আইন লঙ্গন করে সমবায় কর্মকর্তার যোগসাজসে কাউখালী বিআরডিবিতে বিতর্কিত নির্বাচন!

॥ আলমগীর মানিক ॥ সরেজমিন ঘুরে এসে………….

রাঙ্গামাটির কাউখালীতে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির নির্বাচন ঘিরে বিরাট হট্টগোল তৈরি হয়েছে। উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ। ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাবে নির্বাচনের রূপ দেয়া হয়েছে প্রহসনে। এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রার্থী ও ভোটাররা- যার সত্যতা মিলেছে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান ও নির্দিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগের তথ্যসূত্রে।

সরাসরি কথা বলে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, নানা অজুহাতে মনোনয়নপত্র জমা নেয়া হয়নি এক সভাপতি প্রার্থীর। এ জন্য ক্ষুব্দ তিন সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দুই সদস্য। অথচ তথ্য জালিয়াতি ও অবৈধ প্রার্থিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যেও নির্বাচন ছাড়া তার আগেই একক সিদ্ধান্তে সভাপতির পদসহ কমিটির বৈধতা ঘোষণা করেছেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন রুমি। বিআরডিবি আইনের সুষ্পষ্ট লঙ্গন করে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা এই ধরনের অবৈধ কাজটি নির্দিধায় করে গেছেন।

জানা যায়, তপসিল অনুযায়ী আগামী ৫ নভেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। অথচ ক্ষমতা বুঝে না পেয়েও নির্বাচনের তারিখ না যেতেই সভাপতির চেয়ার দখল করে বসেছেন একমাত্র প্রার্থী ও কাউখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বেলাল উদ্দিন। আর বেলাল উদ্দিন বাধা দেয়ায় মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি উপজেলা সমবায় সমিতির বর্তমান সভাপতি আবুল মনছুর। শুধু তাই নয়, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কারসাজি ও যোগসাজশ করে নানা অজুহাতে আবুল মনছুরের মনোনয়নপত্র জমা নেননি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক আশরাফ উদ্দিন। তাই আবার সভাপতি প্রার্থী হতে পারেননি আবুল মনছুর।

এসব বিষয়ে প্রথমে জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আবুল মনছুর। পরে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত মো. বেলাল উদ্দিনের প্রার্থিতা অবৈধ দাবি করে তা বাতিলের জন্য নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সভাপতি পদে বেলাল উদ্দিনকে নির্বাচিত ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন। এসব অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি, কারসাজি ও কারচুপি নির্বাচনের প্রতিবাদে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হতে পদত্যাগ করেছেন, উপজেলার নাইল্যাছড়ি কৃষক সমবায় সমিতির প্রতিনিধি মো. আলমগীর ও মধ্য বেতছড়ি মহিলা সমবায় সমিতির প্রতিনিধি রাবেয়া বেগম।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পদত্যাগকারী এ দুই সদস্য অভিযোগ করে বলেন, তিন সদস্যের মধ্যে কাউখালী উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন আমাদের কোনো রকম মতামত না নিয়ে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধতা দিয়েছেন। রোববার ছিল মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিন। অথচ নির্বাচনের আগে এদিন প্রার্থীদেরও নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন তিনি। অর্থের বিনিময়ে অন্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা না নিয়ে সভাপতি পদে কেবল বেলাল উদ্দিনের মনোনয়নপত্র জমা নিয়েছেন। এখন তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি।

মনোনয়নপত্রে বেলাল উদ্দিনের দেয়া তথ্য জাল। মনোনয়নে অনুমোদনকারী বা প্রস্তাব ও সমর্থনকারী ৬ জনের মধ্যে সভাপতি ও ম্যানেজার ছাড়া ৪ জনের স্বাক্ষর সম্পূর্ণ জাল। তা ছাড়া বেলাল উদ্দিন থাকেন ঘাগড়া ইউনিয়নে কিন্তু তার সমিতির ঠিকানা বেতবুনিয়া ইউনিয়নের সুগারমিল এলাকায়। তার সমিতি পারিবারিক সদস্যদের নিয়ে। সমবায় সমিতির আইন অনুযায়ী বেলাল উদ্দিন প্রার্থী হতে পারেন না। অথচ তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে অপর প্রার্থী আবুল মনছুরের মনোনয়নপত্রটিও নানা অজুহাতে গ্রহণ করেননি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন।

এছাড়া রোববার বর্তমান সভাপতি আবুল মনছুরের দেয়া আবেদনটি আমরা দুই সদস্য গ্রহণ করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে হস্তান্তর করতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। এ নির্বাচন প্রহসনের। এটার কোনো বৈধতা নেই। তাই আমরা নির্বাচন পরিচালনা কমিটি হতে পদত্যাগ করেছি। পদত্যাগ করায় বেলাল উদ্দিন ও আশরাফ উদ্দিন এখন আমাদেরকে বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন।

বর্তমান সভাপতি আবুল মনছুর অভিযোগ করে বলেন, অর্থ ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে আমাকে মনোনয়নপত্র দাখিলে বাধা দেয়া হয়েছে। একক প্রার্থী হিসেবে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় সভাপতির পদ দখলে নিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক বেলাল উদ্দিন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে টাকার বিনিময়ে আমার মনোনয়নপত্র জমা নিতে দেননি। ব্যাপক তথ্য জালিয়াতি করে বেলাল উদ্দিন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তার প্রার্থিতা সম্পূর্ণ অবৈধ। অথচ সম্পূর্ণ অবৈধাভাবে তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন সমবায় কর্মকর্তা ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন। আমি বেলাল উদ্দিনের অবৈধ মনোনয়নপত্র বাতিলের জন্য আবেদন করেছি কিন্তু আমার আবেদন গ্রহণ করেননি আশরাফ উদ্দিন।

আবুল মনছুর বলেন, বেলাল উদ্দিন থাকেন এক ইউনিয়নে কিন্তু তার সমিতি আরেক ইউনিয়ন এলাকার সুগারমিলে। নিবন্ধনকৃত গঠনতন্ত্রের উপবিধি অনুযায়ী সমিতির সদস্যকে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। কিন্তু বেলাল উদ্দিন কৃষক সমবায় সমিতির সদস্য হলেও তার প্রকৃত বাসস্থান ঘাগড়া ইউনিয়নে। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখলে তা প্রমাণ মিলবে। তিনি বৈধ সদস্য নন- তাই উপজেলা কেন্দ্রীয় সমিতির প্রতিনিধিত্ব করার কোনো যোগ্যতা নেই তার। এমনকি প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতাও নেই তার। জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া সভা দেখিয়ে নিজেই প্রার্থী হয়েছেন বেলাল উদ্দিন। অনেকের স্বাক্ষর নকল- যা সমবায় আইনের পরিপন্থী। বেলাল উদ্দিনের সমিতি তার পারিবারিক। নিজের ভাই, ভাতিজা, ছেলে সবাই তার সমিতির সদস্য। অনেকের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হয়নি- যা সমবায় সমিতির আইনে অবৈধ।

সমবায় সমিতির আইন ও বিধিমালার ২৮ ধারামতে বেলাল উদ্দিনের মনোনয়নপত্র বাতিলযোগ্য। কিন্তু বৈধভাবে নির্বাচিত না হয়েও বেলাল উদ্দিন অফিসে গিয়ে দাপটের সঙ্গে সভাপতির চেয়ার দখল করে সেখানে বসেন। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তার সঙ্গে কারসাজি , যোগসাজশ ও কারচুপি করে বেলাল উদ্দিনকে অবৈধভাবে নির্বাচিত ঘোষণা দিচ্ছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন। আমাকে তার দলবল দিয়ে হুমকি দিয়ে আমি অফিসেও যেতে পারি না। আমি বেলাল উদ্দিনের অবৈধ মনোনয়নপত্রসহ অবিলম্বে এ অবৈধ নির্বাচনের তপসিল বাতিল করার দাবি করছি।

সরাসরি কথা হলে বেলাল উদ্দিন বলেন, আমার মনোনয়নপত্র বৈধ বলে আমি প্রার্থী হতে পেরেিেছ। অন্য প্রতিদ্বন্ধী না থাকায় আমি বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হয়েছি। আবুল মনছুরের সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভুয়া ও বানোয়াট।

কাউখালী উপজেলা সমবায় সমিতির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কাউখালী উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন রুমি বলেন, আমি সব কাগজপত্র যাচাই করে দেখে সভাপতি পদে বেলাল উদ্দিনসহ অন্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছি। প্রতিদ্বন্ধী না থাকায় সভাপতি পদে বেলাল উদ্দিনসহ সমিতির ৬ সদস্য বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন। আবুল মনছুরের কোনো মনোনয়নপত্র পাইনি। আর তিনি যে অভিযোগ বা আবেদনপত্র দিয়েছেন তা বিধিসম্মত নয়। তাই তা আমলযোগ্য নয়। এ নিয়ে আমার কিছুই করার সুযোগ নেই। এ নির্বাচন নিয়ে সংক্ষুব্দ কেউ থাকলে আদালতে যেতে পারেন। আমি কোনো কিছুর বিনিময়ে কারও পক্ষে কিছুই করছি না। এ ধরনের অভিযোগ অবান্তর।