মাটিতে বসে শিশু শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত শেখালেন পুলিশ সুপার!

॥ আলমগীর মানিক ॥

শুদ্ধ উচ্চারণে এবং সঠিক সুরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের বিষয়টি এখন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এরপরও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এ ক্ষেত্রে রয়ে যাচ্ছে নানা সীমাবদ্ধতা। সেই সীমাবদ্ধতা দেখে এগিয়ে এলেন পুলিশ সুপার। কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত শিক্ষা দিলেন তিনি। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবীর বুধবার শহরের পুলিশ লাইন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজ হাতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত শিখিয়েছেন।

জেলার অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা একেবারে ফ্লোরে বসে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংগীত প্রশিক্ষণের ঘটনাকে বিরল আখ্যায়িত করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকরা। এদিকে পুলিশ সুপারের কন্ঠের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে একই সাথে বসে গলা ছেড়ে জাতীয় সংগীত গাইতে পেরে ব্যাপক খুশি কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও।

জানাগেছে, বুধবার রাঙামাটি জেলা পুলিশ কর্তৃক পরিচালিত পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা ও অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠান ছিলো। পদাধিকার বলে উক্ত অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও জেলা পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবীর উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন সকাল দশটার সময়। এসময় শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান শেষে আয়োজিত অভিভাবক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার। অনুষ্টানের শেষে বিদ্যালয়ে বিভিন্ন কক্ষ পরিদর্শনের সময় শিশু শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে সেখানে সংগীত শিক্ষার ক্লাসে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলা শুরু করেন। এসময় শিক্ষার্থীরা পুলিশ সুপারকে কাছে পেয়ে ব্যাপক আনন্দে মেতে উঠে। পুলিশ সুপারও সকলকে ডেকে একে একে কোলে তুলে নিয়ে তাদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেন। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর তার পায়ের জুতা খুলে ফ্লোরের মেঝেতে বসেই বিদ্যালয়ের হারমোনিয়াম বাজাতে থাকেন। এসময় তিনি শিশুদের সকলকেই জাতীয় সংগীত গেয়ে শোনান। শিশুরাও পুলিশ সুপারের সাথে গলা মিলিয়ে গাইতে থাকে জাতীয় সংগীত। প্রায় আধা ঘন্টা সময় শিশুদের মাঝে কাটিয়ে তাদেরকে জাতীয় সংগীত শিখিয়েছেন।

এই বিষয়ে পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর এর মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যখন দেখলাম যে, শিশুদের সংগীত ক্লাস চলছে; তখনই আমি তাদেরকে নিয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে বসে গেলাম। কারন আমি চাই শিশুরা সংগীত শেখার সময় প্রথম সংগীত শিখা শুরু করুক জাতীয় সংগীত দিয়ে। তিনি বলেন, শিশুদের মাঝে দেশপ্রেম সৃষ্টি করতে হলে তাদেরকে জাতীয় সংগীত দিয়েই শুরু করতে হবে। একারনেই আমি নিজেই তাদেরকে দিয়ে শুরুটা করে দিলাম। এতে করে তাদের মনের মাঝে যেমনিভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা-মমতা ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হবে। তবেই আমরা এদেরকে আগামীতে এক একজন দেশপ্রেমিক অসাম্প্রদায়িক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো। এছাড়াও এসকল শিশুদের নিয়ে সংগীতের ক্লাসে গাইতে পেরে নিজেরও বেশ ভালো লেগেছে বলেও মন্তব্য করেছেন পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর।

এদিকে, পুলিশ সুপার কর্তৃক জাতীয় সংগীত শিক্ষা দেওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত বিরল দৃশ্য উল্লেখ করে উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বিশেষ অতিথি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর নেয়াজ আহম্মেদ জানান, আমি বিগত ২০১১ সাল থেকে এই বিদ্যালয়ের সাথে জড়িত। এবারই প্রথম এই ধরনের একটি মনোরম দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। নেয়াজ বলেন, ভাই আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলামনা যে একজন পুলিশ সুপার সামান্য ঝাড়ু পর্যন্ত না দেওয়া ফ্লোরে কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই ইউনিফর্ম পড়া অবস্থায়ই বসে শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করলেন। এসময় শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে অন্যরকম আনন্দ লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশ সুপার বেশকিছুক্ষণ মেঝেতে বসেই শিক্ষার্থীদেরকে জাতীয় সংগীত গাওয়ার প্রশিক্ষণ দেন। উক্ত অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন পিটিআই ইন্সট্রাক্টর মাহমুদুল হাসান। এসময় ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর নেয়াজ আহম্মেদ, প্রধান শিক্ষক চিকোচি মগ, সদস্য রিংকু বড়ুয়া, লোকমান হোসেনসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকগণ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশে যোগ দিতে আসা লোকমান হোসেন জানান, আমার ভেতরে অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করছে এই ভেবে যে, আমার সন্তান এমনই একটা বিদ্যালয়ে পড়ছে যে বিদ্যালয়ে পুলিশ সুপার নিজেই মেঝেতে বসে আমার সন্তানকে জাতীয় সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন। এটা অত্যন্ত বিরল দৃশ্য মন্তব্য করে লোকমান বলেন, জেলা পুলিশের একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার এই ধরনের মানবিক গুণাবলি আগে কখনো চোখে পড়েনি। আজকে পুলিশ সুপারের কারনেই আমাদের সন্তানরা নতুনভাবে অনুপ্রেরিত হয়েছে। সু-শিক্ষার বিস্তার এভাবেই ঘটে বলেও মন্তব্য করেন লোকমান।