ঘুরে আসুন আলীকদমের তিনাম ঝর্ণা !

মমতাজ উদ্দিন আহমদ:
যারা পাহাড়ে ঘুরা কিংবা ঝর্ণা দেখতে অভ্যস্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করছে প্রকৃতির আরেক বিস্ময় ‘তিনাম ঝর্ণা’। সুউচ্চ পাহাড় থেকে খানিক দুরত্বে পাশাপাশি দুইটি স্রোত অবিরল ধারায় উপচে পড়ছে তিনাম ঝর্ণার পানি। বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলায় এ পর্যন্ত লোকচক্ষুর নজরে আসা ঝর্ণাগুলোর মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ‘তিনাম ঝর্ণা’। এ ঝর্ণাটি দেখতে আলীকদম সদর থেকে মাতামুহুরী নদীপথে অন্তত ৫০ কিলোমিটার দুরে যেতে হয়।
ঘনঘোর আষাঢ়-শ্রাবণের ভরাবর্ষায় মুখরিত হয় পাহাড়ের বিভিন্ন ঝর্ণা। বছরের অন্যসময় এসব ঝর্ণা থেকে পানির প্রবাহ একটু কমে যায়। গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে ঢাকা থেকে আসা ৪ পর্যটক আলীকদম উপজেলার পোয়ামুহুরী এলাকার ‘রূপমুহুরী ঝর্ণা’ দেখতে যান। আলীকদমে নবনির্মিত শৈলকুঠি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনায় তাঁদেরকে মাতামুহুরী নৌপথে রূপমুহুরী ঝর্ণায় পাঠানো হয়। এ ৪ পর্যটক স্থানীয় এক বাসিন্দার কাছে জানতে পারেন পোয়ামুহুরী থেকে নৌপথে ৩০ মিনেটের দুরত্বে আরেকটি ঝর্ণা আছে। নাম তার ‘তিনাম ঝর্ণা’। যেখানে এ পর্যন্ত কোনো পর্যটক যায়নি! লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এ ঝর্ণা দেখতে উৎসুক হন চার পর্যটক।

এ পর্যটক দলের প্রধান ঢাকার শনির আখড়া পলাশপুর-দনিয়া এলাকার বাসিন্দা মোহসিন হোসেন জানান, ‘তিনাম’ অনেক সুন্দর একটি ঝর্ণা। এ ঝর্ণার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পাশাপাশি দুইটি স্রোত। অন্তত দেড়শ’ ফুট উঁচু পাহাড়ের খাদ বেয়ে দুইটি ঝর্ণার পানি গড়িয়ে পড়ছে নীচে। ঝর্ণা দুইটির পানি যেখানে পড়ছে সেখানে জলাশয় রয়েছে। জলাশয়ের পাশে রয়েছে পাশাপাশি দুইটি সুড়ঙ্গ! স্থানীয়দের কয়েকজন এটিকে ‘তিনাম ঝর্ণা’ নামে তাদের পরিচয় দেন।

বাংলার প্রকৃতিতে শ্রাবণ শেষে ভাদ্রের মাঝামাঝিতেও প্রকৃতির অপরূপ নিদর্শন এ ঝর্ণার উপচেপড়া ভরা যৌবনে ভাটা পড়েনি। পর্যটক মোহসিনের মতো তার অন্য সতীর্থরা জানান, এ ঝর্ণার রূপ দেখার মোক্ষম সময় এখনই! সবুজ পাহাড়ের অন্তর্বিহীন নিস্তব্ধতায় তিনাম ঝর্ণা যেন আছল বিছিয়ে রেখেছে পর্যটকদের অভ্যার্থনা জানাতে! পার্বত্যাঞ্চলের অন্যান্য নান্দনিক ঝর্ণার দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে তিনাম ঝর্ণার রূপ-বৈচিত্র্য মুগ্ধকর।
তিনাম ঝর্ণা দেখতে গিয়ে একই সাথে পর্যটকরা দেখতে পারবেন রূপমুহুরী ঝর্ণা। রূপমুহুরী ঝর্ণার মুগ্ধতা দেখে ইতোপূর্বে শত শত পর্যটক পোয়ামুহুরী গিয়েছেন মাতামুহুী নদীপথে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে আবিস্কার হওয়া দামতুয়া ঝর্ণা ও জলপ্রপাত দেখতে ইদানীং পর্যটকরা আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার এলাকায় যাচ্ছেন। তবে রূপমুহুরী ও তিনাম ঝর্ণার প্রাকৃতিক রূপ ও গঠনশৈলীও পর্যটকদের মুগ্ধ করার মতো। তাছাড়া, ঝর্ণা দেখতে গিয়ে অন্তত ৫০ কিলোমিটার নৌপথে মাতামুহুরী নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।

কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে আলীকদমে সরাসরি শ্যামলী ও হানিফ পরিবহনের বাস সার্ভিস চালু আছে। অথবা কক্সবাজারের চকরিয়া বাস স্টেশন থেকেও বাস কিংবা জীপ যোগে আলীকদম আসা যায়। বাস স্টেশন থেকে রিক্সা কিংবা অটোতে করে মাতামুহুরী ব্রিজে আসতে হবে। ব্রীজের নীচে বাঁধা থাকে সারি সারি যন্ত্রচালিত নৌকা এবং স্পীড বোট। সেখান থেকে মাতামুহুরী নদীপথে পোয়ামুহুরী বাজার ঘাটে নামতে হবে। বর্ষায় ইঞ্জিন বোট ভাড়া জনপ্রতি দু’শ টাকা ও শুষ্ক মৌসুমে স্পীড বোট ভাড়া ৪/৫ শ’ টাকা। রিজার্ভ ইঞ্জিন বোট কিংবা স্পীড বোটের রিজার্ভ ভাড়া ৫/৬ হাজার টাকা পড়বে।

থাকার জায়গা : আলীকদম সদরে শৈলকুঠি রিসোর্টে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ভোরে ঝর্ণা দেখতে গিয়ে বিকেল উপজেলা সদরে ফিরে এসে রাতের বাসে করে ফেরা যায়।
মনে রাখবেন: চিপসের প্যাকেট, পলেথিন, সিগারেটের ফিল্টার, পানির বোতলসহ অন্যান্য আবর্জনা নদীতে কিংবা ঝর্ণা এলাকায় ফেলবেন না। পাহাড়ের ঝর্ণা ও জলপ্রপাতসমুহ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ। অপচনশীল এসব আবর্জনা ফেললে পরিবেশ নষ্ট হয়। পথে জোঁক থাকতে পারে, তাই সতর্ক থাকবেন। লবণ সঙ্গে রাখলে ভালো হয়। জোঁক কামড়ালে লবণ ছিটিয়ে দিলে কাজ হয়। সিগারেটের তামাকও ব্যবহার করা যায়। ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা অতি দুর্গম। যাঁরা পাহাড়ি পরিবেশে হাঁটতে পারেন না তারা সেখানে না গেলেই ভালো। শিশু, বয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সেখানে না নেওয়ায় সঙ্গত। হাঁটতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা দুরহ। কাজেই পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা না থাকলে সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্তই ভালো।