পাহাড়ে এক বছরে ৪৫ খুনসহ অর্ধশত অপহরণ : সুষ্ঠ নির্বাচন নিয়ে উৎকন্ঠিত পার্বত্যবাসী

॥ আলমগীর মানিক ॥

রাঙামাটির লংগদুতে শুক্রবার প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের গুলিতে আবারও একজন আঞ্চলিক দলীয় চাাঁদা কালেক্টর খুন হয়েছে। নিহত রাজাগুলা ওরফে রাজা চাকমা পার্বত্য পাহাড়ের আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএস (এমএন) লারমা গ্রুপের কালেক্টর হিসেবে ওই এলাকায় দায়িত্ব পালন করতো বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। শুক্রবার গভির রাতে বাড়িতে প্রবেশ করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রীরা ব্রাশফায়ারে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে নির্বিঘেœ চলে যায়।

পাহাড়ে কিছুতেই থামছে না আঞ্চলিক দলীয় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ও টার্গেট কিলিং মিশন। এক একটি এলাকায় এক একটি স্বশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন তাদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নেশায় একের পর এক হত্যা, অপহরণ ও গুমের মিশন পরিচালনা করছে। অস্ত্রবাজির এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য চাঁদাবাজী; গত কয়েক বছর তারা প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজি চালিয়ে অতিষ্ট করে তুলেছে পাহাড়ের ব্যবসায়ী, উন্নয়ন কর্মী ও সরকারি চাকুরেসহ সাধারণ মানুষকে। তাদের চাঁদার অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না দীন-দরিদ্র সাধারণ কৃষকরাও। প্রতিনিয়িত খুন অপহরণসহ সীমাহীন চাঁদাবাজীর কবলে চরম উৎকণ্ঠায় দিন যাপন করছে পাহাড়বাসী। এই প্রেক্ষাপটে পাহাড়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যাবে তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে খোদ প্রশাসন।

উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে পাহাড়ের অস্ত্রের মহড়া ততই জোরদার হচ্ছে। গত দুই মাসে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় পরপর অন্ততঃ ৯টি খুন, ১৫টি অপহরণ, তিনটি হত্যা চেষ্টা ও বাঘাইছড়ি সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানী চেষ্টাসহ অন্তত দশটি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহ দুয়েক আগে রাঙামাটি খাগড়াছড়ি সড়কে একটি পর্যটকবাহী বিলাশবহুল বাসের উপর গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। এদিকে চলতি বছরের পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই পর্যটকবাহি গাড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলির প্রেক্ষাপটে মাথায় হাত পড়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িদের। কপালে চিন্তার রেখা প্রশাসনেরও।

পার্বত্য চুক্তির আগে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ছিল পাহাড়ের একক সংগঠন শান্তিবাহিনী ছিল তাদের স্বশ¯্র শাখা। চুক্তির পর শান্তিবাহিনী নামের সংগঠন বিলুপ্ত করে তারা লোক দেখানো কিছু অস্ত্র সমর্পণ করলেও পাশাপাশি গড়ে উঠে ইউপিডিএফ। চাঁদাবাজীর কাঁচা টাকার লোভে এর রেশ ধরেই জন্ম নেয় একটির পর একটি সংগঠন। বর্তমানে অন্তত চারটি স্বশ¯্র দল পাহাড়ে সক্রিয় রয়েছে।

চাঁদাবাজীর এলাকা ভাগাভাগি নিয়ে ২০১৬ সালে তারা একটি অলিখিত সমঝোতায় উপনীত হলেও শেষ পর্যন্ত তা বেশিদিন টেকেনি। আবার শুরু হয় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্ধ। গত ডিসেম্বর থেকে এই লড়াই পাহাড় থেকে শান্তিতে ঘুমানোর পরিবেশ তিরোহিত হয়। এমন প্রেক্ষাপটে খোদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালনসহ পাহাড়ে কয়েক দফা মহাসমাবেশ করেছে। জনগণের দাবির মুখে বিগত কিছুদিন ধরে কম্বাইন্ড অপারেশন পরিচলানা করছে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। কিন্তু অভিযানে গুটিকয়েক সন্ত্রাসী ধরা পড়লেও বাকিরা গভির জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

সরকারি সূত্রগুলোর রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং এলাকাবাসীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করে জানা যায় গত একবছরে সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজী শিকার হলেও হত্যাকান্ডে তাদের নিজেদের লোকই বেশি খুন হয়েছে। হত্যার শিকার হয়েছে এসব দলের নানা স্তরের নেতা-কর্মীসহ জনপ্রতিনিধি। এর মধ্যে ২০১৭ সালের, ডিসেম্বরে- ২ জন, ২০১৮ সালে জানুয়ারি-১ জন, ফেব্রুয়ারি-২ জন, মার্চ-১ জন, এপ্রিল-৪ জন, মে-১০ জন, জুন- ৫জন, জুলাই- ১ জন ও আগস্টে ৮ জন, সেপ্টেম্বরে-৩ জন, অক্টোবরে-৬ জনসহ সর্বশেষ চলতি নভেম্বর মাসের ১০ দিনে হত্যার শিকার হয়েছে ২ জন।

এক বছরে পাহাড়ে অন্তত ৫০টির মতো অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে আঞ্চলিকদলীয় সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে অতি সম্প্রতি আড়াই মাসেই রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় পরপর অন্তত ১০টি খুন, অন্তত ১৯টি অপহরণ, তিনটি হত্যা চেষ্ঠা ও সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানসহ অন্তত দশটি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ খুনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়নের বড়াদম বান্দরতলায় চুক্তি বিরোধী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়া বাজাগুলো চাকমা ওরফে রাজা চাকমার নাম।

সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএস (এমএন লারমা) গ্রুপের চাঁদা আদায়কারী কালেক্টর হিসেবে সে উক্ত এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। রাজা চাকমার বাড়ি লংগদু উপজেলার বড়াদম এলাকায়। তার পিতার নাম বীরেন্দ্র চাকমা। এর আগে চলতি মাসের ২রা নভেম্বর খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ এর নেতা সুমেন্টু চাকমাকে। তার মাত্র একদিন আগে সাজেকে বেড়াতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী রিমি চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে গেছিলো ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসীরা। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের মুখে সাত ঘন্টা পর তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সন্ত্রাসীরা। গত ২৮শে অক্টোবর রাঙামাটির ঘাগড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে শংকর দে নামক এক ব্যবসায়ির লাশ। সংশ্লিষ্ট্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, শংকরকে হত্যা করে লাশ ঝূলিয়ে রেখেছিলো আঞ্চলিকদলীয় সন্ত্রাসীরা।

এই ঘটনার মাত্র ২দিন আগে ২৬শে অক্টোবর দীঘিনালায় কার্বারীসহ তিনজনকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় স্বজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। গত ১৭ অক্টোবর নানিয়ারচর উপজেলা সদরেই প্রকাশে গুলি করে হত্যা করা হয়, গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের সক্রিয় কর্মী শান্তি চাকমা শান্তকে। এরআগে, অক্টোবর মাসের ৪ তারিখে নিজের বউ মেরে শাশুরীকে শিক্ষা দেওয়ার মতোই বাঘাইছড়িতে এক গ্রাম প্রধানের মা ও খালাকে নির্মমভাবে কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ৬ই অক্টোবর বান্দরবানের আলিকদমে হত্যার শিকার হয় হেলাল নামে এক ব্যবসায়ি। অক্টোবরের ৭ তারিখে দীঘিনালার মেরুংয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় মঞ্জু চাকমা নামে সংস্কারপন্থী জেএসএস’র এক কর্মীকে। গত ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটির নানিয়ারচরের রামসুপারি পাড়ায় রাতের অন্ধকারে হামলা চালিয়ে হত্যা করা দু’জনকে।

২২ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির রামগড়ে একজনকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয় পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। এদিকে, ৯ অক্টোবর তারিখে রাঙামাটির কাউখালীতে উপজাতীয় দুই ভাইকে অপহরণ করে স্বজাতীয় সন্ত্রাসীরা। এরআগে অক্টোবরের ৩ তারিখে নানিয়ারচর থেকে অপহরণ করা হয় সংস্কারপন্থী জেএসএস এর দুই কর্মীকে, ৪ তারিখে কাপ্তাইয়ের রাইখালীতে যুবকে গুলিবিদ্ধ করা হয়, পানছড়িতে সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে জিম্মি করা হয় ৬ গ্রামবাসীকে, এদিকে ২৭ সেপ্টেম্বর সংবাদ মাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, এক সপ্তাহে সংস্কারপন্থীদের হাতে ৭জন গ্রামবাসীকে অপহরণ করা হয়েছে। এরআগে ১৭ই সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় সুমন ত্রিপুরা কর্তৃক ধর্ষন করা হয় এক বাঙ্গালী গৃহবধুকে। এর আগে ১৩ই সেপ্টেম্বর জেলার দাতকুপিয়া এলাকায় সুধাংকর চাকমা কর্তৃক প্রতিবন্ধী নারী লালবানুকে যৌন নির্যাতন করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এছাড়াও নিয়ন্ত্রণহীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অংশ হিসেবে রাঙামাটি শহরের রাঙ্গাপানিস্থ সুখী নীলগঞ্জে বিকাশে চাঁদাগ্রহণকালে হাতেনাতে দুই সন্ত্রাসীকে আটকের পর সদলবলে হামলা চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় দুই চাঁদাবাজকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এভাবে সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে পাহাড়ের মানুষ। জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার ঠিক পূর্বক্ষণে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের পারস্পরিক দ্বন্ধ ও অস্ত্রবাজির তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এটা কিসের ইঙ্গিত বহন করছে তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মানুষ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচন, পর্যটন মৌসুম এবং সাম্প্রতিক সময়ে যৌথবাহিনীর সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান সবকিছুই দুঃশ্চিন্তার কারন হয়ে দাড়িয়েছে প্রশাসন, ব্যবসায়ি ও সাধারন মানুষের জন্যে। বিষয়টি নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে খোদ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার জানিয়েছেন, পাহাড়ের এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ছি। সন্ত্রাসীরা তথাকথিত অধিকার আদায়ের নাম করে পাহাড়ের সাধারণ মানুষজনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রেখেছে। একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আমাদের সেই অভিযোগেরই যথার্ততা প্রমান করছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছি। আগামী নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়ে দীপংকর তালুকদার বলেন, অন্যথায় পাহাড়ের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে ঘর থেকে বের হতে পারবে না।

এদিকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এমন তথ্য জানিয়ে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেছেন, আমরা বেশ সতর্কভাবেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশের ডিএসবি, এসবিসহ গোয়েন্দাদের সতর্কভাবে মাঠে রাখা হয়েছে। আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কোনো স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কোনো ঘটনার সাথে সাথেই আমরা সমন্বিতভাবে সেটি মোকাবেলায় প্রশাসন কাজ করছে। তিনি জানান আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ যদি পাহাড়ের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করতে চায় তাহলে কঠোর ভাষায় এর উত্তর দেওয়া হবে। সন্ত্রাসীদের কোনো দল বা ধর্ম নেই মন্তব্য করে পুলিশ সুপার বলেন, আমরা সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। একটি সুন্দর ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যা যা করার তার সর্বোচ্চটুকু করবো ইনশাআল্লাহ।

নির্বাচন ছাড়াও সাধারণত পাহাড়ে অক্টোবর থেকে মার্চ সময়কালকে পর্যটন মৌসুম ধরা হয়। এই সময়কে টার্গেট করেই প্রস্তুতি নেয় পর্যটন ব্যবসায়িরা। অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহে রাঙামাটিসহ পাহাড়ি জেলাগুলোতে পর্যটক আগমনের ডেউ দেখে আশায় বুক বেঁধেছিলো এখানকার ব্যবসায়িরা। কিন্তু আবহাওয়ার উত্তাপ কমে শীতল বাতাস শুরুর সাথে সাথে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অস্ত্রবাজরা। পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশায় গুড়ে বালির মতোই কয়েকদিন আগে রাঙামাটি খাগড়াছড়ি সড়কে পর্যটকবাহি গাড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলি ব্যবসায়িদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।