নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত রাঙামাটি সরকারি কলেজ!

॥ আনন্দ সাংকৃত্যায়ন ॥

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় আঞ্চলিক দলসহ স্থানীয় বিশাল একটি অংশের দাবী ছিল পাহাড়ের তৃণমূল শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ স্কুল ও কলেজের উন্নয়ন না করে এইসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। তাদের এই দাবীর পেছনে যথেষ্ঠ যৌক্তিকতাও ছিল! মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতিতে পাহাড়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন কিন্তু কোথাও একটা অসঙ্গতি রয়েই গেছে। শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বুনিয়াদ হচ্ছে কলেজ। কলেজে অধ্যয়নকালেই একজন ছাত্র তাঁর জীবনের লক্ষ্য নির্ধারন করতে সমর্থ হয়। রাঙামাটির শিক্ষাব্যবস্থার সেই বুনিয়াদটিই বেশ নড়বড়ে।

আলোচ্য প্রসঙ্গ হচ্ছে রাঙামাটি সরকারি কলেজ এবং এই প্রতিষ্ঠানের নানামুখী সমস্যা। এই কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৫ সালে, ১৯৭০ সালের ২৫ জুলাই এই কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। পাহাড়ের জ্ঞানচর্চা ও উচ্চশিক্ষার প্রসারে স্বনামধন্য এই শিক্ষা নিকেতনের অনন্য উজ্জ্বল ভূমিকা এবং অবদান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী সংকটে নিমজ্জিত এই বিদ্যাপিঠ। রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, পরিবহন সংকটসহ অবকাঠামো সংকট।

শিক্ষক সংকটঃ ১২ হাজার শিক্ষার্থীর এই কলেজে বর্তমানে শিক্ষক আছেন মাত্র ৬০ জন। গড়ে হিসাব করলে ১৯২ জন শিক্ষার্থীর জন্য আছেন একজন শিক্ষক। এ কলেজে শিক্ষকের পদও মাত্র ৬০টি!

ইন্টার মিডিয়েট, ডিগ্রি পাস কোর্স ছাড়াও এ কলেজে ১৩টি বিষয়ে অনার্স (সম্মান) এবং ৮টি বিষয়ে মাস্টার্স চালু রয়েছে। বিষয়গুলো আকর্ষনীয় ও চাহিদা সম্পন্ন হওয়ার সত্ত্বেও ওইসকল বিষয়ে শিক্ষকের প্রয়োজনীয় পদ নেই! গত বছর নতুন বিষয়গুলোতে অনার্স ও মাস্টার্স চালু হলেও পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নিচ্ছে না শিক্ষা প্রশাসন। অথচ এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স বিভাগ চালু করতে প্রতিটি বিভাগে কমপক্ষে ১২ জন শিক্ষক থাকা আবশ্যক কিন্তু রাঙামাটি সরকারি কলেজে কোনো বিভাগেই ৪টির বেশি শিক্ষকের পদ নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

সারাদেশের সরকারি কলেজে প্রায় ১২ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। জনপ্রশাসন হয়ে এই প্রস্তাব বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষক সংকট অবসানের লক্ষ্যে এই কলেজেও পদ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটঃ দেশের বৃহত্তম এই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছাত্রছাত্রীরা এই কলেজে আসে। তাদের অশিকাংশকেই কলেজে যাওয়া-আসা করতে হয় নৌকা ও লঞ্চে কিন্তু কলেজে ছাত্রছাত্রীদের থাকার কোনো হোস্টেল নেই। যাদের দৈনিক যাতায়াত সম্ভবপর নয় তাদের বেশিরভাগকেই বাসাবাড়ি ও মেস ভাড়া করে থাকতে হয়। তবে কলেজের একটি ছাত্রী হোস্টেল ছিল কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ৫-৭ বছর আগে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষকদের একটি ডরমেটরি ও একটি বাসভবন থাকলেও সেগুলোতে মাত্র ১৫-২০ জন শিক্ষক থাকতে পারেন। রাঙামাটি সরকারি কলেজে কমপক্ষে তিন হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ছাত্রাবাস থাকা জরুরি বলে দাবী করেছে শিক্ষার্থীরা।

পরিবহন সংকটঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য ২টি বাস অনুদান দিয়েছিলেন। বহু আগেই বাস দুটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। এরপর থেকেই যানবাহন সংকটে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাঙ্গামাটি শহরের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য মাসিক ট্রিপ ভাড়াভিত্তিতে ৫-৬টি বাস রয়েছে। এ বাবদ প্রতি মাসে কলেজের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা! তবে এই বাসের সুবিধাও শুধুমাত্র শহুরে শিক্ষার্থীদের জন্যে কাপ্তাইসহ বিভিন্ন উপজেলা হতে আসা শিক্ষার্থী এই সামান্য সুবিধাটুকু থেকেও বঞ্চিত, অথচ কলেজ থেকে বছরে প্রতিটি শিক্ষার্থী থেকে সাড়ে সাত’শ টাকা করে কেটে রাখা হয় নিয়মিত! দূরদূরান্ত হতে আসা এইসব শিক্ষার্থীদের নিয়মিত জীবন ঝুঁকি নিয়ে কখনো বাসের ছাদে অথবা কখনো বাসের রড ধরে যাতায়াত করতে হয়।

অবকাঠামো সংকটঃ কলেজটির নামে ২৮ একর জমি থাকলেও দখলে রয়েছে ২৩ একর! কলেজের নেই কোনো সীমানা দেয়াল। বর্ডার ওয়াল না থাকায় কলেজের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করছে বহিরাগত লোকজন। রয়েছে মাদকসেবীদের উৎপাত! এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রায়ই নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বেশিরভাগ শিক্ষকই চট্টগ্রামে পরিবার রেখে কলেজে যাতায়াত করেন। যাতায়াত সমস্যার কারণে কেউ কেউ নিয়মিত ক্লাসেও যান না। তবে আশার আলো হচ্ছে সীমানা ওয়াল নির্মানে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের তরফ থেকে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এর বাস্তবায়ন শুরু হবে।

অধ্যক্ষের কার্যালয় ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য ২০১৮ সালে “শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজসমূহের উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে এই কলেজে একটি দৃষ্টিনন্দন তিনতলা ভবন নির্মাণ করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর। এছাড়াও আর একটি পাঁচতলা একাডেমিক ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই ভবনের নির্মাণ কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করা এবং উন্নতমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উপর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।