কেমন আছেন বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের মা?

॥ আরিয়ান আরিফ – ভোলা ॥

কুমড়ো ফুলে-ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা। আর, আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি, খোকা তুই কবে আসবি। কবে ছুটি?’

খোকা ফিরে আসবে এমন আশায় গত ৪৪ বছর বুক বেঁধে দিন গুনছেন বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম (৯৫)। তার বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের মৌটুপী গ্রামে।

একে একে পরিবারের ৮ সদস্যের চলে যাওয়া দেখলেও শুধু ছেলের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। প্রতিদিন সবার অজান্তে ছেলের কথা ভেবে দিনের কোনো এক সময় তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ে, ছেলে ফিরে আসে না। ছেলে যুদ্ধে যাওয়ার আগে বলে গেছে ‘দোয়া করো মা। হয়তো আর ফিরে নাও আসতে পারি।’ সেইযে গেলো মা ছেলের আর দেখা হলো না।

১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জন্মগ্রহণ করেন ভোলা দৌলতখান উপজেলার হাজিপুর গ্রামে । ১৯৮২ সালে রাক্ষুসে মেঘনার ভাঙন ওই বাড়িটি গ্রাস করার পর তার পরিবার ভোলা শহরের আলীনগর ইউনিয়নের মৌটুপী গ্রামে চলে আসেন। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের পক্ষ থেকে ৯২ শতাংশ জমির ওপর শহীদ স্মরণিকা নামে একতলা পাকা ভবন নির্মাণ করে পরিবারটিকে পুনর্বাসন করা হয়। স্বামী, সন্তান, নাতিসহ পরিবারের ৮ সদস্যকে হারিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগম এখন বাকরুদ্ধ প্রায়।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মৃত্যুঞ্জয়ী সৈনিক ভোলার কৃতিসন্তান বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। সেদিন দেশের মানুষকে স্বাধীনতা এনে দিতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেন। তিনি ব্রাহ্মমবাড়িয়ার আখাউরায় পাক সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হন।

সেই শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে কেমন আছে তার মা এ খবর রাখে না কেউ। বছর ঘুরেই এ মাসটিতে নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে দেশের প্রতিটি জেলায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে এই দিবসটিকে উদযাপন করা হয়। একই সাথে এই বিশেষ দিনগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে শহীদদের পরিবারের অনেকটা খোঁজ নেয়া হলেও, দিন যাওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে যায় তাদের প্রতি দেখানো সহানুভূতি। বাকি দিন গুলো অবজ্ঞায় আর অবহেলায় পরে থাকে বীর শ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের পরিবারের মতো শহীদ পরিবারগুলো।

দেশের সাত বীর শ্রেষ্ঠের মধ্যে মোস্তফা কামাল একজন। এরপরও তার পরিবারটি পায়নি সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন সহায়তা। মিউজিয়াম কাম লাইব্রেরী নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০৯ সালের ৩ মে মোস্তফা কামালের বাড়ির এক পাশে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল গ্রন্থগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হয় আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও বীরশ্রেষ্ঠদের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে।

তবে প্রায় সময়ই এটি বন্ধ থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসে ফিরে যায়। এছাড়া খোলা থাকলেও দেখার মতো তেমন কোনো সরঞ্জামাদি না থাকায় অনেকে একবার এসে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

মোস্তাফা কামালের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গত জোট সরকারের আমলে তিনি ঢাকায় মোস্তফা কামালের নামে হওয়া স্টেডিয়ামে মাস্টার রোলে চাকরি করতেন। তার ওই চাকরিটি স্থায়ীকরণের জন্য বার বার সরকারের কাছে আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। সেখানে যা বেতন দেওয়া হতো তা দিয়ে পরিবারের খরচ তো দূরের কথা নিজে চলাও কঠিন হয়ে যেত। এছাড়া নিয়মিত বেতন ভাতা না পাওয়ার কয়েক বছর আগে মোস্তাফিজ অভিমানে চাকরি ছেড়ে ভোলায় এসে এখন চাষাবাদ করে কোনো মতে সংসার চালাচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, শহীদ পরিবারের তার দুই ছেলে অনার্স শেষ করেও ভাগ্যে জোটেনি কোন সরকারি চাকরি। কবে সংসারের অভাব দূর হবে এ আশায়ই দিন গুনছেন এখন তার পরিবারের সদস্যরা।