ব্রেকিং নিউজ

১৫ মাসে নিহত ৫৮ঃ সশস্ত্র রাজনীতির রক্ত কান্নায় প্লাবিত পাহাড়!

॥ আলমগীর মানিক ॥

মাত্র ১৫ ঘন্টার ব্যবধানে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় পরপর দুটি সশস্ত্র হামলার ঘটনায় আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অত্রাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি। সরকারী ৬জনসহ গাড়ির এক হেলপারসহ মোট ৭জন নিহত হওয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র ১৫ ঘন্টার ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গণে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। নৃশংস সাত খুনের পর এখন থমথমে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি। ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহতদের মরদেহের ময়না তদন্ত চলছে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে। আহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম সিএমএইচে ১০ এবং ঢাকায় ৭ জনের চিকিৎসা চলছে। ঘটনায় জড়িতদের ধরতে চলছে অভিযান। সেনা কর্মকর্তাদের ধারণা, এ ঘটনার সাথে জড়িত ইউপিডিএফ প্রসিত গ্র“প ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি জেএসএস। এছাড়াও উক্ত নির্মম ঘটনার সার্বিক বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে তুলে আনতে ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামস্থ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একজন ডিডিএলজি’র নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানাগেছে। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ নজরুল ইসলামকে নিয়ে মোট সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে বলে জানাগেছে।

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাতে গত ১৫ মাসে অন্তত ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। কয়েক বছর সমঝোতার ভিত্তিতে চললেও গত ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে পাহাড়ের দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক দলগুলো সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। সোমবার রাঙামাটির বাঘাইছড়ির নয় মাইল এলাকায় ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে গাড়িতে করে ফেরার সময় নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ সাত জনকে ব্রাশ ফায়ার করে নিহত করে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল নয়টার সময়ে বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সুরেশ কুমার তংচঙ্গ্যাকে তার সন্তানের সামনে থেকে ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে জেএসএস নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এদিকে পরপর দুটি বড় আকারের সশস্ত্র হামলায় আটজন মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙ্গালী সম্প্রদায়সহ রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেভেন মার্ডারের ঘটনায় জড়িত আঞ্চলিকদলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধরতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর সদস্যরা শীঘ্রই সাঁড়াশি অভিযানে নামবে বলে জানিয়েছে সেনা কর্তৃপক্ষ।

এদিকে হতাহতদের পরিবার ও স্বজনদের সাথে দেখা করতে বাঘাইছড়িতে ছুটে যান রাঙামাটি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ উদ্বর্তন কর্মকর্তাগণ। মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি থেকে রওয়ানা হয়ে বাঘাইছড়ির ঘটনাস্থল নয়কিলো এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শনসহ বাঘাইছড়ি উপজেলাবাসীর সাথে মতবিনিময় করেছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ, পুলিশ সুপার আলমগীর কবির, আনসার ব্যাটালিয়ান পরিচালক আব্দুল আওয়ালসহ প্রশাসনের উদ্বর্তন কর্মকর্তাগণ। এসময় উক্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানানোসহ এই নির্মম ঘটনার সাথে জড়িতদের অচিরেই আইনের আওতায় আনা হবে বলে হতাহতদের স্বজনদের আশ্বস্থ করেছেন তারা। এদিকে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের উদ্বর্তন কর্মকর্তাদের কাছে বাঘাইছড়ির নয়কিলো নামক স্থানটিসহ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য থাকা এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ক্যাম্প বসানোর দাবি জানিয়েছে হতাহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে মতবিনিময় সভা শেষে নিহতদের পরিবারকে তাৎক্ষনিকভাবে ২০ হাজার টাকা ও আহতদেরকে ১০ হাজার টাকা করে প্রদান করেন জেলা প্রশাসক। এরআগে, মঙ্গলবার সকালে বাঘাইছড়ির ঘটনাস্থলের আশপাশে সবগুলো পাহাড়ি এলাকা ঘিরে ফেলে যৌথ বাহিনী। সকাল থেকে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করছেন।

এদিকে জেএসএস ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান পরিচালনাসহ পাহাড়ের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শীঘ্রই চিরুনী অভিযান না চালালে লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচীর ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগসহ বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। মঙ্গলবার রাঙামাটি শহরে এবং বাঘাইছড়ি উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশও করেছে তারা।

জানাগেছে, নিহত সাতজনের মধ্যে ৬ জনের মরদেহ খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ঐ ঘটনায় আহত ১৭ জনের মধ্যে আশঙ্কাজনক সাতজনকে মঙ্গলবার সকালে ঢাকা সিএমএইচয়ে আনা হয়েছে। বাকী ১০ জন চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এদিকে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে গঠিত সাত সদস্য বিশিষ্ট্য তদন্ত কমিটিতে যারা রয়েছেন তারা হলেন,

১. পরিচালক, স্থানীয় সরকার (অতিরিক্ত সচিব), চট্টগ্রাম বিভাগ, চট্টগ্রাম,

২. ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ এর প্রতিনিধি (অতিরিক্ত ডিআইজি পদ মর্যাদা)

৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এর প্রতিনিধি (যুগ্মসচিব পদ মর্যাদা),

৪. পরিচালক ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক, ৩০আনসার ব্যাটালিয়ন, ফয়েজলেক, চট্টগ্রাম,

৫. সেক্টর কমান্ডার, বিজিবি, সেক্টর সদর দপ্তর, রাঙ্গামাটি এর প্রতিনিধি (মেজর পদ মর্যাদা)।

৬. মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ,

৭. বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, রাঙ্গামাটিকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

এই কমিটিকে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যেই উক্ত ঘটনার কারণ ও করনীয় নির্ধারন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে সুপারিশসহ তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।