ব্রেকিং নিউজ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অপরাধে চাকরিচ্যুত হচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মী!

॥ বিশেষ প্রতিবেদক ॥

দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে দুর্নীতির তথ্য দেওয়ায় চাকরি হারাতে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের মো. হারুন রশিদ নামের এক স্বাস্থ্য কর্মী। অভিযোগ দিয়ে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করা “অসদাচরণ” উল্লেখ করে বরখাস্ত করা হবে না কেন জানতে চেয়ে এ স্বাস্থ্য কর্মীকে কারণ দর্শাতে পত্র দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিধফতর থেকে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবুল কালাম আজাদ স্বাক্ষরিত ওই পত্রটি পাওয়ার দশ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দাখিলের জন্য হারুনকে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে হারুন রশিদ বলেন- চট্টগ্রামের জেলা স্বাস্থ্য তত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে একই সংস্থায় দুই উপজেলার নাগরিকত্ব সনদ দিয়ে দুইবার চাকরি ও তিনবার পদোন্নতি নেয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম এবং অনৈতিক কর্মকান্ডের দালিলিক প্রমানসহ অভিযোগ করেছি। এ বিষয়ে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাস্থ্য অধিদফতরকে পত্রের মাধ্যমে নির্দেশও দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে তদন্ত না করে উল্টো আমাকে বরখাস্ত করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে অভিযোগ দেওয়ার কারণ দর্শানো জন্য বলা হয়েছে। আমি সেই পত্র পেয়ে সংস্থা ও আইনের প্রতি সম্মান রেখে ২৭ জানুয়ারি (রোববার) সীতাকুন্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার মাধ্যমে জবাব দায়ের করেছি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দুই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা দেখিয়ে পৃথক সরকারি চাকরি গ্রহণের অভিযোগে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়ার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন বাঁশখালী উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারী (বর্তমানে সীতাকুন্ডে কর্মরত) হারুন রশিদ। হারুনের লিখিত এ আবেদনের প্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সুজন বড়ুয়া স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ম্যানেজ করে একে একে তিনটি পদোন্নতি নিয়েছেন। উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর থেকে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও সর্বশেষ জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়কের পদ বাগিয়ে নেন তিনি। জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক পদটি দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার পদ। অথচ তার ব্যাচের (৫৪তম ব্যাচ) বেশির ভাগই এখনও স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত। তার ব্যাচের কেউ এখনও জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরও হতে পারেননি। এমনকি এর আগের (৫৩তম ব্যাচ) ১৫০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর এখনও পদোন্নতি হয়নি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন একজন কর্মকর্তা। দুদকের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর আমাকে নির্দোষ দাবি করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।’

তবে একই প্রসঙ্গে দুদকে অভিযোগকারী হারুন রশিদ বলেন, ‘অভিযোগকারীর তথা বাদীর সাক্ষ্য না নিয়ে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং তার নিয়োগকালিন কাগজ-পত্র যাচাই না করে কীভাবে প্রতিবেদন জমা দেবে। যদি পিও ভিজিট না করে এবং কাগজ-পত্র যাচাই না করে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। সেটাও একটা দুর্নীতি। তার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত আছে।

দুদকে দেয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে সুজন বড়ুয়া স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে সরকারি চাকরি নেন। তখন তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গ্রাম-মরিচ্যাপাড়া, ডাকঘর-মরিচ্যাবাজার পাড়া, উপজেলা-উখিয়া, জেলা-কক্সবাজার, পিতার নাম বিমল বড়ুয়া উল্লেখ করা হয়। কিন্তু আট বছর চাকরি করার পর হঠাৎ ২০১২ সালের এপ্রিলে রাঙ্গমাটি পার্বত্য জেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে সুজন বড়ুয়া রাঙ্গামাটি জেলার স্থায়ী নাগরিকত্ব ও আইডি সৃষ্টি করে আরও একটি সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেন।

স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে তার ঠিকানা হিসেবে গ্রাম-উত্তর ঘুমধুম, ডাকঘর-বালুখালী, উপজেলা-নাইক্ষ্যংছড়ি, জেলা- বান্দরবান উল্লেখ করা হয়। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি গ্রহণের সময় কক্সবাজার জেলায় নেয়া চাকরি ও প্রদত্ত ঠিকানা গোপন করা হয়। সুজন বড়ুয়া রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাজস্থলী উপজেলায় যোগদান করেন। এ নিয়োগের ৮ নম্বর শর্তে উল্লেখ ছিল যে, উক্ত পদে যোগদানের আগে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করতে হবে। সুজন বড়ুয়া ওই চাকরি থেকে অব্যাহতি নেননি।

ভূয়া নাগরিকত্ব বা আইডি সৃষ্টি করে আরেকটি সরকারি চাকরি গ্রহণ করার কারণে অভিযোগ দেয়া হয় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা প্রশাসন বরাবরে। পরে সুজন বড়–য়া স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ম্যানেজ করে স্ট্যান্ড রিলিজ হয়ে দ্রুত বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বদলি হন। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় তার বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগটি সে সময় তড়িগড়িকরে ধামাচাপা দেয়া হয়।

পরে তাকে আবার বদলি করা হয় ফেনী জেলায়। সুজন বড়ুয়া ফেনী জেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগদানের সময় ছয়জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর বিরোধিতা করে ফেনী সিভিল সার্জনকে চিঠি দেন। তারা চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘আমরা ফেনী জেলায় ৪৩তম, ৪৫তম এবং ৫২তম ব্যাচের স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা কর্মরত আছি। এমতাবস্থায় আমাদের অনেক জুনিয়র এবং অনভিজ্ঞ একজন (এমটি) এসআইকে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।’

এ প্রসঙ্গে অভিযোগকারী হারুন রশিদ বলেন, জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদটি ১০ম গ্রেডের, যা পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক নিয়োগ বা পদোন্নতির আওতার বাইরে। সারা দেশে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক পদোন্নতি বোর্ডের মাধ্যমে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হন।’