌরবময় প্রথাগত বিচারব্যবস্থা ও রীতিনীতিকে আরো গণমূখী এবং যুগের সাথে সমন্বয় করার লক্ষ্যে কিছ কিছু পরিবর্তন আজ যুগের দাবী। যেমন পার্বত্য অঞ্চলে অধিকাংশ উপজাতীয় সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। পাহাড়ি নারীরা নানা প্রকার অসমতা এবং নির্যাতনের শিকারে পরিনত হচ্ছে ক্রমাগত। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য এখনো বিরাজমান পাহাড়িদের সমাজ ব্যবস্থায়। এই অবস্থার যে পরিবর্তন প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রচলিত প্রথা অনুসারে বংশ পরম্পরা হেডম্যান/কার্বারী নিয়োগ হয়ে আসছে কেবল পুরুষরাই। ইদানিং চাক্মা সার্কেল প্রধানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্দ্যোগে বিদ্যমান হেডম্যান/ কার্বারীর পাশাপাশি নারী কার্বারী নিয়োগ প্রদান করছেন এবং তারা নানা প্রকার সামাজিক বিচার কার্যে সহযোগীতা প্রদান করে আসছেন। কিন্তু অন্য দুটি সার্কেল মং এবং বোমাং সার্কেল এই বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। তাছাড়া নারীর সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি প্রধান অন্তরায়।

যে সকল হেডম্যান কার্বারীর উত্তরাধিকারী হিসেবে যোগ্য পুরুষ নাই সেই ক্ষেত্রে একজন যোগ্য নারীকে উক্ত পদে আসীন করার প্রক্রিয়া প্রচলিত না হওয়াতে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়ছে এবং তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হচ্ছেন না। তাই স্থানীয়ভাবে নেতৃত্ব সৃষ্টি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারী সমাজকে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহনের সুযোগের দাবি রাখে।

প্রথাগত রীতিনীতি, রেওয়াজ, বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নারীবান্ধব করার মাধ্যমে নারীদের আত্মবিকাশের পথকে সুপ্রশস্ত করার জন্য এবং পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি নারীর উন্নয়নের মাধ্যমে সমগ্র পাহাড়ি জাতিসত্বার উন্নয়ন সুনিশ্চিত করার জন্য ৯ দফা সুপারিশ মালা পেশ করে নারী নেত্রীরা।

সুপারিশগুলো হলো- (১) নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে, পুরুষের পাশাপাশি, যোগ্যতা সম্পন্ন নারীদেরকে হেডম্যান/কার্বারী হিসেবে নিয়োগ করার জন্য সার্কেল প্রধানগণ আরো বেশী মাত্রায় মনোযোগী হবেন। (২) নারী সংক্রান্ত কোন বিচার প্রক্রিয়াতে, নারীদের বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করা। (৩) নারীদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মনীতি প্রচলনের জন্য স্ব-স্ব সমাজে উদ্যোগ গ্রহনকরা। (৪) প্রথাগত ব্যবস্থা সমূহ লিখিত আকারে সংবিধিবদ্ধ করা এবং নারী পুরুষ বৈষম্যমুলক প্রথা সমুহ সংস্কার করা।

(৫) প্রথাগত পদগুলোতে নারীর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক কর্মকান্ড রহিত করা যাতে নারীর সে পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পথ কন্টকমুক্ত হয়। (৬) পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন§ ও মৃত্যু তথ্য প্রথাগত পদগুলোর কার্যালয়ে রেজিষ্টার আকারে সংরক্ষণ করা যাতে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি লাভ-এর ক্ষেত্রে মেয়ে শিশু/নারীর পথ সুগম হয়। (৭) স্থানীয়, জাতীয় পর্যায়ে/আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে পাহাড়ি নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের জেন্ডার নীতিমালা প্রনয়ণ। (৮) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নারী কর্মী নিয়োগে নীতিমালা শিথিলতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ও সহিংসতার শিকার নারীদের পূণর্বাসনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমুহে বাজেট বরাদ্ধ রাখা। (৯) সমমানের কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি উপজাতীয় নারীর সমান মজুরী নিশ্চিত করা।

এই নয় দফা দাবি বাস্তবায়নে জেলার উন্নয়নশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করতে রাঙামাটির সকল স্তরের সুশীল সমাজ, সাংবাদিকসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।