আজ প্রার্থিতা দাখিলের শেষ দিন ‘কিন্তু’ এবং ‘তবে’র বেড়াজালে পাহাড়ের নির্বাচনী মাঠ!

॥ আনোয়ার আল হক ॥

আজ বুধবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা দাখিলের শেষ দিন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও তা পূরণ করে জমা দেওয়া যাবে। তবে এবার অনলাইনেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও ১১ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার দিন থেকে এই সুযোগ ছিল। কিন্তু আমাদের দেশে রেওয়াজ অনযায়ী প্রার্থীরা সাারণত: শেষ দিনেই প্রার্থীতা দাখিল করে থাকেন। আজ বিকাল ৫টার পর থেকে আর কারো প্রার্থিতার খায়েশ প্রদর্শনের সুযোগ থাকবে না। তবে চুড়ান্ত প্রার্থী কারা থাকছেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

আরপিও অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করায় এবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় তেমন একটা উচ্চ-বাচ্য বা ভীড় থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। এদিকে প্রার্থীতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সারাদেশে জনগণের চোখ আজ তীক্ষ্ণ থাকলেও তিন পার্বত্য জেলার তিনটি আসনে এই আগ্রহটা একটু বেশিই থাকবে। এই তিন জেলায় রাজনৈতিক নানা সমীকরণসহ প্রধান দলগুলোর প্রর্থীতা নিয়েও বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে।

রাঙামাটির কথাই ধরা যাক, এ আসনে মহাজোট থেকে একক প্রার্থী এখন দীপংকর তালুকদার। তিনি দলীয় দৃষ্টিকোন হতে শুরু থেকেই সর্বেসর্বা হিসেবে সারা দেশেই গুটি কয়েক একক প্রর্থীর মধ্য থেকে একজন। মাঝে মহাজোট ইস্যুতে তার প্রার্থীতা নিয়ে কিছু নেতিবাচক গুজব শোনা গেলেও সবার মুখে ছাই দিয়ে কাক্সক্ষীত টিকেটটি তিনি সময় মতই অর্জন করেছেন। জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, তিনি আজ বিকাল ৩টার দিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সরাসরি মনোনয়ন দাখিল করবেন।

কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় দু’জনের নাম রয়েছে। একজন মণি স্বপন দেওয়ান অন্যজন দীপেন দেওয়ান। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রার্থী হিসেবে দুই দেওয়ানই যোগ্য, তবে দলের প্রতি আনুগত্যের হিসেবে এডভোকেট দীপেন দেওয়ান কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন। তবে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ রয়েছে জেলা বিএনপি’র কারণে। জানা গেছে জেলা বিএনপির একটি বিশাল অংশের সাথে তার দুরত্বের কারণে জেলা কমিটি তার বিষয়ে কেন্দ্রকে প্রকাশ্যেই নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে এসেছেন। পক্ষান্তরে সাবেক উপমন্ত্রী মণি স্বপন দেওয়ান দীর্ঘদিন পর নির্বাচন ঘিরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও তার সাথে অন্ততঃ জেলা কমিটির মূল অংশটি মনোনয়ন দাখিল করতে যাবেন বলে জানা গেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এডভোকেট দীপেন দেওয়ানও ছেড়ে কথা কইবেন না। জেলা বিএনপির একটি অংশ মনোনয়ন দাখিলের সময় তার সাথেও থাকবেন।

এদিকে রাঙামাটির অন্য হিসাবটি বেশ জটিল। এই আসনের বর্তমান এমপি আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসছেন তা মোটামোটি নিশ্চিত। যদিও বাজারে তার প্রতি জেএসএসএর আস্থা নিয়ে কিছু গুজব শোনা গিয়েছিল, আখেরে তা ¯্রফে গুজব হিসেবেই উড়িয়ে দিয়ে উষাতনের ঘনিষ্ট সূত্র। পাশাপাশি দলীয় প্রধান সন্তু লারমার ঘটিষ্ট সূত্রগুলোও জানিয়েছে শেষ পর্যন্ত বরফ গলেছে এবং তিনি সিটিং এমপি’র প্রতিই আস্থা রেখেছেন। তবে জনসংগতি নিবন্ধিত দল না হওয়ায় তাদের প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবেই মনোনয়ন দাখিল করবেন।

হিসাবের গড়মিল দেখা দিয়েছে ইউপিডিএফ এর প্রার্থীতা প্রদর্শনের কারণে। অতীত ইতিহাস বলছে এই আসনে ইউপিডিএফের ৩০ হাজারেরও অধিক ভোট ব্যাংক রয়েছে। এই ভোট ব্যাংকের দিকে প্রতিদ্বন্দ্বী তিনটি পক্ষেরই নজর রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কারা তাদের আস্থায় নিতে পারবে অথবা আদৌ এই দল প্রার্থীতা দাখিল বা প্রত্যাহর করবে কিনা তা দেখার জন্য আজ, ৯ ডিসেম্বর এবং তার পরবর্তী সময় পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।
এদিকে বান্দরবানে মহাজোটের প্রার্থীতা একক কব্জায় চলে গেছে বীর বাহাদুরের। এতদিন অনেকে লম্ফঝম্প করলেও তারা শেষ পয়ন্ত ধোপে টিকেনি। কিন্তু বিএনপিতে দু’জনের তালিকা থাকায় কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে বোমাং রাজ পরিবারের সদস্য সাচিং প্রু জেরীর সাথে এই আসনে যৌথভাবে বিএনপির পক্ষ থেকে যার নাম রাখা হয়েছে; জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম সোলতানা লীনাও জেরী পন্থি হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছে বান্দরবান বিএনপি। তাই যদি হয় তবে তো সোনায় সোহাগা। ৯ তারিখে জেরিও হবেন একক প্রার্থী।

কিন্তু বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে খাগড়াছড়ি আসন নিয়ে। এই আসনে কংজুরি শেষ পর্যন্ত মহাজোটের একক মাঝি। কিন্তু বিএনপি এখানে ব্যতিক্রম। বেশির ভাগ আসনে বিএনপি দ্বৈত প্রার্থী রাখলেও এই আসনে অদুদ ভূঁইয়াকে একক কান্ডারী ভেবেছিলেন। তাই বিকল্প কারো নাম ঘোষণা করেননি। কিন্তু আদালতের রায়ে তার দৌড় আটকে গেছে। এখন সেখানে কে প্রার্থী হচ্ছেন নিশ্চিতভাবে বুঝতে হলে তাও ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটি বলেছে, তাদের প্রার্থীর অনুকূলে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়ার মাধ্যমে প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। অর্থাৎ ৩০০ আসনে কে হবেন ধানের শীষের প্রার্থী, তা জানতে প্রার্থী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষকে অপেক্ষা করতে হবে আরও ১১ দিন।
তথ্য বলছে, সারা দেশে বিএনপির অনেক নেতার নামে মামলা আছে। অনেকে ‘মিথ্যা’ মামলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ কারণে বিভিন্ন আসনে একাধিক প্রার্থীর নাম রাখা হয়েছে। একজন বাদ পড়লে যেন ওই আসনে দ্বিতীয়জন কিংবা তৃতীয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। তা ছাড়া এটা কৌশলেও অংশ। এদিকে খাগড়াছড়ি আসনেও আঞ্চলিক দল এখন পর্যন্ত ফ্যাক্টর হয়ে রয়েছে।

তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আজ মনোনয়ন দাখিল করলেও শুরু করা যাবে না প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পরই প্রচারণার কাজ শুরু করা যাবে। লক্ষণীয় যে, আরপিও অনুযায়ী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার সময় প্রার্থী বা তার পক্ষে ৫ জনের বেশি লোক রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে ভিড় করতে পারবেন না। নির্বাচন সামনে রেখে কোনো প্রার্থী জনসভা, মিছিল, মিটিং করতে পারবেন না। কেবল পথসভা করতে পারবেন। প্রার্থীদের পোস্টার হতে হবে সাদাকালো। প্রতিটি পোস্টারের নিচে পোস্টারের সংখ্যা, প্রেসের ঠিকানা, প্রকাশকের নাম দেয়া বাধ্যতামূলক। না হলে সেসব পোস্টার নির্বাচন কমিশনের কাছে অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

পোস্টারের সাইজ হতে পারবে সর্বোচ্চ ২৩ ইঞ্চি বাই ১৮ ইঞ্চি। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার নন- এমন কাউকে পোলিং এজেন্ট করা যাবে না। নির্বাচনের ২৪ ঘণ্টা আগে পোলিং এজেন্টদের দুই কপি ছবি এবং নামের তালিকা রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে। প্রার্থী হলে পে-অর্ডার বা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা জামানত দিতে হবে। রিটার্নিং অফিসারের অনুকূলে এ টাকা জমা দিতে হবে।

এছাড়া মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় হলফনামা আকারে ৮টি তথ্য দিতে হবে। ব্যয়ের উৎসের বিবরণী, আয়কর রিটার্নের কপি জমা দিতে হবে। মনোনয়ন ফরমে কোন ভুল হলে প্রার্থিতা বাতিল হবে। তাই সম্ভাব্য প্রার্থীকে সতর্কতার সঙ্গে মনোনয়নপত্র পূরণ করতে হবে। মনোনয়ন দাখিলের আগে প্রার্থীকে অবশ্যই যে কোনো তফসিলি ব্যাংকে নতুন হিসাব খুলতে হবে। নির্বাচনের সমুদয় ব্যয় এ অ্যাকাউন্ট থেকেই করতে হবে। এই অ্যাকাউন্টের নম্বর, ব্যাংক ও শাখার নাম মনোনয়নপত্রে উল্লেখ করতে হবে। নির্বাচনের ফলের গেজেটে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং অফিসার এবং কমিশনে জমা দিতে হবে। এছাড়া ব্যক্তিগত খরচের হিসাব ফল প্রকাশের ৭ দিনের মধ্যে কমিশনে জমা দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের পুনঃতফসিল অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর প্রার্থিতা দাখিলের শেষ দিন। মনোনয়নপত্র বাছাই ২ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৯ ডিসেম্বর। আর প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ১০ ডিসেম্বর। আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এমনি নানা আঙ্গিকের ‘কিন্তু’ এবং ‘তবে’র বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে পাহাড়ের নির্বাচনী মাঠ। যার জট খুলতে সময় লাগতে পারে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত।