ডিসেম্বরে নিজ ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়!

॥ আলমগীর মানিক ॥

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান একাধিকবার রাঙামাটি সফরে এসে ডিসেম্বরের মধ্যেই রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রাথমিকভাবে চালু করা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত তা এ বছর চালু হচ্ছে না বলে জানা গেছে। তবে আশার কথা হলো, অবশেষে প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলোর সিংহভাগ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের প্রথমদিকেই কাজ শুরু হতে পারে এই বহুল প্রতিক্ষীত বিশ্ববিদ্যালয়টির নয়নাভিরাম ক্যাম্পাসের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে রাবিপ্রবির স্থায়ী ক্যাম্পস নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সরকারের কাছে ৫শ’ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এই প্রস্তাবনার সাথে একমতও হয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি। তবে এতো বেশি ব্যয় সাপেক্ষ প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের অনুমোদন লাগবে। এই অনুমোদন পাওয়া গেলেই টেন্ডার প্রক্রিয় শুরু করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এম এ মান্নান চলতি বছরের আগষ্টে রাঙামাটিতে শিক্ষকদের এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প উদ্বোধনের সময় এও জানিয়েছিলেন যে, কমিশনের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দ্রুততার সাথে শুরু করার বিষয়ে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক।

সূত্র জানায়, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ৫০০ কোটি টাকার অধিক ডিপিপি (প্রকল্প প্রস্তাবনা) বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে পাঠানো হয়েছে। নকশা ও মাস্টারপ্লান তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দক্ষ প্রকৌশলীদের দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্যাম্পাসে প্রতিটি একাডেমিক, দফতর ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। স্থাপনাগুলো যাতে এখানকার পরিবেশের জন্য কোনো ক্ষতিকারক বা ঝুঁকিপূর্ণ না হয় সেদিকটা বিবেচনায় রেখে নকশা ও মাস্টারপ্লান তৈরি হয়েছে। ভবনগুলো তিন তলার অধিক হবে না এবং প্রতিটি ঘর বা ভবন নির্মিত হবে পর্যটন পরিবেশের আদলে দৃষ্টিনন্দন রুপে।

এর আগে এই ক্যাম্পাসের জন্য ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে সকল প্রক্রিয়া শেষ করে তা কর্তৃপক্ষ বরাবরে হস্তান্তর করে জেলাপ্রশাসন। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে ভূমির ডিজিটাল সার্ভে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আগে নিজস্ব জায়গায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে অস্থায়ী স্থাপনা। সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাইস চ্যাঞ্জেলর (ভিসি) ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনে ১০০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে রাঙ্গামাটি সদরের ঝগড়াবিল মৌজায় ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আশেপাশে বাকি ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। অধিগ্রহণ করা জমির মালিক সবাইকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ৬৪ কোটি টাকায়। অধিগ্রহণ করা জমি জেলা প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে। এরপর ডিজিটাল সার্ভে সম্পন্ন করে ডিপিপি (প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রস্তুত করা হয়েছে। অধিগ্রহণ করা জায়গা থেকে কেউ কেউ গাছ কেটে নিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড লাগানো হলে তা উপড়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে- এমন ঘটনা ঘটছে কিছু কিছু। এজন্য দরকার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার। তাই অধিগ্রহণ করা জায়গায় অস্থায়ী পুলিশক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হবে।

ভিসি বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আগে নিজস্ব জায়গায় শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছু অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। শিগগিরই এসব অস্থায়ী স্থাপনার নির্মাণ শুরু করে আগামী তিন মাসের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। এরপর চলতি শিক্ষাবর্ষ হতে আমরা নিজস্ব জায়গায় নিজস্ব স্থাপনায় একাডেমিক ও শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব বলে আশা করছি। অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের জন্য বরাদ্দের ৫ কোটি টাকার মধ্যে ১ কোটি টাকা আমরা হাতে পেয়েছি।
তিনি জানান, শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় পাহাড়ি বাঙালি সবার ক্ষেত্রে সমহারে অগ্রাধিকার দেয়া আছে। এখানে কোনো রকম বিভেদ বা বৈষম্য নেই। নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নীতিমালা অনুসৃত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় বহু প্রতিবন্ধকতা ও নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিচ্ছি। ২০১৫ সালে একাডেমিক ও শ্রেণী কার্যক্রম শুরু বিশ্বদ্যিালয়টির। শুরু থেকে এ পর্যন্ত অনেক বাধাগ্রস্ত হয়েছি। বাধা এখনও দূর হয়নি। তবে শুরু যখন হয়েছে তা একদিন না একদিন তো সম্পন্ন হবে- এ বিশ্বাস তো আছেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রেখে সবাই মিলেমিশে এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে চতুর্থ ব্যাচ মিলে ৩৬১ শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষক রয়েছেন ১৬ জন। অনার্স কোর্সে দুই বিষয়ে পাঠদান চলছে। আরও কয়েকটি বিষয়ে পাঠদান অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। শিগগিরই এসব বিষয়ে পঠদানের অনুমোদন হবে।

২০০৮ সালে ক্ষমতায় যওয়ার পর রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু শুরু থেকে এর বিরোধিতা করে একাধিক মহল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও গড়ে ওঠে। ঘটেছে অপ্রীতিকর ঘটনা। এসবের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও শ্রেণী কার্যক্রম চালু করা হয় ২০১৫ সালের শুরুতে। বর্তমানে কম্পিউটার ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা- এ দুই বিষয়ে অনার্স কোর্সে চতুর্থ ব্যাচ নিয়ে চলছে পাঠদান। প্রক্রিয়া চলছে স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার। বর্তমানে শহরের শাহ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে পঠদান। আর দাফতরিক কাজ চলছে পর্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের একটি ভবনে। এছাড়া শহরের শিশু একাডেমি স্কুলে আরও দুই কক্ষ বিশ্বদ্যিালয়টির পাঠদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে বলে জানান ভিসি।

জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সদরের ঝগড়াবিল মৌজায় এরই মধ্যে ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তা হস্তান্তর করা হয়েছে। অধিগ্রহণ করা জমির মালিক প্রত্যেককে তাদের ক্ষতিপূরণের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী কাম্পাস নির্মাণে আর কোনো সমস্যা নেই। আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতা চাইলে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হবে।
স্থায়ী ক্যম্পাস নির্মাণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে এমন খবরে উচ্ছাস প্রকাশ করলেও যত দ্রুত সম্ভব এই কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আশু পদক্ষেপ কামনা করেছে শিক্ষার্থীরা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অপু জানান, সত্যি বলতে কি আমরা নিদারুণ কষ্ঠে নিজেদের পাঠ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। স্যাররাও অসহায় বলা বাহুল্য যে, বর্তমানে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলছে তাদের পক্ষ থেকে নানা ধরণের চাপ এবং হয়রানী মুলক আচর রয়েছে।