কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য সম্পদের নতুন চমক : ১০ দিনে রাজস্ব আয় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা

॥ আলমগীর মানিক ॥

মওসুমের শুরুতেই এ বছর কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ দারুণ আশা জাগিয়েছে জেলেদের মনে। তিন মাসে হ্রদে মওজুদ হওয়া মাছ শিকারে নেমে জেলেদের জালে যেমন আশাতীত পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে, তেমনি এবার উঠে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির বড় আকারের মাছ। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরকারি রাজস্বও। তিন মাসের অধিকাল মাছ শিকার নিষ্দ্ধি থাকার পর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম এই কৃত্রিম হ্রদে পহেলা আগষ্ট থেকে আবারো শুরু হয় মাছ আহরণ ও বিপণন।

দেশীয় মৎস্য প্রজাতির এক বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ জলাধার কাপ্তাই হ্রদে মৌসুম শুরুর প্রথম দিনেই আহরিত মাছ থেকে সরকারি রাজস্ব অর্জিত হয়েছে ১৭ লাখ টাকারও বেশি। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১০দিনে কাপ্তাই হ্রদ থেকে আহরিত হয়েছে ৮ লক্ষ ৩২ হাজার ৯৭৬ কেজি মাছ। যার বিপরীতে ১০দিনে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) রাজস্ব আদায় করেছে ১ কোটি ২৮ লক্ষ ৭৪ হাজার ৪০২ টাকা।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসি রাঙামাটি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক নৌ-বাহিনীর কমান্ডার মোঃ আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে কাপ্তাই হ্রদ থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়েছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে এ বছর হ্রদের মৎস্য সম্পদ হতে রাজস্ব আদায়ের হার অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার আসাদ বলেন, মূলতঃ কেচকি-চাপিলা, আইর, কাতল ও রুই জাতীয় মাছ ধরা পড়ছে বেশি।

স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়িরা জানান, অন্যান্য বছরের ন্যায় কাপ্তাই হ্রদে এবছর নানা ধরনের প্রাকৃতিক সমস্যার পরেও দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। স্থানীয় জেলেদের মাধ্যমে এবছর ১০ থেকে ১৪ কেজি ওজনের বাঘাআইর, ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের আইর মাছও ধরা পড়ছে জালে।

এদিকে, মৎস্য ব্যবসায়িদের কাছ থেকে প্রাপ্ততথ্যে জানাগেছে, কাপ্তাই হ্রদ থেকে আহরিত মৎস্য সম্পদের ব্যবসায় সরকারি হিসেবে আদায়কৃত রাজস্বের বিপরীতে যে পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়, জেলায় স্থানীয় বাজারে তার চেয়েও অন্তত দ্বিগুণ অর্থ লেনদেন হয়।

রাঙামাটি মৎস্য ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি মোঃ কবির আহাম্মদ সওদাগর জানিয়েছেন, মাছ ধরা মৌসুমের শুরুতে যে পরিমান মাছ ধরা পড়েছে গত কয়েকদিনে সেটি কিছুটা কমে গেছে। নাহয় রাজস্ব আদায় আরো অনেক বেশি হতো। এদিকে মৎস্য ব্যবসায়িরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ব্যবসায়িরা রাঙামাটি থেকে ঢাকায় মাছ পরিবহণ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে, তার অন্যতম কারন হলো মহাসড়কের যানজট। যানজটের কারনে রাঙামাটি থেকে বরফ দেওয়া মাছ নিয়ে রাজধানীতে পৌছাতে বর্তমানে ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টার মতো সময় লাগছে। এতে করে মাছগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কাঙ্খিত দাম থেকে বঞ্চিত হয়ে বিপুল পরিমান ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে ব্যবসায়িরা।

ব্যবসায়িদের তথ্যানুসারে ছোট-বড় অন্তত তিনশো ব্যবসায়ি কাপ্তাই হ্রদের মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত। এসব ব্যবসায়িদের বিনিয়োগকৃত অর্থের ব্যবহার করছে অন্তত ৩০ হাজার জেলে। এছাড়াও স্থানীয় বাজারে বিক্রিসহ পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আরো ২০ হাজার স্থানীয় জেলে। এসবের বিপরীতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের আহরণ-বিপননের মাধ্যমে প্রতিবছর ৬০ কোটি টাকার লেনদেন চলা কাপ্তাই হ্রদ থেকে বর্তমানের চেয়ে অন্তত ৫গুন বেশি রাজস্ব আদায় হতো যদি হ্রদের নাব্যতা সঠিকভাবে রাখা যেত।

এমন মন্তব্য করে মৎস্য ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি কবির আহাম্মদ সওদাগর বলেন, কাপ্তাই জল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের পর হতে অদ্যবদি পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে কোনো প্রকার ড্রেজিং করা হয়নি। এতে করে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা কাঁদাযুক্ত পাহাড়ির ঢল ও হ্রদের চারপাশে অবস্থিত পাহাড়গুলোর মাটি ক্ষয়ে পড়ে হ্রদের নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে অত্যন্ত বেশিপরিমানে। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে হ্রদে ছোট মাছের অনেকগুলো জাত মরে যাচ্ছে। এছাড়াও কার্প জাতীয় মাছগুলো তাদের উৎপাদন তথা প্রজনন সঠিকভাবে করতে পারছেনা। তারপরও বিএফডিসির ব্যাপক তৎপরতায় বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে মাছের উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি হলেও এই ধারাবাহিকতায় বজায় রাখতে হলে হ্রদকে ড্রেজিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ কাপ্তাই লেক দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিমভাবে তৈরি লেকগুলোর মধ্যে অন্যতম। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৬৮,৮০০ হেক্টর আয়তনের এ লেকটি মূলত তৈরি হলেও মৎস্য উৎপাদন, কৃষিজ উৎপাদন, জলপথে যাতায়াত, ফলজ ও বনজ দ্রব্য দুর্গম পথে পরিবহন, জেলে, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও জীবন-জীবিকা থেকে শুরু করে মৎস্য সেক্টরে কাপ্তাই লেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এ লেকের উৎপাদনশীলতা, মৎস্য প্রজাতি বিন্যাস, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং লেকে মৎস্য চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৮০’র দশকের শেষার্ধ্ব থেকে গবেষণা পরিচালনা করে আসছে অন্যদিকে রাঙমাটি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে লিজ নিয়ে কাপ্তাই হ্রদকে সার্বিকভাবে দেশীয় মাছের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলাসহ সরকারী কোষাগারে বিপুল পরিমান রাজস্ব প্রদানে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসি।

বিগত বছরগুলোতে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ তেমন একটা আশার মুখ না দেখায় এই হ্রদের ব্যবস্থাপনায় থাকা বিএফডিসির ব্যবস্থাপক পদে নৌ-বাহিনী থেকে প্রেষণে একজন কমান্ডার পদ মর্যাদার কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার ফলে গত এক দশক ধরে আবারো নতুন করে পার্বত্য অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করেছে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ।