ভুয়া বিল পরিশোধ না করায় ইউএনও’কে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যা!

॥ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ॥

মাত্র তিন মাস আগে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলা হতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগ দেয়া রুহুল আমিনকে অপসারণ করে অন্যত্র বদলির দাবি জানিয়েছে কিছু ঠিকাদার। ২৩ ডিসেম্বর রোববার দুপুরে ইউএনও’র অফিস ঘেরাও করে তারা এই দাবি জানান।

সততা ও সাহসিকতা প্রর্দশন করে চট্টগ্রামে নানা খাতের বেপরোয়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ফিরিয়ে আনতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কারণে আলোচনায় আসেন রুহুল আমিন। প্রশাসন ক্যাডারের আলোচিত এ কর্মকর্তার অপসারণ দাবির নেপথ্যে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য! অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে টেন্ডার ছাড়াই ৪ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ‘শেষ করে’ ২৭ লাখ ৩০ হাজার ১৯৩ টাকা উত্তোলনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশল দফতরে আবেদন জানিয়েছিলেন একজন ঠিকাদার। তবে বিনা টেন্ডারে এবং কার্যাদেশ ছাড়াই কাজ করার কারণে উক্ত টাকা দিতে রাজি হননি হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব তহবিলের অর্থায়নে বিধিবিধান অনুসরণ করে হাটহাজারীতে চারটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আদেশ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। এতে আরসিসি রাস্তার পাশে ব্রিক ওয়াল দিতে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯১ টাকা, সারফেস ড্রেন নির্মাণের জন্য ৮ লাখ ৮৭ হাজার ২৭৯ টাকা, ড্রেনের কালভার্ট নির্মাণের জন্য ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৫৮৯ টাকা ও কার ওয়াশ রুম নির্মাণের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৪ টাকা সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়। বিনা টেন্ডারে এসব প্রকল্পের কাজ করার পাশাপাশি নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নও করা হয়নি।

এত বড় অনিয়মের পরও ৪ প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশল দফতরে অভিযুক্ত ঠিকাদার মো. সেলিম আবেদন জানিয়েছেন সম্প্রতি। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করার পাশাপাশি ওই অর্থ ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান ইউএনও রুহুল আমিন।

এর আগে হাটহাজারীতে দুটি ইউনিয়নের সাতটি কাজ (ড্রেন নির্মাণ ও সড়কের উন্নয়ন) সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না করেই অর্থ উত্তোলনের জন্য উপজেলা প্রকৌশল দফতরে আবেদন করেন ঠিকাদার আলী আজম। তবে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কাজ সম্পন্ন না করায় টাকা না দেয়ার পাশাপাশি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেন ইউএনও।

এ বিষয়ে ইউএনও রুহুল আমিন জানান, ফতেপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪২ মিটার ড্রেন নির্মাণ, ফতেপুর সজ্যা পাড়া রাস্তার উন্নয়ন ও স্লাবসহ ৩৭ মিটার ড্রেন নির্মাণ, ডা. আশুতোষ সড়ক উন্নয়নে ৭৩ মিটার ড্রেন নির্মাণ এবং নন্দীর হাটসংলগ্ন রাস্তায় ১১২ মিটার ড্রেন নির্মাণের আদেশ থাকলেও প্রত্যেকটিতে ১৯ মিটার করে কম ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ড্রেন নির্মাণের সাথে আরও বিভিন্ন কাজে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কাজ অসম্পন্ন রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২৭ লাখ ৩০ হাজার ১৯৩ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বিনা টেন্ডারে এবং কার্যাদেশ ছাড়াই সম্পন্ন করে টাকা চাইলে আমি দিতে অস্বীকৃতি জানাই যার কারণে আমাকে স্বাধীনতা বিরোধী বলে আন্দোলন করে উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি উদয় সেন এবং ঠিকাদার শহীদ। 

এসব ঘটনার জের ধরে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা গতকাল রোববার দুপুরে ইউএনও’র অফিস ঘেরাও করতে যান; যাদের নেতৃত্বে উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি উদয় সেন ও ঠিকাদার শহীদ ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এ সময় ইউএনও রুহুল আমিনকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ উল্লেখ করে তাকে অন্যত্র বদলি করার দাবি জানান তারা।

টেন্ডার ছাড়াই সাড়ে ২৭ লাখ টাকার কাজের বিষয়ে জানার জন্য অভিযুক্ত ঠিকাদার মো. সেলিমের সঙ্গে সোমবার সকাল থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাড়া দেননি। এমনকি খুদে বার্তাও পাঠানো হয় কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন।

উন্নয়ন প্রকল্প ই-টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে হাটহাজারীর ইউএনও রুহুল আমিন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে টেন্ডার, পরে কাজ। বিনা টেন্ডারে সাড়ে ২৭ লাখ টাকার কাজ করার বিষয়টি নজিরবিহীন। ঠিকাদারদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, নিয়মের বাইরে গিয়ে আমার পক্ষে উক্ত টাকা ছাড় করা সম্ভব না।