পাহাড়ে যারা সন্ত্রাস করে-জীবনহানী করে তাদেরকে সরকারই জন্ম দিয়েছেঃ সন্তু লারমা

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেছেন, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা (এমএন লারমা) ছিলেন প্রকৃত সৎ নীতির অধিকারী দয়ালু এবং ক্ষমাশীল প্রকৃতি অমায়িক ব্যক্তিত্ব। ষড়যন্ত্রকারী শত্রুদের ক্ষমা করে দেওয়ার ফলে তাকে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে জীবন দিতে হয়েছিল। সেই হত্যাকান্ড ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। হত্যাকান্ডের পেছনে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী, দেশী-বিদেশী ও বিভিন্ন মহলের নেতা-কর্মীরাই জড়িত ছিলো।

শনিবার ১০ই নভেম্বর জুম্ম জাতির অন্যতম নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার (এমএন লারমা) ৩৫তম মৃত্যু বার্ষিকী পালনে জনসংহতি সমিতি কর্তৃক আয়োজিত শোক র‌্যালী পরবর্তী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সন্তু লারমার আরো বলেন, পাহাড়ের শাসকগোষ্ঠীর কুচক্রীরাই পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। সেই ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পার্বত্যাঞ্চলে চুক্তির বিরোধিতা করে শাসকগোষ্ঠীরাই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। ষড়যন্ত্র করেই জনসংহতি সমিতির সুনাম নষ্ট করে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। যারা সন্ত্রাস করে, জীবন হানী করে তাদেরকে সরকারই জন্ম দিয়েছে। সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ঠিকই তার পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলে সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন সংগঠন। সেই পাঁচটি সংগঠন পাহাড়ে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। পাহাড়ে শাসকগোষ্ঠীদের মাধ্যেমে পাহাড়িরা নির্যাতন ও শোষিত হচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। জনসংহতি সমিতির নেতা কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

সন্তু লারমা আরো বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ২১ বছর পরেও মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। ৩৫ বছর পরেও পার্বত্যাঞ্চলে সামাজিক পরিস্থতি এখনো আগের মতন রয়ে গেছে। বেড়েছে ষড়যন্ত্র। পার্বত্যাঞ্চলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে যারা আন্দোলন ঘোষনা করে যাচ্ছে তারাই শাসকগোষ্ঠীদের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ জেগে উঠেছে। আগের মতন গামছা পড়া পাহাড়ি আর নেই। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে শিখেছে।

‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নসহ জুম্ম জাতির অস্তিত্ব সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আয়োজনে জুম্ম জাতির অন্যতম নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার (এমএন লারমা) ৩৫তম মৃত্যু বার্ষিকী যথাযোগ্য ভাব মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হয়। ১০ই নভেম্বর শনিবার সকালে রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমী বিশাল জনসভার শোক র‌্যালী বাহির করা হয়। শোক র‌্যালীটি রাঙামাটি মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে বনরুপা পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত শোক র‌্যালী শেষে আবারও রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে এসে সমাপ্ত করা হয়। হাতে ব্যানার, প্লেকার্ড নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, যুব সমিতি, মহিলা সমিতিসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ করে। শোকর‌্যালী শেষে রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমীতে জুম্মজাতির নেতা এমএন লারমার প্রতিচ্ছবিতে পুষ্পমাল্য প্রদান করা হয়। জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দসহ বিভিন অঙ্গ সংগঠন থেকে পুষ্পমাল্য প্রদান পূর্বক শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।শ্রদ্ধা নিবেদন পূর্বক ২ মিনিট নিরবতা পালন করে নেতাকর্মীরা।

স্মরণ সভা শুরু হওয়ার আগে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সদস্য মোনলিসা চাকমা। স্মরণ সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির সহ-সভাপতি কিশোর কুমার চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু)। আরো বক্তব্য রাখেন, ২৯৯নং রাঙামাটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্য গৌতম কুমার চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, শিক্ষাবীদ ও লেখক মংশানু চৌধুরী,জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন সদস্য নিরুপা দেওয়ান, রাঙামাটি জেলা যুব সমিতির সাধারণ সম্পাদক অরুণ ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি রিনা চাকমা প্রমূখ। এছাড়া সভায় জনসংহতি সমিতিসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ২৯৯ রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার এমপি বলেছেন, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা (এমএন লারমা) ছিলেন জুম্ম জাতির অগ্রদূত। জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের জন্য তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি কখনো মৃত্যুকে ভয় পান নি। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর শত্রুদেরকে বলেছিলেন, ‘আমাকে মেরে যদি জুম্ম জাতির অধিকার আদায় সম্ভব হয় তাহলে আমাকে মেরে ফেলতে পার’। মহান নেতা এমএন লারমাকে দেশী-বিদেশীদের ষড়যন্ত্র পূর্বক মেরে ফেলা হয়েছিল। এমপি মহান নেতা এমএন লারমাসহ তাঁর সাথে শহীদ হওয়া আট নেতাকর্মীদের বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এমপি আরো বলেন, ২১ বছর পরেও চুক্তির ৪৮ ধারা সমূহসহ ৮০% চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার বিভিন্ন ভাবে অজুহাত দেখিয়ে যাচ্ছে। অজুহাত সৃষ্টি না করে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে চুক্তি মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সরকারকে দৃষ্টি জ্ঞাপন করেন। পবিত্র ধর্মকে অবমাননা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান অবমাননা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য যে, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা (এমএন লারমা) ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠা। তিনিই প্রথম পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছিলেন। তিনি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য, আইনজীবি ও রাজনীতিবীদ। ১৯৮৩ সালে ১০ই নভেম্বর তিনি শত্রুদের হাতে শহীদ হন।