ব্রেকিং নিউজ

রক্তাক্ত পাহাড়ে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা রক্ত

॥ আল আমিন – খাগড়াছড়ি ॥

মঙ্গলবার সকালে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সদর ইউনিয়নের পোমাংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ত্রাসীরা ব্রাশফায়ার করে মঞ্জুরুল আলম নামে এক বাঙ্গালী যুবককে হত্যা করেছে। সে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি এমএন লারমা গ্রুপের সাবেক কর্মী বলে জানা গেছে। নিহত মঞ্জুরুল আলম দীঘিনালার বাবুছড়ার মৃত মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে।

আবারো রক্তাক্ত হলো পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মাটি। অন্যদিকে পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার, শক্তির পরীক্ষায় লড়াইয়ে পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের রক্তাক্ত পাহাড়ে প্রতিনিয়তই ঝরছে তাজা রক্ত। একের পর এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাড়ছে আতঙ্ক আর উদ্বেগ-উৎকষ্ঠা। চলতি বছরের গত মাসে প্রকাশ্যে মামলা হয় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান চঞ্চুমণি চাকমার উপর। এ সকল ঘটনায় দায় স্বীকার না করে এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করলেও পাহাড়ের মানুষ এ সকল হত্যাযজ্ঞের জন্য পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনকেই দায়ী করে আসছে। পাহাড়ের জেএসএস,জেএসএস সংস্কার,ইউপিডিএফ ও নতুন নামে জম্ম নেওয়া ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক মাঠে নেমেছে রক্তের হলিখেলায়। এক পক্ষ অপর পক্ষের নেতাকর্মী হত্যার মিশনের অংশ হিসেবে এ হত্যাকান্ড ঘটনা ঘটেই চলেছে সবুজ পাহাড়ে। আর সবুজ পাহাড় রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। সব হত্যাকান্ডের কোন বিচার না হওয়ায় পাহাড়ে থামছে না হত্যাকান্ডের রাজনীতি। দাবী স্থানীয় সচেতন মহলের।

দীঘিনালা থানার ওসি আব্দুস সামাদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাঠে বসে তাস খেলার সময় সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। এতে তার মাথা, বুক, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ২৩ রাউন্ড গুলির চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ৩৪ রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে দীঘিনালা থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে বলে তিনি জানান। ধারণা করা হচ্ছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীরা তাকে পুরনো কোন ঘটনার জের ধরে হত্যা করে থাকতে পারে।

হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতায় প্রতিশোধের অংশ হিসেবে সম্প্রতি খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সিমান্তবর্তী উপজেলায় বাঘাইছড়ির সাজেকে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) তিন সদস্য নিহত হয়েছে। নিহতরা হলেন- স্মৃতি চাকমা (৩২), সঞ্জীব চাকমা (২৮) ও অতল চাকমা (২৬)। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে কানন চাকমা নামে আরো একজন। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাঘাইছড়ি উপজেলার দক্ষিণ করল্ল্যাছড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, রাতে উপজেলার দক্ষিণ করল্ল্যাছড়ি এলাকায় একটি বাড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ও তার সহযোগি সংগঠনের কয়েকজন সদস্য ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালের দিকে প্রতিপক্ষ গ্রুপ জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের (জেএসএস) সদস্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করে চলে যায়। পরে সকালে ঘরে তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখে স্থানীয়দের খবরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ কানন চাকমা নামে আরো একজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পাহাড়ে আধিপত্য আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেটে রেখে পাল্টাপাল্টি হত্যাকান্ডের ঘটনায় গত ৬ মাসে লাশের মিছিলে যুক্ত হলো আরো ৩ তাঁজা প্রাঁণসহ সংখ্যা হলো ২৯ জন। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের এক-দশমাংশ বাংলাদেশ সরকার অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ভূ-খন্ড রক্ষার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর উগ্রপন্থী শান্তিবাহিনীর সাথে চুক্তি করলে পাহাড়ে আজো থামেনি রক্তের হোলীখেলা।
যে চুক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক অতিবাহিত হলেও সমাধান হয়নি পাহাড়ের সমস্যা। দিনদিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। গত ৬ মাসে ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) ও জনসংহতি সমিতি এমএন লারমার ২১ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন তিন পার্বত্য জেলায়। ধারাবাহিক খুনের অংশ হিসেবে আজ সোমবার (২৮ মে ২০১৮) আরো ৩ জনের প্রাঁণ ঝরলো অকালে।

চুক্তি পরবর্তী সময়ে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস নামে আঞ্চলিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করে। অপরদিকে, চুক্তির বিভিন্ন ধারার বিরোধীতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মপ্রকাশ ঘটে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ’র। মতার্দশের অমিলে ২০০৭ সালে ভাঙ্গন ধরে পিসিজেএসএস এ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রথম নির্বাচিত সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আর্দশপন্থী আত্মসমর্পণকারী পিসিজেএসএস নেতারা বিভক্ত হয়ে পিসিজেএসএস-এমএন লারমা নামে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে।

নতুন বিরোধ সূত্রপাত: সবশেষ ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ভাঙ্গন ধরে ইউপিডিএফ’র মাঝে। এনিয়ে চুক্তির পক্ষ বিপক্ষের চারটি সংগঠন দাঁড়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারীতে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠন মিঠুন চাকমাকে। শুরু হয় আবারো নতুন করে রক্তের হলিখেলা। তার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে গত ৬ মাসে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হত্যা অভিযোগ করে আসছে দলগুলো।
গত ৩ ও ৪ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও এমএন লারমার কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এর সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ৬ জন খুন হয়েছেন। সর্বশেষ গত ২১ মে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় উজ্জল কান্তি চাকমা নামে ইউপিডিএফর এক সাবেক সদস্য খুন হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। ধারনা করা হচ্ছে তপন জ্যোতি চাকমাসহ নানিয়ারচর হত্যাকান্ডের প্রতিশোধের অংশ হিসেবে সাজেকের এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, বিগত ৬ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০ জন খুন হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠন গুলোর মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ থাকলেও গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তা আবার শুরু হয়। এতে করে উদ্বেগ বাড়ে পাহাড়ে।

নাম না ছাপানোর শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনের মূল কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আধিপত্য বিস্তার। ইউপিডিএফর সামরিক শাখার কমান্ডার তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা নতুন দল(গণতান্ত্রিক) ঘটনার পর থেকে ইউপিডিএফর ১০ নেতাকর্মী খুন হওয়া, চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন এলাকার আধিপত্য কমতে থাকে।

এছাড়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসন ছিনিয়ে নিতে অনেক আগে থেকে মরিয়া ইউপিডিএফ। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক শত্রু পিসিজেএসএসর সাথে সখ্যতা বৃদ্ধি করে ইউপিডিএফ। কিন্তু বিগত ছয়মাসে ইউপিডিএফর আধিপত্যের ধস মোকাবেলায় করতে গিয়ে পাহাড় অশান্ত হয়ে উঠছে।

এমএন লারমার রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক বিভূরঞ্জন চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ পাহাড়ের শান্তি চায় না। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে পাহাড়ে শান্তি ফেরার কথা। কিন্তু তাদের বিরোধীতার কারণে শান্তির পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রমাণ মিলে তপন জ্যোতি চাকমাসহ অন্যান্যদের খুন হওয়ার ঘটনায়। পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পাহাড়ী জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে জেএসএসর সাথে সমঝোতার বিষয়টি আংশিক সত্য জানিয়ে ইউপিডিএফ সমর্থিত গণতান্ত্রিক যুবফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা বলেন, ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিরোধীতা করেনি। চুক্তির কিছু ধারার বিরোধীতা করে আসছে। বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে চুক্তির বাস্তবায়ন করতে হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউপিডিএফর জনপ্রিয়তা বাড়ছে দাবি করে তিনি বলেন, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থি জয়ী হলেও সংসদে যেতে দেয়া হয়নি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ইউপিডিএফ যেকোন সমঝোতা করতে পারে।

সম্প্রতি সময়ের হত্যাকা-ের বিষয়ে বলেন, তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা একসময় ইউপিডিএফর সাথে থাকলেও সাংগঠনিক বিরোধী কর্মকা-ের অপরাধে তাকে বহিস্কার করা হয়েছি। এমএন লারমা সমর্থিতদের ছত্রছায়া সে ও ইউপিডিএফ থেকে বিভিন্ন সময় বহিস্কৃতরা মিলে নতুন সংগঠন করে। কিন্তু পাহাড়ী জনগণ সেটিকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নয় নব্য মুখোশ বাহিনী হিসেবে তাদের চিনে। বর্মাসহ অন্যান্য হত্যাকা-ের জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী না করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি জানান তিনি।