রাঙামাটির এলায়েন্স হেলথ কেয়ার সেন্টার’র বিরুদ্ধে অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ

॥ আলমগীর মানিক ॥

রাঙামাটিতে নব প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসকের অবহেলায় এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে শিশুটির অভিভাবক। তিনি দাবি করেন, এই শিশু অপচিকিৎসার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। যদিও তিনি বারবার প্রসুতি এবং শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নিতে চাইলেও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাকে সেই হাসপাতালেই থাকার জন্য প্রলুব্ধ করেছে। রাঙামাটি শহরের বিজন সরনী এলাকায় প্রধান সড়কের পাশে সদ্য চালু হওয়া এলায়েন্স হেলথ কেয়ার সেন্টার নামক ঔই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে এই বক্তব্যদেন মৃত্যুর শিকার নবজাতকের পিতা সুজন চাকমা। এই অভিযোগের বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক ক্য য়েং চাক এর সাথে বারংবার যোগাযোগের চেষ্ঠা করেও পারা যায়নি। পেশায় একজন সরকারী কর্মকর্তা সুজন চাকমা থাকেন রাঙামাটি শহরের মন্ত্রী পাড়া এলাকায়।

প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে সুজন জানান, তার স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে রাঙামাটির গাইনী চিকিৎসক ডাঃ হেনা বড়–য়ার তত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাই। তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, এলায়েন্স হেলথ কেয়ার সেন্টারে আমার স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশন করান। এটাতে উন্নত সেবা পাওয়া যায়। সুজন চাকমা বলেন, আমি চিকিৎসকের পরামর্শে উক্ত ক্লিনিকে গিয়ে রোগীকে ভর্তি করাই। গত ১৬/০৯/২০১৮ইং তারিখে আমার স্ত্রীকে সিজার করে একটি ছেলে সন্তান হয়।

দু’দিন পরে আমার বাচ্চার শারিরিক অবস্থার অবনতি হতে দেখে আমি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালেও তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিতে গড়িমশি করতে থাকে। এসময় আমি আমার সন্তানকে অন্যত্র চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে চাইলেও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ অনীহা প্রকাশ করে। এক পর্যায়ে বাচ্চার অবস্থার অবনতি হতে থাকলে অনকলে ডাঃ সুচরিতা ম্যাডামকে ডেকে এনে আমার বাচ্চাকে দেখায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এর বিনিময়ে আমার কাছ থেকে ১২শ টাকা ভিজিট ফি নেয় তারা। এসময় ডাঃ সুচরিতা আমার সন্তানকে তিনটে পরীক্ষা দেন এবং আমি সেগুলো করাই। এই টেষ্টগুলো ক্লিনিকের মালিক ডাঃ ক্য য়েং চাক এর মালিকানাধীন মেডিনেট থেকে টেষ্টগুলো করা হয়। এরপর আমার ছেলেকে ফটোথেরাপি দেওয়ার সাজেষ্ট করেন এবং আমার বাচ্চাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন।

এরপর আমার বাচ্চাকে ফটোথেরাপি দেওয়ার নাম করে একটি বক্সে ঢুকিয়ে রাখে। পরে আমার বাচ্চার অবস্থা খারাপ হতে থাকলে আমি বারংবার ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করি। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাদের ডাক্তারকে রাত দেড়টা থেকে ফোন দিতে থাকলেও তিনি প্রথমে আসতে পারবেন না বলে রেফার্ড করে দেওয়ার কথা জানায়। এরপর একজন গর্ভবতী রোগী উক্ত ক্লিনিকে আসলে সেখবর পাওয়া মাত্রই ক্লিনিকের ডাক্তার আসে। এসময় তিনি এসেই আমার বাচ্চাকে দেখে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। এসময় বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ক্লিনিকটির পক্ষ থেকে কোনো প্রকার সহযোগিতা করা হয়নি অভিযোগ করে সুজন চাকমা বলেন, বাচ্চাকে নিয়ে যেতে ক্লিনিকটির কোনো এ্যাম্বুলেন্স পাইনি।

এছাড়াও আমার সরকারী চাকুরির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরেও আমার সন্তানের চিকিৎসাপত্র আমাকে দিতে চায়নি এলায়েন্স হেলফ কেয়ার সেন্টার কর্তৃপক্ষ। জনাব সুজন চাকমা কান্না করতে করতে বলতে থাকেন, দাদা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ অনেক অনুরোধের পর অক্সিজেন লাগিয়ে আমার বাচ্চাকে নিয়ে যেতে দেয়। এসময় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে আমাকে তাড়াতাড়ি চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে বলে। পরে আমি চট্টগ্রাম নিয়ে গেলে প্রথমে শিশু হাসপাতাল ও পরে ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যাই। এসময় উভয় প্রতিষ্ঠানই রাঙামাটির এলায়েন্স হেলথ কেয়ার সেন্টারের কাগজপত্র দেখেই আমার বাচ্চাকে ভর্তি করেনি।

পরে এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমাকে বলেন, এই বাচ্চাতো অনেক আগেই মারা গেছে। অভিভাবক সুজন চাকমা প্রতিবেদককে বলেন, দাদা রাঙামাটিতেই আমার বাচ্চাকে মেরে অক্সিজেন লাগিয়ে দিয়েছিলো,এটা আমি বুঝতে পারিনি। ডাক্তারের পরামর্শে আমি এলায়েন্সে ভর্তি হয়ে আমার সন্তানকে হারালাম মন্তব্য করে তিনি বলেন, মূলতঃ কোনো প্রকার প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়াই উক্ত এলায়েন্স হেলথ কেয়ার সেন্টার ক্লিনিকটি পরিচালিত করা হচ্ছে।

সুজন বলেন, আমার বাচ্চাটি মারা যাওয়ার পরেও তাদের চাহিত ৩০ হাজার ৪৯৬ টাকা পরিশোধ করা লাগছে আমার। এদিকে টাকা প্রাপ্তি দু’টি স্লিপও সুজনকে দেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। দেখাগেছে, উক্ত দু’টি স্লিপে ক্লিনিকটির নামঠিকানা উল্লেখ থাকলেও কোনো কন্ট্রাক নাম্বার আর তারিখ উল্লেখ নাই। এছাড়াও একটি স্লিপে ফ্রুট দিয়ে অন্যজনের নাম মুছে তার সন্তানের নাম লিখা হয়।

এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে প্রলুব্ধকারি চিকিৎসক ডাঃ হেনা বড়ুয়ার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার সাথে সাথেই ব্যস্ত রয়েছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এদিকে এসব বিষয়ে এলায়েন্স হেলথ কেয়ার সেন্টারে গিয়ে সেখানে দায়িত্বশীল উদ্বর্তন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। কর্তব্যরত রিসিপসনিষ্ট রুবি চাকমার সাথে আলাপকালে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উক্ত শিশুকে যথাযথভাবেই চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। তবে ফটো থেরাপিটা সামান্য কম দেওয়া হয়েছে হয়তো।

কারন হিসেবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যার কারনে এমনটা হয়েছে। কেন আপনাদের জেনারেটর নাই এমন প্রশ্নের জবাবে রুবি চাকমা জানায়, আমাদের মেশিনটি কারেন্ট ছাড়া চলে না। ভোল্টেজ বেশি লাগে। এক পর্যায়ে উক্ত ক্লিনিকটির পরিচালক (যিনি এফপিএবিতে কর্মরত) ডাঃ ক্য য়েং চাক ওরপে ডাঃ কেটি’র নাম্বার চাইলে নিষেধ রয়েছে জানিয়ে নাম্বার দেয়নি রুবি চাকমা।

পরে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শহরে অপর একটি প্যাথলজি মেডিনেট ল্যাব এন্ড কনসাল্টেশন সেন্টারের মালিকও ডাক্তার ক্যয়েং চাক (কেটি)। সেখানেও ফোন করে উক্ত পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি নাই বলে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানায় একজন নারী রিসিপশনিষ্ট। এসময় তিনি প্রতিবেদকের মুঠোফোন নাম্বার নিয়ে সেটি তার পরিচালকে দিবেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

উল্লেখ্য, রাঙামাটি শহরের হ্যাপীর মোড় এলাকা চিকিৎসক ডাঃ ক্যয়েং চাক কেটির মালিকানাধীন অপর প্রতিষ্ঠান মেডিনেট ল্যাব এন্ড কনসাল্টেশন সেন্টারটির সেবার মান নিয়েও স্থানীয়দের নানা অভিযোগ রয়েছে। বিগত ২০১৭ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে উক্ত প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালিত করেছি জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট টিম। সেসময় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিজাম উদ্দিন ও স্যানেটারি ইন্সপেক্টর নাছিমা আক্তার খানম এর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের সময় মেডিনেট-এ এক্সরে মেশিন পরিচালনাকারি কোনো প্যাথলজিষ্ট না থাকা সত্বেও একজন সহকারিকে দিয়েই তারা চালিয়ে যাচ্ছিলেন গুরুত্বপূর্ন রেডিওলজিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ।

এছাড়াও উক্ত প্রতিষ্ঠানটির ভেতরেই পরিচালিত হওয়া মেডি ফার্মেসীতে কোনো ফার্মাসিষ্ট ছাড়াই একজন শিক্ষানবিসের মাধ্যমেই বিক্রি করা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ন ঔষধ সামগ্রী। এই প্রতিষ্ঠানের রক্ত পরীক্ষার রুমটিতে নোংরা পরিবেশে রাখা হয়েছে রক্ত সংরক্ষনের কাঁেচর ভেকুয়াম টিউব। এসব টিউবগুলো ওয়ানটাইম ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও মেডিনেট কর্তৃপক্ষ এসকল সামগ্রী হুইল পাউডার মিশ্রিত পানিতে ধৌত করে পুনঃরায় ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করছে মর্মে পরিলক্ষিত হয়েছে। সেসময় মেডিনেট পরিচালক ডাঃ ক্যয়েং চাক কেটিকে অর্থদন্ডে দন্ডিত করেছিলো মোবাইল কোর্ট কর্তৃপক্ষ।

সে সময় সিএইচটি টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম এর প্রকাশিত খবরের লিংক নীচে দেওয়া হলো :

টেকনেশিয়ান দিয়ে চলছে রাঙামাটির অধিকাংশ ডায়াগনোস্টিক সেন্টারঃ প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট