চরম অব্যবস্থাপনায় রাঙামাটি মারী স্টেডিয়াম!

॥ সৌরভ দে ॥

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির রয়েছে অসামান্য ক্রীড়া ঐতিহ্য। তবে সে তুলনায় নিকট অতীতে খেলাধুলা নিয়ে মাতামাতির চেয়ে জেলা ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো নেতৃত্ব নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। ফলে যেমন খেলাধুলা বা বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজনে স্থবিরতা ছিল তেমনি খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি, স্টেডিয়াম বাড়ানো, সৌন্দর্য বর্ধন বা অন্যান্য কার্যক্রমও ছিল অনেক দায়সারা গোছের। এই পর্যটন নগরীতে কাগজে কলমে দু’টি স্টেডিয়াম থাকলেও কোনোটাই পরিপূর্ণ নয়। ডিএসএর নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর হালে এখানে খেলা-ধুলায় কিছুটা প্রাণের সঞ্চার এলেও ব্যবস্থাপনা বা পরিবেশ উন্নয়নে তারা তেমন নজর দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করলেন খেলোয়াড় ও দর্শক সাধারণ।

তাদের মতে, এখনও বেশ অব্যবস্থাপনার মধ্যেই চলছে রাঙামাটি চিং হ্লা মং মারী স্টেডিয়াম। অবকাঠামোভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকলেও নানা অব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে স্টেডিয়ামের মূল ভবনের ভিতর। ভেতরের পরিবেশ বেশ নোংরা ও দুর্গন্ধময়। সরেজমিনে গিয়ে স্টেডিয়ামের খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুমের বেশ হতশ্রী অবস্থা দেখা গেলো। ড্রেসিং রুমের বেসিন সবকয়টি ভাঙা, বেসিনে নেই কোন পানির কল, ফ্লোরে সবসময় পানি পড়ে বেশ পিচ্ছিল হয়ে থাকায় যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। টয়লেটের জানালার গ্লাস ভাঙা হওয়ায় খেলোয়াড়দের থাকছে না কোন প্রাইভেসী। ওয়াশ রুমটি এভাবে অপরিচ্ছন্ন আর অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় থাকার খেলোয়াড়েরা তা স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারছে না।

খেলোয়াড়েরা কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেসিং রুম নিয়ে আমাদের অভিযোগ অনেক দিনের, স্টেডিয়ামের নতুন গ্যালারী নির্মান করা হচ্ছে কিন্তু আমাদের ড্রেসিংরুম নিয়ে দাবী কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। এছাড়াও স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ নাজুক বলেও জানান অনেকে। সিসি ক্যামেরা না থাকায় স্টেডিয়ামে প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে বলে জানায় তারা। স্টেডিয়ামে আসা খেলোয়াড়, ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়ামোদিদের মোবাইল, নগদ টাকাসহ অন্যান্য মালামাল প্রায়ই চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। স্টেডিয়ামের ভেতর-বাইরে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। খেলা চলাকালীন খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম থেকেও জিনিসপত্র চুরি হয় বলে খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। রাতের আধাঁরে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ভবনের মুল বিদ্যুতের তার চুরি করে নিয়ে যায় চোরের দল। মুল ভবনের সামনে থেকে বিভিন্ন সময়ে মোটর বাইকের বিভিন্ন পার্টস চুরি হচ্ছে হরহামেশাই। মূলত সিসি ক্যামেরা না থাকায় এই ধরণের চুরি অনায়াসেই ঘটছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করা হলেও আশ্বাস ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি বরুন দেওয়ানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ড্রেসিং রুম সংস্কারের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে ইতিমধ্যেই একটা আবেদন দেওয়া হয়েছে। সহসা সংস্কার না হলেও নির্বাচনের পর ড্রেসিং রুম সংস্কার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি হতাশার সুরে বলেন, আমি নিজ উদ্যোগে অনেকবার এই ড্রেসিংরুম সংস্কার করে দিয়েছি কিন্তু বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপসহ গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন স্কুলের খেলাধুলা এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। মুলত এইসময় স্কুলের শিক্ষার্থীরা ড্রেসিংরুমের বেসিনসহ অন্যান্য জিনিস ভেঙে দিয়ে যায়।

স্টেডিয়ামের মূল ভবনে চুরির বিষয়টির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, খেলোয়াড়দের জিনিসপত্র তাদের নিজ দায়িত্বে রাখতে হবে। আমার নিজেরই জিনিসপত্র অনেকবার চুরি হয়ে গিয়েছে। ড্রেসিংরুমে জিনিসপত্র ফেলে না রেখে মাঠে নিয়ে গেলেই চুরি হওয়ার আর ভয় থাকে না। এইক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে দায়ী না করে খেলোয়াড়দের আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে নিরাপত্তা নিয়েও উঠেছে বেশ কিছু অভিযোগ। ৭ নভেম্বর বুধবার বিকেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগের খেলায় মুখোমুখি হয় রাইজিং স্টার ক্লাব বনাম উইন স্টার ক্লাব। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উভয়পক্ষের খেলা ১-১ গোলে ড্র হয়। বাজে রেফারীং ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে উচ্ছৃঙ্খল জনতা হঠাৎ করে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে অতর্কিত ভাবে ক্রীড়া ভবনে হামলা চালায়। এসময় তাদের হামলায় ক্রীড়া ভবনের বেশকিছু জানালার গ্লাস ভাংচুর, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক সদস্য প্রদীপ বড়ুয়া, ক্রীড়া সংগঠক দীপংকর খীসা এবং সিএইসটি স্পোর্টস অনলাইনের সম্পাদক দীপ্ত হান্নান’র মোটরবাইক হামলার শিকার হয়। উক্ত ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা জানান, উচ্ছৃঙ্খল দর্শকের হামলার সময় কোন পুলিশ ছিল না।

উল্লেখ্য, পর্যটন নগরী রাঙামাটিতে ১৯৮০ সালের দিকে রাঙামাটির চিং হ্লা মং মারী স্টেডিয়ামটির কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার কর্তৃক ২০০০ সালে পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ৬ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যালারি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে স্টেডিয়ামাটিতে পূর্ণাংগ গ্যালারী নির্মিতব্য অবস্থায় আছে। জেলার ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে আরেক পর্যটন জেলা কক্সবাজারে নান্দনিক স্টেডিয়াম হলেও অন্যতম গুরুত্বপুর্ন পর্যটন জেলা রাঙামাটির এই স্টেডিয়ামটি এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামের মাঠ সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলে এটি আন্তর্জাতিক মানে রূপ লাভ করবে। রাঙ্গামাটির মারী স্টেডিয়ামটি অত্র অঞ্চলের খেলাধুলার মূলকেন্দ্র। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এটিকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।