ব্রেকিং নিউজ

উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পাহাড় : ২৭ গ্রামবাসীকে অপহরণ! প্রতিবাদে অবরোধের ডাক

॥ আলমগীর মানিক ॥

সশস্ত্র সংঘাতের পরবর্তী আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ারচরের সার্বিক পরিস্থিতি। দিনে-দুপুরে উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যার পর একে একে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড ও সশস্ত্র তৎপরতার মধ্যে আতঙ্কিত পাহাড়ি জনগণের জন্যে জীবনযাত্রা যেখানে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, এমনিতর পরিস্থিতিতে নতুন করে পৃথক দু’টি ঘটনায় ২৭জন পাহাড়ি বাসিন্দাদের অপহরণে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়ে। আসন্ন উপ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্যোগ ও উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েছে পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা।

রোববার সকালে বাজারে যাওয়ার পথে ইঞ্জিনবোট থেকে নামিয়ে ২৫ জনকে এবং ২৪ জুলাই নানিয়ারচর বাজার থেকে ২ জনকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এসব অপহরণের জন্য জেএসএস সংস্কারবাদী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে নব্য মুখোশবাহিনীকে দায়ী করেছে। সংগঠনটির রাঙামাটি জেলা ইউনিটের সংগঠক সচল চাকমা রোববার এক বিবৃতিতে নানিয়াচরে ২৭ নিরীহ গ্রামবাসীকে অপহরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে অপহৃত গ্রামবাসীদের উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেএসএস সংস্কারবাদী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)।

রোববার অপহৃতদের মধ্যে ১১ জনের পরিচয় জানা গেলেও অন্যদের নাম পাওয়া যায়নি। এরা হলেন চন্দিলাল চাকমা (৩২) পিতা সুসেন চাকমা গ্রাম ত্রিপুরা ছড়া, সোনমনি চাকমা (৩৮) পিতা মৃত জ্যোতিষ চন্দ্র চাকমা গ্রাম দিমোক্কে ছড়া, বায়ুধন চাকমা প্রকাশ বায়ক্ক (৫২) পিতা মৃত তেজেন্দ্র চাকমা গ্রাম ধামাই ছড়া, রাতুমনি চাকমা (৪৫) পিতা মৃত প্রেম রঞ্জ চাকমা গ্রাম সাপমারা, শ্যামল কান্তি চাকমা (৪৫) পিতা দয়াল মনি চাকমা গ্রাম সাপমারা, প্রত্যে মোহন চাকমা (৫৫) পিতা মৃত করুণা মোহন চাকমা গ্রাম লাঙল পাড়া, সুইধন চাকমা (৩০) পিতা পদলা চাকমা গ্রাম নতুন বড়াদাম, নবরতন চাকমা (৪৫) পিতা কমদ রঞ্জন চাকমা গ্রাম হুল্লেং পাড়া, লদ্রু সেন চাকমা (৫০) পিতা যাত্রা মোহন চাকমা গ্রাম খামার পাড়া, দেব রঞ্জন খীসা (৫০) পিতা মৃত দুর্গপদ চাকমা গ্রাম ভাঙামুরো, সুনীল কান্তি চাকমা (৫০) পিতা চন্দ্র মোহন চাকমা গ্রাম কাত্তোলতলি।

এর আগে গত ৪ জুলাই নানিয়ারচরের বুড়িঘাট ইউনিয়নের বগাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত আনন্দ মোহন চাকমার ছেলে সুখেন্তু চাকমা (৫০) ও একই গ্রামের প্রয়াত ডুলু চাকমার ছেলে ত্রিদিব চাকমা (৪৮) নামে দুই ব্যক্তিকে অপহরণ করেছিল সন্ত্রাসীরা। তাদের মুক্তির জন্য তাদের দুই পরিবারের কাছ থেকে ২০ লখ টাকা দাবি করে। তাদের এখনও ছেড়ে দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে অপহরণের বিষয়ে জানা নেই নানিয়ারচর থানা পুলিশের। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, এ ধরনের অপহরণের বিষয়ে থানায় কেউ অভিযোগ দেননি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আগামী ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য নানিয়াচর উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে প্রভাব খাটানোর অপচেষ্টার উদ্দেশ্যে এসব অপহরণ চলছে। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে ইঞ্জিনচালিত বোটযোগে কাঁচামালসহ বিভিন্ন গ্রামের লোকজন কুতুকছড়ি বাজারে যাওয়ার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হাতিমারা মুখ এলাকার একটি টিলায় তাদেরকে আটকায়। এরপর তারা আটকানো বোটগুলো থেকে ২৫ জনকে বাছাই করে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে গোপন স্থানে নিয়ে যায়।

উল্লেখ্য, নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান এড.শক্তিমান চাকমাকে গত ৩রা মে দিনে-দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সামনে প্রকাশ্যে হত্যা করে। এর পরের দিন ৪ মে বেতছড়ি নামক স্থানে অন্ত্যস্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহন করতে আসা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (গণতান্ত্রিক) গ্রুপের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা, যুব সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য তনয় চাকমা ও খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলা যুব সমিতির সভাপতি সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা ও মাইক্রোকার চালক মোঃ সজীব দুর্বৃত্তদের গুলিবর্ষনে ৫ জন নিহত হয়। তাই উপজেলা নির্বাচন কতটুকু শান্তির বাতায়ন নিয়ে আসবে, না নতুন উদ্যেমে অপহরণ, চাদার আরো নতুন মাত্রা সংযোজন হবে, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও আবারো নতুন প্রাণহানির ঘটনার আতংক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এখানে বসবাসরত সকল-শ্রেনীপেশার মানুষকে।

এদিকে, আগামী ২৫জুলাই এ উপজেলার শূন্য চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচন হতে যাচ্ছে জানিয়ে শান্তিপুর্ন ও সচ্চ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে উপজেলা নির্বাচন অফিস। এরই মধ্যে কেন্দ্রে প্রিজাইডিং ,সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। ভোট গ্রহন হবে ১২টি কেন্দ্রে। উপজেলায় অতিরিক্ত দ্বায়িত্বে নিয়োজিত রাঙামাটি সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোৎ সাইদুর রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নির্বাচনে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা রির্টানিং অফিসার এবং উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা সহকারী রির্টানিং অফিসার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন ৪জন প্রতিদ্বন্দি। তাদের মধ্যে একজনের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করায় প্রতিদ্বন্দিতায় রয়েছেন ৩জন। সূত্র জানান, এখন প্রতিদ্বন্দিতায় আছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) সমর্থিত প্রগতি চাকমা, কল্পনা চাকমা,এবং জেএসএস(জনসংহতি সমিতি )সংস্কারপন্থি দলের সমর্থিত প্রণতি চাকমা।

এ নির্বাচনে জাতীয় দল বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয়পার্টিসহ আঞ্চলিক বাঙ্গালী দলগুলোর পক্ষ থেকে কোন প্রার্থী অংশগ্রহন করছেনা এ উপ-নির্বাচনে। এমনকি পাহাড়ের প্রভাবশালী আরেক স্বশস্ত্র আঞ্চলিকদল জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) এর পক্ষ থেকেও কোন প্রার্থীতা দেওয়া হয়নি আসন্ন উপনির্বাচনে।

এদিকে, রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের হাতিমারা মুখ এলাকা থেকে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গ্রাম প্রধানসহ নিরীহ গ্রামবাসীদের সংস্কারবাদী জেএসএস ও নব্য মুখোশাহিনী কর্তৃক অপহরণের প্রতিবাদে সোমবার (৯ জুলাই) নান্যাচরের ঘিলাছড়িতে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মানববন্ধন ও মঙ্গলবার (১০ জুলাই) নান্যাচর উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে নব্য মুখোশ বাহিনী প্রতিরোধ কমিটি। নব্য মুখোশ বাহিনী প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব পরাণধন চাকমা সাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। উক্ত অপহরণ ঘটনায় ‘নব্য মুখোশ বাহিনী প্রতিরোধ কমিটি’র আহ্বায়ক জ্যোতি লাল চাকমা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

সংবাদ মাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সেনা সৃষ্ট নব্য মুখোশ বাহিনী ও সংস্কারবাদী জেএসএস-এর হাতে গোটা নান্যাচরবাসী জিম্মি হয়ে পড়েছে। দিন দুপুরে গণহারে অপহরণের পরও প্রশাসনের কোন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। অপহরণকারী সন্ত্রাসীরা নান্যাচর সদরে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবস্থান করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি অপহরণের প্রতিবাদে ঘোষিত মানববন্ধন ও অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে এলাকাবাসীর কাছে সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

উল্লেখ্য, রবিবার (৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নান্যাচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন কুদুকছড়ি বাজারে যাচ্ছিলেন। যাবার পথে বুড়িঘাট ইউনিয়নের হাতিমার মুখ নামক স্থানে সংস্কারবাদী জেএসএস ও মুখোশ বাহিনীর সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা লোকজনকে বহনকারী ইঞ্জিন চালিত নৌকা থামিয়ে বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ২৫ জন সাধারণ গ্রামবাসীকে অস্ত্রের মুখে নামিয়ে রাখে। পরে সেখান থেকে ৯ জনকে ছেড়ে দিয়ে বাকী ১৬ জনকে অপহরণ করে উপজেলার বড়াদাম নামক গ্রামের দিকে যায়। এখনো তাদের কাউকে ছেড়ে দেয়া হয়নি।

এদিকে, এই নির্বাচন নিয়ে কোন উত্তাপ উৎসাহ নেই নানিয়ারচরে বসবাসরত পাহাড়ী-বাঙ্গালী কারো কাছে। তবে পাহাড়ীদের মাঝে বিরাজ করছে চরম উৎকন্ঠা ও অজানা ভয়। পাহাড়ী এ জনপদের গ্রামগুলোতে চলছে আঞ্চলিক স্বশস্ত্র দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অপহরন, গুম-খুন ও প্রাননাশের হুমকি। বেড়েছে ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিটি রাত কাটছে অজানা আতঙ্কে।