মানবতার দুয়ারে এক আউস মিয়ার বাঁচার আকুতি!

॥ আনোয়ার আল হক – সম্পাদকীয় ॥

বাংলায় একটি উড়া প্রবাদ আছে ‘জন্মই যার আজন্ম পাপ’ কথাটা শুনতে খারাপ শোনা গেলেও কিছু কিছু মানুষের জীবনের ঘানি এতটাই ভারি হয়ে উঠে যে, তার তখন বাঁচার চেয়ে মরে যাবার আকুতিও সমান আকাঙ্ক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরাধামে কেউ জন্মে সোনার চামচ মুখে নিয়ে- আবার কেউ সলতের মধু, কেউ বা জন্মের একবছর পর্যন্ত ভাতের ভর্তা খেয়েই লালিত হয়। সময় এবং পরিশ্রম আর নিষ্ঠা কাউকে বিখ্যাত করে; কারো বা তিমির জগদ্দল পাথর হয়ে থাকে তার জীবন সংগ্রামের সাথে। দুঃখ, অপুষ্টি আর অভাবের মাঝে জন্ম নিয়ে ধুকে ধুকে মানুষ হয়। পরিশ্রম চেষ্টা বা আকুতির অভাব থাকে না তবে অর্থের অভাব তাকে কুরে কুরে খায়।

এমনই একজন মানুষের নাম আউস মিয়া। নামটাই যার জন্ম পরিবেশের পরিচয় জানান দেয়। কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম না নেওয়া যেমন দোষের নয়, তেমনি গবীর বা অসচ্ছল পরিবারে জন্ম নেওয়াও কোনো অপরাধ নয়। একটি অতি সাধারণ দ্বীন-হীন পরিবারে জন্ম নেওয়া আউস মিয়া অভাবের মাঝে জন্ম নিলেও আজীবন চেষ্টা করে গেছেন তার দুঃখী মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে। সুষম খাবার খেতে না পারলেও জীবনের সাথে লড়াই করে শরীরটাকে শক্ত এবং মজবুত পেশিতে বেঁধে নিয়েছিলেন। চোখে-মুখে মায়ের মুখে হাসি ফোটাবার দ্বীপ্ত শপথ নিয়ে লড়াই করে গেছেন জীবনের সাথে। ছোটকালেই বাবা চলে যাওয়ায় অল্প বয়সেই সংসারের ঘানি নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার কথা তাকেই কেউ শিখিয়ে দেয়নি।

নানা রকমের রোগের ডিপো হয়ে ওঠা মায়ের কষ্টই তাকে দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছে। যেখানে যে কাজ পেয়েছেন তাই করে রোজগার করেছেন এবং মায়ের চিকিৎসা করেছেন। মায়ের জটিল জটিল রোগের ঔষধের যোগান কখনও যথাযথ হয়েছে কিনা তিনি বোঝার অবকাশ পাননি। কারণ প্রতিদিন সকাল হলেই অর্থের খোঁজে তাকে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। রাতে ফিরেছেন খাবার আর মায়ের ঔষধ নিয়ে। ক্লান্ত শরীর শক্ত বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে এসেছে। ভোর সকালে ঘুম ভেঙ্গে আবার সেই যাওয়ার তাড়া। এভাবেই এক সকালে উঠে দেখেন তার যাওয়ার তাড়া ফুরিয়ে গেছে। মা তার চেষ্টা বিফল করে দিয়ে নিরবে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে।

কিছুদিন শোক বহনের পর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন এক কাপড়ে। কাজ খুঁজে নিয়েছেন। শক্ত হাতে রোজগার করে টাকা জমিয়েছেন। ততক্ষণে তার যৌবন তাকে বিয়ের তাড়া দিতে শুরু করেছে। বিয়ে করেছেন, সংসার পেতেছেন, ঘরে ছেলেপুলেও এসেছে। এই পর্যায়েই তার পুষ্টিহীন পরিশ্রমের শরীর নিজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। শক্ত পেটা শরীরের ভাঁজে ভাঁজে কখন একাধিক রোগ চুপিসারে বাসা বেঁধেছে আউস মিয়ার সে হুশ ছিল না। দিন মজুর আউশ মিয়া যখন ডাক্তারের কাছে পৌঁছলেন তখন তার রোগ একগাদা। কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে না। গ্যাস্ট্রিকের কারণে পেটে কোনো কিছুই হজম হচ্ছে না। আবার মুখের মধ্যে ঘা হয়ে মুখ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

নিজের চিকিৎসা, সংসারের যোগান একসাথে টানতে হিমসিম খাওয়া আউশ মিয়া এক সকালে উঠে দেখলেন তার স্ত্রী সন্তানেরা তার পাশে নেই। যৌবনবতী প্রিয়তমা স্ত্রী নানা রকম অভাব থেকে বাঁচতে হয়তো নিজের পথ বেঁছে নিয়েছেন। প্রকাশযোগ্য নয় এমন অনেক কিছুই এর আগে আরে ঠারে তার চোখে পড়লেও তিনি এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামাননি। তবে দুঃখের মাঝে শান্তনা ছিল এটুকুই; তার গুণধর স্ত্রী সন্তান দু’টি সাথে নিয়ে গেছেন। স্ত্রী সন্তান লাপাত্তা হবার পর নিজের উপর আর কোনো দায়িত্ব থাকলো না। এদিকে শরীরেও সয় না। বেশির ভাগ সময় কাজ করতে পারেন না। এমন অবস্থায় দেনার দায়ে তার ভাড়া বাসার আসবাব বিনা নোটিশে ক্রোক করলেন জমিদার নামের বাড়িওয়ালা।

আবারও গায়ের কাপড়টুকু সম্বল করে পথে নামলেন। এখন পথেই তার বসবাস। রাঙামাটি শহরের পৌরসভা মার্কেটের বারান্দায় রাত কাটানো আউস মিয় গত পাঁচ বছর ধুকে ধুকে অপেক্ষা করছেন কখন তিনি মরে যাবেন অথবা কোনো সহৃদয় ব্যক্তির করুণায় কখন তার চিকিৎসা হবে এবং সুস্থ হয়ে আবার কাজ করতে পারবেন। তার মুখের ঘা এবং কিডনি চিকিৎসার জন্য খুব বেশি টাকারও প্রয়োজন নেই। তবে এর মাঝেই তার লক্ষণ দেখে ডাক্তার ধারণা করেছে তার হৃদরোগও ধরা পড়তে পাড়ে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

সব মিলিয়ে হাজার তিরিশেক টাকা হলে আউশ মিয়ার চিকিৎসা হতে পারে কিন্তু কোথায় পাবেন এত টাকা?? ভিক্ষাবৃত্তি করার মানসিকতা তার কখনই হয়নি। ভিক্ষার ঝুলি না নিলেও এরতার কাছে চেয়ে চিন্তে নিয়েই তিনি কিছু বড়ি আর খাবারের টাকা যোগাড় করেন। পারলে টুকটাক কাজ করে নিজের পেট চালান। তবে চিকিৎসা করার টাকাটুকু যোগাড় করার জন্য তার যে শারিরিক শক্তি প্রয়োজন তা না থাকায় চিকিৎসাও হয় না।

রাঙামাটি পৌরসভা এলাকার তরুণ যুবারা অনেকেই নিয়মিত তাকে দশ/বিশ টাকা দিয়ে সাহায্য করেন; ঔষধ কেনার জন্য। তার মধ্যেই কয়েকজনের পরামর্শে তিনি পত্রিকা অফিস পর্যন্ত পৌঁছেছেনে, মানবিক সাহেয্যের আবেদন জানাতে।
বাঁচার আকুতি নিয়ে বললেন “স্যার আমার লাইগা কিছু ল্যাখেন’, আল্লাহর দুনিয়ায় কেউ কি নেই? একজন মানুষকে বাঁচার সুযোগটুকু তৈরি করে দেওয়ার মতো?” সত্যিই কেউ আছেন কিনা আমারও জানা নেই। তবে একজন একা না পারলেও আমরা সবাই মিলে ৫০, ১০০, দু’শো কিংবা সাধ্যমতো কিছু সহায়তা করলেই এই মানুষটি হয়তো ভালো হতেও পারে। চোখের সামনে একটি প্রাণ এভাবে ধুকে ধুকে শেষ হবে আর আমরা বিকারহীনভাবে দেখে যাবো। মানবতার কোনো সংজ্ঞাই একে সমর্থন করে না।

আমার এই লেখা কেউ পড়বে কিনা জানি না। তবে অল্প কথায় সাহায্যের আবেদন জানালে হয়তো কেউ পড়তো, কিন্তু তার হৃদয়গ্রাহী হতো না। তাই এতকিছু লেখা। আসুন না আমরা সবাই একটু একটু করে তাকে সহায়তা করি।
তার নিজের কোনো ফোন নেই, ওই তরুণদেরই কারো একজনের ফোন নং দিলেন, যেটা বিকাশ করা। নম্বরটি হলো ০১৮২৮ ৯২১১০১ (মামুন)। লোকটিকে সবসময় রাঙামাটি পৌরসভা মার্কেট বা গণপূর্ত বিভাগের আশেপাশে পাওয়া যায়। কারো হৃদয় কি একটুও দয়ায় ভাসবে ???