রাঙামাটিতে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নানা গুঞ্জন!

॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥

আসন্ন ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯নং পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছে দলটির হাইকমান্ড। তবে তার যদি কোনো সমস্যা হয় বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিতে চিঠি দেয়া হয়েছে, সাবেক পার্বত্য উপমন্ত্রী মণিস্বপন দেওয়ানকে। কিন্তু এরপরও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে জেলা বিএনপিতে দলের মধ্যেই নানা ধরনের গুজব, মিথ্যাচার ও প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বলা হচ্ছে, দীপেন দেওয়ানের দলীয় প্রার্থিতার বিষয়টি নিশ্চিত করে দেয়া হলেও দলটির কতিপয় সুবিধাবাদী ও দীপেনবিরোধী জেলা নেতাকর্মী মিথ্যাচার করে মণিস্বপন দেয়ানকে লন্ডন থেকে তারেক রহমান মনোনয়ন দিয়েছেন বলে বিভ্রান্তি ও প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। যা দলীয় প্রার্থীকে হটানোর চেষ্টায় ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এর মূল উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করে দেয়া। যা তাদের আওয়ামী লীগ থেকে বিভিন্ন সুবিধার ফায়দা লোটার মূল কারণ বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

তারা বলছেন, দীপেন দেওয়ানের জয় নিশ্চিত দেখে কতিপয় নেতাকর্মী মণিস্বপন দেওয়ানকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। কারণ দলীয় সুবিধাভোগী মণিস্বপন দেওয়ান এতটা বছর দলে ছিলেন না। তিনি জনবিচ্ছিন্ন। তাই তার মনোনয়নের বিষয়ে কোনো রকম প্রশ্নই আসে না। মণিস্বপন দলের বসন্তের কোকিল।

জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জহির আহম সওদাগর বলেন, আসনটি পুনরুদ্ধারে দীপেন দেওয়ানের কোনো বিকল্প নেই। দীপেন দেওয়ান যোগ্য, জনপ্রিয় এবং ত্যাগী নেতা। তিনি জেলা যুগ্ম জজ থেকে সরকারি চাকরি ইস্তফা দিয়ে জরুরি অবস্থার সময় এ জেলায় দলের হাল ধরেছেন। দীপেন দেওয়ানের জয় নিশ্চিত দেখে, হাইকমান্ড তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। মণিস্বপন দেওয়ানকে চিঠি দেয়া হয়েছে, বিকল্প প্রার্থী হিসেবে। চূড়ান্ত মনোনীত দলীয় মূল প্রার্থী দীপেন দেওয়ান। এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

জেলা বিএনপির আরেক সহ-সভাপতি ও সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টো বলেন, দীপেন দেওয়ানই দলের মনোনীত প্রার্থী। দলের কিছু সুবিধাবাদী মণিস্বপনকে নিয়ে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে মণিস্বপন দেওয়ান বিএনপির প্রার্থী হয়ে জয়যুক্ত হলেও তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে দল ছেড়ে এলডিপিতে চলে গেছেন। তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। তাকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিতে বলা হলেও তিনি মনোনীত নন। দীপেন দেওয়ানের কোনো সমস্যা হলে পরে সেটা দেখা যাবে। দীপেন দেওয়ান দলের দু:সময়ে মাঠে ছিলেন, এখনও আছেন। তিনি যোগ্য, জনপ্রিয় ও ত্যাগী। তাই আসনটি পুনরুদ্ধারে দল থেকে দীপেন দেওয়ানকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। দীপেন দেওয়ানের জয় শতভাগ নিশ্চিত। মণিস্বপন দেওয়ান এতটা বছর দলে না থেকে তার মনোনয়ন প্রশ্নই ওঠে না। দীপেন দেওয়ান এ জেলায় দলের হাল ধরেছেন।

জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মমতাজ মিয়া বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় যখন কেউ ছিল না, তখন এ জেলায় দলের হাল ধরেছেন দীপেন দেওয়ান। চাকরী ছেড়ে তাকে দলে আনা হয়েছে। তিনি অনেক ত্যাগ স্বীকার করে আসছেন দলের জন্য। যে কারণে এ জেলায় দলের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে। তাই দীপেন দেওয়ানকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। মণিস্বপনকে আমরা চিনি না।

জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বিএনপির প্রভাশালী নেতা সেলিম উদ্দিন বাহারী বলেন, দীপেন দেওয়ান এ জেলার পাহাড়ি বাঙালির সবার মাঝে জনপ্রিয় একজন নেতা। মণিস্বপনকে নিয়ে মাঠে নামবে না বিএনপির নেতাকর্মীরা। কারণ বিএনপি নেতাকর্মীরা মণিস্বপনের মতো হালুয়া রাজনীতি করে না।

বাঘাইছড়ির সাবেক মেয়র মো. আলমগীর কবির বলেন, মণিস্বপনকে কেউ ভোট দেবে না। তিনি সুবিধাভোগী। দীপেন দেওয়ানের জয় নিশ্চিত হয়ে নেতাকর্মী সবাই কাজ করতে উজ্জীবিত। তাই দল থেকে তাকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে। ওইসব প্রপাগান্ডায় দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও জনগণ কেউ কান দেবে না।

কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা বিএনপির সভাপতি দিলদার হোসেন বলেন, মণিস্বনকে দল থেকে বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার মানে এই নয় যে, তাকে দল মনোনয়ন দেবে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দীপেন দেওয়ানকেই এ আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে। কারণ বিএনপি মূল স্রোতের বাইরে যায়নি। যিনি দীর্ঘদিন ধরে দলে ছিলেন, কাজ করেছেন দল তাকেই মনোনয়ন দিয়েছে।

জানা যায়, দীপেন দেওয়ান ছিলেন চাঁদপুর জেলার যুগ্ম জজ। স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন ২০০৬ সালে। ছাত্র জীবনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দীপেন দেওয়ান ছিলেন ছাত্রদলের প্রভাবশালী নেতা। এ ছাড়া তার বাবা প্রয়াত সুবিমল দেওয়ান ছিলেন, জিয়াউর রহমানের একান্ত ঘনিষ্টজন, জেলা বিএনপির নেতা এবং তৎকালীন সরকারের উপমন্ত্রী মর্যাদাসম্পন্ন উপজাতীয়বিষয়ক উপদেষ্টা। ২০০৭ সালের বাতিল হওয়া নির্বাচনে রাঙ্গামাটি আসনে দলীয় প্রার্থী ছিলেন দীপেন দওয়ান। পরে দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালে দুর্দিনের ক্রান্তিলগ্নে রাঙ্গামাটিতে দলের হাল ধরেন দীপেন দেওয়ান। ওই সময়ে জেলায় ও প্রতিটি উপজেলায় তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী অবস্থানে তুলে আনতে সক্ষম হন তিনি। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনি জটিলতার কারণে রাঙ্গামাটি আসনে দীপেন দেওয়ান প্রার্থী হতে না পারায় তার সহধর্মিনী মৈত্রী চাকমাকে মনোনয়ন দেন, খোদ দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।

দীপেন দেওয়ান বলেন, আমি দলের জন্য কাজ করেছি, শ্রম দিয়ে যাচ্ছি। সেজন্য দল থেকে আমাকে মূল্যায়ন করেছে। আমি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক জিয়াসহ কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের কাছে গভীর কৃতজ্ঞ। আমি ম্যাডামকে রাঙ্গামাটি আসনটি উপহার দিতে পারব- এটা শতভাগ নিশ্চিত আমি।

তিনি বলেন, দলের মূল প্রার্থী হিসেবে আমাকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে চূড়ান্ত করে দেয়া হয়েছে। দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। তবে কোনো কারণে যদি আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতায় ব্যর্থ হই, তাহলে আমার পরে যিনি তখন তার কথা আসবে। আমাদের মূল লক্ষ্য দলের চেয়ারপরসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনা। এ জন্য ধানের শীষে জয় নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে হবে। তিনি এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও জনগণের প্রতি আহবান জানান।

মণিস্বপন দেওয়ান বলেন, দলের প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। তবে দল যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে থাকব।