ব্রেকিং নিউজ

হাসপাতাল ও স্কুলের জমি দখল, নির্বিকার প্রশাসন!

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় সরকারি জমি দখলের গতি থামছে না। শিক্ষকরা দখল করেছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি। কর্মচারী দখলে নিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মালিকানাধীন ভূমি।
আলীকদমে দখলবাজির মধ্যে পড়েছে পুরাতন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জমি ও ভরিরমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রেকর্ডিয় ভূমি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি কর্মচারী হিসেবে মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে পুরাতন সরকারি হাসপাতালে কোয়ার্টার বরাদ্দ নিয়ে এখন তা দখল করে আছেন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইয়াছিন শরীফ। অন্যদিকে, ভরিরমুখ বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডিয় জমি দখল করছেন স্থানীয় কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বর্তমানে বিদ্যালয়ের জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং স্কুলের জমি অন্যদের কাছে বিক্রি করে দখল বুঝিয়ে দিচ্ছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার পুরাতন সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১০ শতক জমি অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী ইয়াছিনের অবৈধ দখলে চলে গেছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কয়েকদফা উদ্যোগ নিয়েও কর্মচারীর কাছ থেকে জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ ওঠেছে, হাসপাতালের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইয়াছিন শরীফ ও তাঁর স্ত্রী সরকারি জমিটি কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ অনুমতি ছাড়ায় দখলে রয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তার খুঁটির জোর কোথায়?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে আলীকদমকে মানোন্নীত থানা ঘোষণার পর সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ২৮৮ নম্বর আলীকদম মৌজার ৭ নম্বর সিটের দাগ নং-৯৭৪, ৯৭৫, ৯৭৬ এর আন্দর ৬৪ শতক জমিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামো নির্মিত হয়। সেই থেকে ৬৪ শতক জমি স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে থাকায় কর্তৃপক্ষ সরকারকে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর দিচ্ছে। ১৯৯৪ সালে উপজেলা সদরের চৌমুহনীতে নতুন ভবন নির্মাণের পর থেকে নতুন ঠিকানায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থানান্তর হয়। এরপর থেকে অফিস আদেশ প্রদানের মাধ্যমে পুরাতন হাসপাতাল ভবন ও টিনশেড কোয়ার্টারগুলিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মচারীদের কাছে বাসা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে পুরাতন হাসপাতালের একটি অংশে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ভবন নির্মিত হয়। কিন্তু দখলদারকে উচ্ছেদ না করেই পুরাতন হাসপাতালের জমির মাঝখানে ভবনটি নির্মিত হওয়ার ফলে ভবনের উত্তর অংশে প্রায় ১০ শতক জমি অবৈধ দখলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, একসময় পুরাতন হাসপাতালের উত্তরের টিনশেড ঘরটি ভাড়া নেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়া জোহরা বেগম। ২০০০ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইয়াছিন শরীফের সাথে ওই আয়ার বিয়ে হওয়ার পর থেকে তাঁরা পুরাতন হাসপাতালের বরাদ্দ নেওয়া কোয়ার্টারে একসঙ্গে বসবাস করতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সম্পদ রক্ষায় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতার সুযোগে ভাড়ায় ব্যবহার করা কোয়ার্টার ও পাশের জমিটি নিজেদের দখলে নিতে অপতৎপরতা শুরু করেন তাঁরা।

২০১০ সালে ইয়াছিন শরীফের স্ত্রী জোহরা বেগম আয়া পদ থেকে অব্যাহতি নিলেও সরকারি কোয়ার্টারটি কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে না দিয়ে নিজেদের দখলে রেখেছেন। এদিকে, কোয়ার্টারসহ পার্শ্ববর্তী ১০ শতক জমি নিজেদের নামে বন্দোবস্তি নেওয়ার কৌশল হিসেবে ইয়াছিন শরীফ মৌজা হেডম্যানের কাছ থেকে গোপনে রিপোর্ট নিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি এ হেডম্যান রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক উঠায় কৌশল হিসেবে জনৈক মৃত মফিজ উদ্দিনের নামীয় হোল্ডিং নং- আর/৮৪ এর আন্দর ১.০০ একর জমি কিনে নিয়েছেন ইয়াছিন শরীফ ও তার ভাই-বোন। গত ২ ফেব্রুয়ারি আলীকদম ইউএনও অফিসে এ সংক্রান্ত একটি রেজিস্ট্রী দলিল (নং- ০৪/১৮) সম্পাদন করেছেন গোপনে।
২০১৩ সালে বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের দেওয়া এক আদেশবলে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইয়াছিন শরীফকে সরকারি হাসপাতলের জমি থেকে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেন। কিন্তু হঠাৎ তার বদলি হওয়ার কারণে উচ্ছেদ উদ্যোগটি স্থগিত হয়ে যায়।

দখলদার ইয়াছিন শরীফ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘রেকর্ড অনুযায়ী আমার দখলীয় জমিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নয়। এটি একটি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি। বিদ্যমান নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট মৌজা হেডম্যান থেকে রিপোর্ট নিয়ে জমিটি দখলে আছি।’
বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. অং সুই প্রু মারমা জানান, ‘আলীকদমে নতুন অবস্থানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের পর পুরাতন হাসপাতালের ভূমি ও অবকাঠামো পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অনুকূলে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
অপরদিকে, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভরিরমুখ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামীয় ২৮৯ নম্বর চৈক্ষ্যং মৌজার ১২৮ নম্বর হোল্ডিংভুক্ত (পরবর্তীতে ১১৫ নম্বর খতিয়ানের দাগ নম্বর-৭০২) ১ একর ৬০ শতাংশ জমি থেকে ১ একর ২০ শতক জমি নিজেদের বেদখল হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্কুলের পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ, মাওলানা আবদুল মান্নান, মোহাম্মদ হোসেন ও আবদুল হান্নান এ দখলে জড়িত। এদের মধ্যে দু’জন শিক্ষক। দখল করা জমিতে তাঁরা ঘরবাড়ি তৈরি, জমি বিক্রি ও কিছু জমিতে চাষাবাদ করছেন। দেলোয়ার হোসেন নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, স্কুলের জমি বেহাত হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁরা জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করেছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেননি। স্থানীয় তৌহিদুল ইসলাম জানান, স্কুল পরিচালনা কমিটির নির্লিপ্ততার সুযোগে স্থানীয় দুজন স্কুল শিক্ষক এবং তাঁদের কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন মিলে স্কুলের ১ একর ২০ শতক জমি দখল করে নিয়েছেন।
দখলদার শিক্ষক আবদুল হান্নান জানান, ১৯৭৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক আদেশে তৎকালীন জেলা প্রশাসক তাঁর দেওয়া জমি খাস করার রিজামশান মোকাদ্দমার আদেশ বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে আইন অনুযায়ী বর্তমানে ওই জমির মালিকানা ভরিরমুখ স্কুলের থাকার কোনো কারণ নেই।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইসকান্দর নুরী জানান, স্কুলের জমি দখলের বিষয়টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। নির্দেশনা পেলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ভূমি বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুল আফসার বলেন, ‘অতীতের ভুল-ভ্রান্তিগুলোকে কাটিয়ে সরকারি ভূমি রক্ষা ও দখলমুক্ত করার জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিরোধীয় জায়গাগুলোতে আমাদের সার্ভেয়ারকে পাঠিয়ে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’