ব্রেকিং নিউজ

প্রধান শিক্ষকের দম্ভোক্তিঃ “ফেইল করিয়েছি,তো কি হয়েছে? যান পত্রিকায় লিখে দেন”!

॥ সৌরভ দে ॥

এসএসসি টেষ্ট পরীক্ষায় গণহারে ফেল করিয়ে দেওয়ার পর অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের খাতা পুনঃমূল্যায়নের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো খাতা দেখতে চাওয়া শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সাথে চরম দূর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে রাঙামাটি শহরের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানতে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভেদভেদী পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবলী কান্তি চাকমার সাথে কথা বলতে চাইলে…. তিনি বেশ উদ্ধত্বের সাথেই বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ ফেইল করিয়ে দিয়েছি, তো কি হয়েছে? উত্তরপত্রও দেখাবো না, যান পত্রিকায় লিখে দেন।” একটু থেমে তিনি আবারো বলতে থাকেন “এইখানে যেগুলো ফেইল করেছে তারা একটাও এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করবে না, আপনি সাংবাদিক মানুষ আপনি বুঝবেন না, আমরা শিক্ষক আমরা বুঝবো।”

সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছে, পার্বত্য জেলা রাঙামাটি শহরের প্রতিটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে সমানভাবে এগিয়ে গেলেও ভেদভেদী পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও শিক্ষকদের সদিচ্ছার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে শহরের একটি বিরাট অংশের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্টে গণহারে শিক্ষার্থীদের ফেইল করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়ে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। সচেতন অভিভাবকেরা বিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত রেজাল্টে সন্তুষ্ট না হয়ে পরীক্ষার উত্তরপত্র দেখতে চাইলে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মিঃ শিবলী কান্তি চাকমা সরাসরি জানিয়ে দেন যে কোন প্রকার উত্তরপত্র দেখানো হবে না। এসময় তিনি অনেকের সাথে দূর্ব্যবহারও করেছেন বলে শিক্ষার্থীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে উক্ত বিদ্যালয়ে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

টেস্ট পরীক্ষার ফল হাতে পেয়ে বেশ হতাশ এক শিক্ষার্থী জানালো, “আমি ফেইল করার মত পরীক্ষা দেইনি, আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যে, আমি পাশ করবোই কিন্তু কিভাবে যে এমন হল তা বুঝতে পারছি না।”

মেয়ের ফলাফল দেখতে আসা অপর এক অভিভাবক বলেন, আমি জানি আমার মেয়ে পড়ালেখায় একটু দুর্বল কিন্তু এভাবে ঢালাওভাবে রেজাল্ট প্রকাশ করে নিজেদের দায় এড়িয়ে গেলে তো হবে না, অন্তত উত্তরপত্র একবার চেক করার সুযোগ দিলে এটা জানা যেত আমার মেয়ের আসলে কোথায় দুর্বলতা আছে আর কোথায় কোথায় উন্নতি করা দরকার। এই বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবলী কান্তি চাকমা’র সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রথমে বেশ উদ্ধত্বের সাথে বলেন, “হ্যাঁ ফেইল করিয়ে দিয়েছি, তো কি হয়েছে? উত্তরপত্রও দেখাবো না, যান পত্রিকায় লিখে দেন।” একটু থেমে তিনি আবারো বলতে থাকেন “এইখানে যেগুলো ফেইল করেছে তারা একটাও এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করবে না, আপনি সাংবাদিক মানুষ আপনি বুঝবেন না, আমরা শিক্ষক আমরা বুঝবো।” উত্তরপত্র কেন শিক্ষার্থীদের দেখানো হচ্ছে না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “উত্তরপত্র দেখানোর কোন নিয়ম বোর্ড থেকে আমাদের দেওয়া হয়নি, রাঙামাটির কোন স্কুলেই উত্তরপত্র দেখানো হয় না।” বোর্ড থেকে এমন নির্দেশনার কোন অনুলিপি দেখতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মিঃ শিবলী এবার নিজের ভোল পাল্টে বলেন, “আমার সময়মত আমি দেখাবো, এখনো অনেক সময় আছে। উত্তরপত্র দেখালেই কি ওই ফেইল করা শিক্ষার্থীগুলো পাশ করে যাবে??”

এদিকে উত্তরপত্র দেখানোর বিষয়ে বোর্ডের নির্দেশনা জানতে চেয়ে রাঙামাটি শহরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শাহ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মুজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “উত্তরপত্র দেখানো যাবে না এমন কোন নির্দেশনা বোর্ড থেকে দেওয়া হয়নি বরং আমি গত তিন বছর ধরেই আমার বিদ্যালয়ে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দেখিয়ে থাকি। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের টেস্ট পরীক্ষার উত্তরপত্র ১০ নভেম্বর দেখানো হবে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, উক্ত বিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে দেওয়া হয়। এ বছর টেস্ট পরীক্ষায় ৫ বিষয়ে ফেইল করা বজ্র কিশোর নামের এক ছাত্র শুধুমাত্র শিক্ষকদের নাস্তা কিনে দেওয়ায় তাকে পাশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়।

অন্যদিকে, ভেদভেদী পৌর উচ্চ বিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগের যেন শেষ নেই। এর আগেও উক্ত বিদ্যালয়ের এক সিনিয়র শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের শাস্তি দেওয়ার নাম করে শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এই বিষয়ে বিদ্যালয় প্রশাসন কি উদ্যোগ নিয়েছে তা এখনো অস্পষ্ট। ক্লাসের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত হলেও এর মাঝেও কমপক্ষে ২-৩ ঘন্টা কোন ক্লাস হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক অভিভাবক। দায়িত্বরত অনেক শিক্ষকের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, উক্ত বিদ্যালয়ের দপ্তরীর ছেলে মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দেয় কিন্তু এই নিয়ে কেউই কোন প্রতিবাদ করতে পারে না। বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার রাস্তায় প্রতিদিন বখাটেরা মেয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করে থাকে, এই বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও নেওয়া হয়নি কোন পদক্ষেপ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি একসময়ের আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র যোদ্ধা ছিলেন। মূলতঃ তার ক্ষমতা বলেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহ অন্যান্য শিক্ষকদের এমন দায়সাড়া ভাব। পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার প্রতি অর্থবছরে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও উক্ত সকল কারণে পিছিয়ে পড়ছে কোমলমতী শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের কাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে না শিক্ষার মান।