বীর বাহাদুরঃ বহুমুখী প্রতিভাবান এক রাজনৈতিক পরাক্রমশালী নেতার উত্থানের গল্প!

॥ সৌরভ দে ॥

টানা ৬বারের মত বিজয় ছিনিয়ে এনে তিনি বান্দরবান ৩০০নং আসনকে ইতোমধ্যেই আওয়ামীলীগের অন্যতম নিরাপদ আসন বানিয়েছেন। নিজের নির্বাচনি আসনে বিরোধীদল থেকে শুরু করে সবার সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলার কারণেই সবার প্রিয়পাত্র তিনি। একজন ক্রীড়া ব্যাক্তিত্ব ও সংস্কৃতিমনা হয়েও রাজনীতিতে সাথে জড়িয়ে পড়া নিঃসন্দেহে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। চলুন জেনে নেয়া যাক এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করা বীর বাহাদুরের অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প।

ব্যাক্তিগত জীবনঃ এম পি ১৯৬০ সালের ১০ জানুয়ারী বান্দরবান পার্বত্য জেলা সদরের একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম প্রয়াত লালমোহন বাহাদুর এবং মাতা মা চ য়ই, তিনি একজন গৃহিনী। বীর বাহাদুর ঊশৈসিং ১৯৯১ সালে মে হ্লা প্র’র সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের গর্বিত জনক। ছেলে উসিং হাই (রবিন) বার-এট-ল করছেন, মেঝ ছেলে থোয়াইং শৈ ওয়াং (রোমিও) অস্ট্রেলিয়াতে এবং একমাত্র কন্যা ম্যা ম্যা খিং (ভেনাস) ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজে ৮ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত।

শিক্ষা জীবনঃ এম পি ১৯৬৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে বান্দরবান সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি প্রথমে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে এবং পরে বান্দরবান সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

ক্রীড়া অঙ্গনে তাঁর পদচারনাঃ বীর বাহাদুর এম পি ছাত্র জীবন থেকেই খেলাধূলা ও সংস্কৃতি চর্চায় গভীর মনোযোগী ছিলেন। তিনি ১৯৯৭ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল কোয়ালিফাই রাউন্ডে অংশগ্রহণের লক্ষে মালয়েশিয়া গমন করেন এবং বাংলাদেশ ফুটবল দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ ফুটবল রেফারী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দক্ষতার সাথে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। অষ্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিক ২০০০-এ বাংলাদেশ দলের চীফ অব দ্য মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবনঃ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে তার সক্রিয় পদচারনা। ছাত্র জীবনে তিনি বান্দরবান ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯২ সালে তিনি বান্দরবান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জেলা স্কাউটের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বীর বাহাদুর ঊশৈসিং ২০০২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সংসদীয় দলের হুইপ নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময়ে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগে সংগঠনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করেন। তিনি বান্দরবান প্রেস ক্লাব ও রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের আজীবন সদস্য। তিনি ১৯৭৯ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির পূর্বে এ সংক্রান্ত সংলাপ কমিটির অন্যতম সদস্য এবং তৎকালীন সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে
দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে উপমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রথম বারের মত এবং ২০০৮ সালে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দ্বিতীয় বারের মত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙ্গামাটি-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে তিনি সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি তথা ভৌত অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনায় সুযোগ পান।

এছাড়া বীর বাহাদুর ঊশেসিং নবম জাতীয় সংসদের সংসদ কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ঐ সংসদের একজন প্যানেল স্পীকার ছিলেন যার ফলে ২০১৩ সালের ২২ জুলাই তিনি খন্ডকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি স্বরূপ ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বীর বাহাদুর ঊশৈসিং ফ্রান্স গমন করেন। বাংলাদেশ বিমানের লন্ডন-নিউইয়র্ক ফ্লাইট উদ্বোধনের জন্য এবং জাতিসংঘের সাধারণ সভায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আমেরিকা এবং ২০০৬ সালে চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন গমন করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মায়ানমার ও কম্বোডিয়া সফর করেন।

বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয়ভাবে পুরস্কার প্রাপ্ত একজন ব্যক্তিত্ব। একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবেও তার খ্যাতি সমধিক। তিনি ২০১০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে মনোনীত হন এবং বর্তমানে এ পদে আসীন আছেন।

বীর বাহাদুর এম পি ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম, ২০০৮ সালে নবম, ২০১৪ সালে দশম এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান সংসদীয় আসন (৩০০ নং আসন) থেকে টানা ষষ্ঠবারের মত জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী বীর বাহাদুর ঊশৈসিং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে ১২.০১.২০১৪ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে নতুন গঠিত মন্ত্রীসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।