ব্রেকিং নিউজ

দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলীর প্রধান জায়গা পার্বত্য চট্টগ্রাম!

॥ সৌরভ দে ॥

“পাহাড়ে বদলী হওয়া মানেই পানিশমেন্ট ট্রান্সফার নয়” উক্তিটি করেছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা। তার মতে, সরকার জনস্বার্থে কর্মকর্তাদের বদলি করে। তাই পানিশমেন্ট ট্রান্সফারের ভুল ধারণা মন থেকে মুছে ফেলে পার্বত্যঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষদের কল্যাণে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি। কিন্তু পাহাড়ের প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত যেকোন কর্মকর্তা চাকুরীসুত্রে কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়লে তাকে শাস্তিমূলক বদলী করা হয় পাহাড়ে। এক কথায় বলতে গেলে তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সরকারী চাকুরীজীবিদের জন্যে পানিশমেন্ট জোন।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে শাস্তি হিসেবে রাজবন্দীদের পাঠানো হত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে। ব্রিটিশরা অনেক আগেই বিদায় নিলেও ঔপনিবেশিকতার ভূত যায়নি এখনো, তাই তো রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের আন্দামান! বাংলাদেশের এক দশমাংশ আয়তন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম হলেও অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পাহাড়ের জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক কম। আর্থসামাজিক অবস্থা ও দুর্গমতার কারনে পাহাড়ের মানুষ এখনো সমতলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এই পিছিয়ে থাকার কারণে পাহাড়ে এখনো দক্ষ জনবল গড়ে ওঠেনি। প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরে হাতেগোনা উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তা ছাড়া বাকি জনশক্তি প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক কূটকৌশলে অনেকটাই অদক্ষ। তার উপর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের পাহাড়ে শাস্তিমূলক বদলীর কারণে এইখানকার শাসনব্যবস্থা আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ এই অঞ্চলের পাহাড়ী সৌন্দর্য্য বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম মূলভিত্তি। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট সাজানো হয়েছে পাহাড়ের মনোরম ছবি দিয়ে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইনে তুলে ধরা হয়েছে পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। প্রাকৃতিক অঞ্চলের এই লীলাভূমিতেই সরকারের প্রমাণিত দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়!

এক.

পাবনার সুজানগর উপজেলার উজিরপুর গ্রামের দরিদ্র ঘরের সন্তান জয়নাল আবেদীন যোগদান করেন সহকারী শিক্ষা অফিসার পদে, অতপরঃ প্রমোশনের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসাবে পদায়ন। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দৌলতপুর শিক্ষা অফিসকে দূর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন তিনি ও তার মদদপুষ্ট দালালরা।

উপজেলার ২১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমন কোন শিক্ষক নেই যিনি তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই অফিসারের হাতে লাঞ্চিত হননি। সীমাহীন দুর্নীতি করে দালাল শিক্ষকদের নিয়ে ৩ বছরে কোটিপতি বনে যান এবং দালালরাও হন সম্পদশালী। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ২১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে দৌলতপুর শিক্ষা অফিসের বিস্তার। এ উপজেলার একটি বিশাল অংশ যেমন, ফিলিপনগর, মরিচা, রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়ন ভৌগলিক কারণে পদ্মানদী দ্বারা বিভক্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই নাজুকতার সুযোগে এই অফিসার দালাল শিক্ষকদের সাথে নিয়ে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে চরাঞ্চল থেকে উপরে, পার্শ্ববর্তী যে কোন উপজেলায়, জেলা সদরে, এমনকি বৈবাহিক সূত্রে জেলার বাইরে অন্যত্র বদলী বা বৈবাহিক সূত্রে দেশের যে কোন জেলা থেকে দৌলতপুরে যোগদানের ক্ষেত্রে পছন্দের স্কুলে পোষ্টিং দেওয়ার ক্ষেত্রে জন প্রতি ৫০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত বানিজ্য করে ৩ বছরে কোটি  টাকা কামিয়ে নেন এবং ভয় ভীতি দেখিয়ে উপর থেকে চরাঞ্চলে বদলী করা হবে এমন হুমকি দিয়েও দালালদের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের মত ঘুষ আদায় করেন।

এব্যাপারে শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীন জানান, আমি দৌলতপুরে যোগদানের পর থেকে শিক্ষক সমিতির নেতা নামীয় কিছু দালাল শিক্ষক আমার নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা আদায় সহ দূর্নীতি করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে যা আমি জানি। তবে বিপদের সময় সব দালাল সটকে পড়েছে। তিনি স্বীকার করে আরো জানান, আমি নিজেই এখন মহাবিপদে আছি। আপনারা আমার দুর্নীতির খবর প্লিজ আর ছাপাবেন না।

বিপুল অর্থের একটি অংশ দালালদের সাথে ভাগবাটোয়ারাও করে নিতেন কিন্তু এই দুর্নীতির রাজত্ব বেশিদিন স্থায়ী হল না, দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, বদলী বানিজ্যকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারী উপসচিব মনোয়ারা ইশরাত স্বাক্ষরিত স্মারক নং- ৩৮.০০.০০০০.০০১.১৯.০৩৪.২০১৮-২০ বদলী আদেশে দূর্নীতিবাজ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীনকে শাস্তিমূলক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের (চলতি দায়িত্বে) বদলী করা হয়। জ্বী হ্যা, পাহাড়েই বদলী হয়ে এসেছেন এই মহা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। দেখার বিষয় হচ্ছে পাহাড়ে শাস্তিমূলক বদলী শুধরে দেবে জয়নাল আবেদীনকে নাকি বাঘাইছড়িতেই কায়েম করবেন দৌলতপুরের সেই পুরানো দুর্নীতির আখড়া।

দুই.

বৈবাহিক সূত্রে ১৩ বছর আগে নড়াইল এসে শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান নেন ডাঃ আব্দুল কাদের। নড়াইল সদর হাসপাতালে যোগদানের পর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। সন্ত্রাসী চক্রকে ম্যানেজ করে এবং দুর্নীতিবাজ নেতাদের তুষ্ট করে ডাঃ আব্দুল কাদের নানা ধরনের অপকর্ম শুরু করেন। খালি হাতে নড়াইল এসে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি।

বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক হওয়ায় চলন-বলন সবই পাল্টে যায়। বেড়ে যায় টাকার নেশা। তাইতো রোগীকে তিনি মানুষ মনে না করে টাকা আয়ের পোকা মনে করে চিকিৎসা দেন। আর সে কারনেই তার হাতে প্রতিনিয়ত রোগীদের জীবন বিপন্ন হতে থাকে। রোগীর জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ঠান্ডা মাথায় অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও অপারেশন করে হাতিয়ে নিতে থাকেন লাখ লাখ টাকা। নতুন নাম পান কসাই কাদের!

অভিযোগ রয়েছে ঔষধ কোম্পানীর কোন কোন রিপ্রেজেন্টেটিভকে গৃহস্ত চাকর হিসেবে কাজ করান। বাসার বাজার করানো হতে শুরু করে অনেক নীচু কাজও করতে হয় এইসব শিক্ষিত যুবকদের। রোগী দেখতে যাওয়াসহ বিভিন্ন বান্ধবী’র বাড়ি পৌছে দিতে বলেন এমএ পাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের। চাকুরীর স্বার্থে ডাঃ কাদেরের এই বেয়াদবী মেনে নিতে হয় তাদের। জনৈক নার্সের সাথে তার দৈহিক সম্পর্কের বিষয়টি হাসপাতালের গন্ডি পাড় হয়ে সকলের মুখে মুখে হওয়ায় অনেকে তাকে এড়িয়ে চললেও রোমিও ডাক্তার এ নিয়ে বেশ গর্ববোধ করেন। সবকিছু অনুকূলেই চলছিল কিন্তু বাধ সাধলো উনারই ভুল চিকিৎসায় নড়াইলের স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা মাফিজুর শেখ’র মৃত্যু। এই মৃত্যুর ঘটনায় মুহুর্তেই ফুঁসে উঠে স্থানীয় জনতা। স্থানীয় জনতার প্রতিবাদের মুখে টনক নড়ে প্রশাসনের। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গত বছরের ১৯ জুলাই ডাঃ কাদেরকে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করে! হ্যা আবারো পাহাড়েই! কিন্তু এখানেও আইন লঙ্ঘন করলেন ডাঃ আব্দুল কাদের। স্বাস্থ্য অধিদফতরের আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রায় সাত মাস ধরে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত তুলেছেন বেতনভাতা। এই বিষয়ে অভিযোগ আসলে অভিযান পরিচালনা করে দুদক।

ভাগ্যবলে রাঙ্গামাটিবাসী এই কসাই কাদেরের হাত থেকে রক্ষা পেলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বদলী হয়ে আসা দুর্নীতিবাজ ও অসৎ চরিত্রের এইসব কর্মকর্তা ঢুকে গেছে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নাজুক রাজনীতির পাহাড়ে সরকারের এমন আচরণ কি নিতান্তই খামখেয়ালিপনা নাকি সরকারেরই কোন মহলের সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অংশ?