বাঘাইছড়িতে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জ্বালানী সাশ্রয়ী আখাচূলা!

॥ মো: ওমর ফারুক সুমন – বাঘাইছড়ি ॥

বাঘাইছড়িতে জ্বালানী সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যকর আখাচূলা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, রান্না করার পর উচ্ছিষ্ট বায়ুচার (ছাই) উন্নতমানের সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি জমিতে। ফলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে চূলাটি।  বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো: বাহার উদ্দিন সরকার বলেন আমি চূলাটি দেখেছি এটির গুনাগুন দেখে আমি অবাক হয়েছি ভাবছি খুব দ্রুত নিজ বাড়ীতে একটি প্রতিস্থাপন করবো এবং অন্যদেরকেও উৎসাহী করে তুলবো। কালের বিবর্তনে পৃথিবীতে রান্নার জন্য বিভিন্ন চূলা তৈরি করা হলেও এবার পরিবেশ ও জলবায়ুর  কথা মাথায় রেখে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় “আখাচূলা ” নামের একটি চূলা তৈরি করা হয়েছে। এ চূলার মূল বৈশিষ্ট হলো- ত্রিমুখী একদিকে যেমন জ্বালানী সাশ্রয়ী  তেমনি স্বাস্থ্যকর,  চূলাটি ধুঁয়াবিহীন হওয়ায় রাঁধুনীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তাই কম খরচে  ধনী-গরীব সকল রাধুঁনী চাইলে এ চূলাটি অনায়েসেই ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়াও  চূলায় রান্নার উচ্ছিষ্ট বায়ুচার (ছাই) সার হিসেবে কৃষি জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যাবে।  একবার জমিতে এ ছাই ব্যবহার করার পর দশ থেকে বারো বছর পর্যন্ত ভালো ফল পাওয়া  যাবে। তাই  অধিক ফসল উৎপাদনে বিকল্প সার হিসেবে চূলাটি থেকে উৎপাদিত ছাইটিকে ব্যবহার করতে পারবেন অনায়াসেই এবং বায়ুচার (ছাই) বাজারজাত করে করা যাবে বাড়তি আয়ও। অধিক গুণের অধিকারী জ্বালানী সাশ্রয়ী এই চূলাটি তাই ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাঘাইছড়িতে।  বাংলাদেশে  প্রথম মানিকগঞ্জ জেলায় এ চূলা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং কার্যক্রম শুরু করা হয়। কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলিয়ান উইন্টার নামের এক শিক্ষক এবং বাংলাদেশ খ্রিষ্টান ফর ডেভেলপমেন্ট এর যৌথ উদ্যোগে এ চূলা তৈরির প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য হলো- বাংলাদেশের তৃণমূল দারিদ্র মানুষের জ্বালানি খরচ বাচানো এবং পরিবেশকে দূষণ মুক্ত রাখা। তাই তারা মানিকগঞ্জে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম  শুরু করে যাহা বর্তমানেও চলমান রয়েছে।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নাদিম সারওয়ার এই চূলার গুণমুগ্ধ হয়ে  এবং বাঘাইছড়ি  উপজেলার মানুষের কথা চিন্তা করে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলার কৃষি ব্লক সুপারভাইজার মো: বদি আলমকে প্রধান করে চার সদস্যর একটি দলকে মানিকগঞ্জে প্রেরণ করে চূলা তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য। সফল ভাবে প্রশিক্ষণ শেষে বাঘাইছড়ি উপজেলায় ফিরে এসে নিজেরা জ্বালানী সাশ্রয়ী আখাচূলা তৈরি করেছে এবং সে চূলায় রান্না শুরু করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নাদিম সারওয়ারের  লক্ষ্য পুরো উপজেলার প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠির মানুষদের মাঝে স্বাস্থ্যসম্মত আখা চূলাটি ছড়িয়ে দেওয়া। সেই লক্ষ্যে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও সংবাদকর্মীদের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন ইতোমধ্যে।  বাঘাইছড়ি উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন  আখাচূলায় লাকড়ি, কাঠের ভূসি, শুকনো গোবর  ব্যবহার করে বায়োচার উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এটি ব্যবহারে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অনুজীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। মাটির জৈব গুণাগুণ বাড়িয়ে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।

বায়োচার প্রজেক্টের টিম লিডার কৃষি ব্লক সুপারভাইজার বদি আলম বলেন প্রচলিত চুলায় বেশি খড়ির প্রয়োজন হয় । কিন্তু ‘আখাচূলায় খড়ি কম লাগে ও ধোঁয়া হয় না। রান্নায় কম সময় লাগে ও সবসময় চুলার পাড়ে বসে থাকতে হয় না। এ চুলা ব্যবহারে ধোঁয়াজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব, সময়ও সাশ্রয় হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নাদিম সারোয়ার  বলেন মানুষের দৈনন্দিন গৃহস্থালির রান্নার কাজে জ্বালানি একটি প্রধান সমস্যা। বাঘাইছড়ি উপজেলায়  জ্বালানী সমস্যা বেড়েই চলেছে। রান্নার কাজে সিলিন্ডার গ্যাস কিছুটা প্রয়োজন মেটাতে পারলেও সিংহভাগ জনগণের রান্নার জ্বালানির চাহিদা মেটাতে হয় কাঠ বা খড়ি দিয়ে। আর এতে করে অর্থ ও সময় দুটোই নষ্ট হয়। আর এই আখাচূলা ব্যবহার করলে কাঠের ওপর চাপ কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়সহ জৈব সারের ঘাটতি লাঘবে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক রান্নাঘরে অনায়াসেই অল্প পরিমাণে জ্বালানি কাঠ দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করা যায় এবং ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশে গৃহিণীরা রান্নার কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। রান্না শেষে যে বায়োচার (ছাই)  হবে সেগুলো প্রকৃয়াজাত করে বাজারে বিক্রি করে বা নিজেদের ফসলি জমিতে ব্যাবহার করে অধিক লাভবান হতে পারে।

তাই  উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়াহয়েছে,  বিভিন্ন কৃষক মাঠ দিবসে কৃষকদেরকে বাড়িতে রান্নার জন্য আখাচূলা ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও ফসলি জমিতে বায়োচার ব্যবহারে উৎসাহিত করার জন্য কাজ করতে।  বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নাদিম সারওয়ার বাঘাইছড়িতে যোগদান করার পর থেকে প্রান্তিক এই জনপদের মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে ব্যাপক প্রসংশিত হয়েছেন। যেমন: যুবকদেরে ঘরের ভিতরে ড্রামে বা হাউজে মাছ চাষের প্রশিক্ষণ, বাঘাইছড়ির সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র -ছাত্রীদের মাঝে উন্নত পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় ব্যাগ গার্ডেনিং এর মাধ্যমে অধিক ফসল উৎপাদন, এবং ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য মাষরুম চাষের প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে ভিক্ষুকদের প্রত্যেক পরিবারকে একটি সরকারি খরচে মাশরুম সেন্টার তৈরি করার জন্য বীজ প্রদান করন, স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ছয় চাকা গাড়ীর জন্য বিকল্প সড়কের ব্যাস্থা করা ইত্যাদি জনকল্যাণ মূলক ক্রমকান্ডে ভূয়শী প্রশংসা কুড়িয়েছেন।