পাহাড়ে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে একজন জেলা প্রশাসকের বিরামহীন যাত্রা

॥ আলমগীর মানিক ॥

পিছিয়ে পড়া রাঙামাটি জেলার শিক্ষা ব্যবস্থা আরো পিছিয়ে। কথাটি কেউ মানতে না চাইলেও বাস্তবতা তাই বলে। এ অবস্থা কাটাতে বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বর্তমান জেলাপ্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত প্রাথমিক শিক্ষার মাঠ পর্যায়ের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে এবং এলাকাবাসীর কাছ থেকে সরেজমিনে জানতে প্রায় প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছেন কোনো না কোনো দুর্গম এলাকায়। এমন অনেক এলাকায় তিনি ইতোমধ্যে গেছেন যে, দুরত্বের বিচারের জেলা সদরের একেবারে কাছে হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দীতেও দুর্গমতার অজুহাতে এসব এলাকায় ডিসি তো দুরের কথা বড়মাপের কোনো কর্মকর্তাও যাননি। এলাকাগুলোতে তাই ডিসির আগমনে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মানুষ হচ্ছে প্রাণীত এবং উৎসাহিত।

দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থা, মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং এর অপ্রতুলতা/অনুপস্থিতি, কর্মস্থলে আবাসনের অভাব ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অসচেতনতা এবং সর্বোপরি সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ফলে ‘‘প্রক্সি টিচিং”-এর মত সংস্কৃতির কারনে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ঘটছেনা। পাহাড়ি এই জেলাটির শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা সংকট দীর্ঘদিনের। নানা সভা-সেমিনার, দাবি-দাওয়ায় বারবার এইসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নেই কোন কার্যকর উদ্যোগ। ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জেলার সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

নানা সমস্যার আবর্তনে থাকা রাঙামাটির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেনে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন রাঙামাটির একেএম মামুনুর রশিদ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ন বিভিন্ন নানা ধরনের কাজ করার পরেই রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন কোনো না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এসময় শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপ করে তাদের অভাব-অনুযোগের বিষয়টি জেনে সাধ্যনুসারে স্কুল ড্রেস থেকে শুরু করে শিক্ষা সামগ্রীর পাশাপাশি জেনারেটর, নৌকা, ইঞ্চিন চালিত বোটসহ অভিভাবক শেড নির্মানের মাধ্যমে রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ।

জেলা প্রশাসকের আন্তরিকতার কারনেই দূর্গম বাদলছড়ি এলাকার একটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা নতুনভাবে সচল হতে চলেছে। এলাকাটির শতাধিক পরিবার নতুনভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসক বাদলছড়ি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের গার্ড ওয়াল ও বেঞ্চ প্রদানের প্রতিশ্র“তি দেন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের জীবনে এই প্রথম তাদের এলাকায় জেলা প্রশাসককে দেখেছে, তাই তাদের মধ্যে খুশির অন্ত ছিল না।

এদিকে নিরন্তর ছুটে চলার ধারাবাহিকতায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মঙ্গলবার সদর উপজেলাধীন সাপছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সাপছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় এদুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আকস্মিকভাবে পরিদর্শনে যান। এসময় তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে কথা বলার পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেন। এদিকে জেলা প্রশাসক এসেছেন এমন খবর পেয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ছুটে আসেন অভিভাবকরা। এসময় অভিভাবকদের দাবির প্রেক্ষিতে বিদ্যালয় সম্মুখে একটি অভিভাবক শেড নির্মান করে দেওয়ার প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন। এসময় সদর উপজেলায় সদ্য যোগদান করা ইউএনও, সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

এরআগে জেলা প্রশাসক সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট্যদের সাথে নিয়ে দুঃস্থ মহিলাদের উন্নয়নে (২০১৭-১৮) চক্র ভিজিডি কর্মসূচীর আওতায় দেড় শতাধিক উপকারভোগীর মাঝে জমানোকৃত সঞ্চয়ী অর্থ বিতরন করেছেন। প্রায় ৫ হাজার টাকা করে মাথাপিছু বিতরণ করা হয়েছে বলে জানাগেছে।

এবিষয়ে জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানালেন, আমি উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ভিজিডি কর্মসূচীর সঞ্চয়ী অর্থ বিতরণ করতে গিয়েছিলাম সাপছড়ি এলাকায়। সেখানে দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এমন তথ্য জানার পরে আমি কাউকে কিছু বুঝতে নাদিয়ে অনেকটা আকস্মিকভাবেই বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনে যাই। সেখানে দিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে আমি বুঝতে পারলাম তারা গুনগত মান সম্মত শিক্ষাগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরে আমি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে আলাপ করলাম। তারা নিজেরাও এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মান সম্পন্ন, মৌলিক ও স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে প্রাথমিক শিক্ষা। যে কোন সমাজের অগ্রগতির ধারাবাহিক পরিবর্তনে শিক্ষা একটি শক্তিশালী অনুঘটক এবং মানব-প্রগতি ও সমৃদ্ধির মূল সূচক হিসেবে চিরকাল বিবেচিত হয়ে আসছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যা এবং সর্বোপরি সভ্যতা অগ্রগতির যে স্তরকে স্পর্শ করেছে তার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে শিক্ষা।

শিক্ষার যুগোপযোগী মৌলিক রূপান্তর এবং তার কল্যাণমুখী প্রয়োগ যে কোন অগ্রগতির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই বিষয়টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুধাবন করে নিজেরা শিখে পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা তথা পাঠদানের বিষয়টি আমি বিদ্যালয় কর্তপক্ষকে জানিয়েছি। এটা তারা নাকরলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা মানব সম্পদ নয়, দেশের বোঝা হয়েই গড়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেছেন জেলা প্রশাসক।