শহীদ মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা’র আত্মত্যাগ ও তার পরিবারের জীবনসংগ্রাম (৪র্থ পর্ব) 

॥ ইকবাল হোসেন ॥
(৩য় পর্বের পর)
চকবাজার’র বাড়িতে পৌঁছানোর পর ঘটে আরেক বেদনাদায়ক  ঘটনা। যে পরিবার’র কাছে ফেরার জন্য নিজের জন্মদাতা পিতার যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু’র কষ্ট বুকে নিয়ে একমাত্র যে আশা নিয়ে এতদিন দিনযাপন করছিলেন। জীবন’র ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে ফিরে দেখেন ঘরের দরজায় তালা দেয়া। আর ভাঙ্গা জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরকার অবস্থা দেখে তিনি খুব সহজে বুঝতে পারলেন যে, তার বাসায় দুষ্কৃতকারী রা লুটপাট করেছে। কারন ঘরের ভেতরে সবকিছু অগোছালো অবস্থায় ছিলো আর কোন দামী আসবাবপত্র থেকে শুরু করে কিছুই ছিলো না।
এমনিতেই রতন চাকমা বাবা’র মৃত্যু’র ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন। বাড়ির অবস্থা দেখে তিনি আরো চিন্তায় পড়ে যান তার মাথায় বিভিন্ন রকম উল্টাপাল্টা কথা আসতে থাকে। বাবা’র মতো পরিবার’র অন্যান্য সদস্যদের হারানোর মতো উদ্ভট চিন্তাভাবনা আসতে থাকে রতন চাকমা’র মনে। এমতাবস্থায় এক প্রতিবেশী তাকে দেখে এগিয়ে আসে। প্রতিবেশী’র কাছ থেকেই জানা যায় তার পরিবার’র বাকি সদস্যদের নিয়ে তার মা রাঙামাটিতে চলে এসেছেন। এ কথা শোনা মাত্র রতন চাকমা’র দুশ্চিন্তা কিছুটা দূর হয় এবং সাথে সাথে তিনি চকবাচার অলি খাঁ’র মসজিদ এর সামনে হতে বাসে  করে রাঙামাটি পর্যন্ত আসেন। রাঙামাটি আসার পর তিনি সকল আত্মীয়-স্বজন’র বাসায় পাগল’র মতো নিজের মা ও ভাই-বোনদের কে খোঁজা শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত বর্তমান মাঝের বস্তিতে তার মা প্রকৃতি চাকমা’র বড় বোন’র জামাতা তৎকালীন বন বিভাগ’র কর্মকর্তা সুশীল জীবন চাকমা’র বাসায় পরিবার’র কয়েকজনকে খুঁজে পান বাকিদের পান তার মা’র ছোট বোন’র জামাতা বিদুৎ দেওয়ান’র বাসায়। নিজের প্রান প্রিয় বাবা কে হারানোর পর জন্মদাত্রী মা কে জীবিত দেখে রতন চাকমা ও তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে এসময় মা ও ছেলে’র মধ্যে যা কথোপকথন হয় তা হলো:-
রতন চাকমা’র মা ধরে নিয়েছিলেন হয়ত তাকে জীবিত ফিরে পাবেন না। আর ২৫শে মার্চ কালরাত্রি’র পর তার মা পরিবার’র বাকিদের নিয়ে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় কালুরঘাট থেকে সাম্পান (পার্বত্য অঞ্চল’র ঐতিহ্যবাহী নৌকা’র মত বাহন) এ করে কাপ্তাই আসেন। তারপর কাপ্তাই থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে তৎকালীন রাঙামাটি শহরে এসে আত্মীয়-স্বজন’র বাসায় আশ্রয় নেন। রতন চাকমা তার মা কে বাবার ঘটনা বলার পর তার মা প্রকৃতি চাকমা’র বড় বোন’র বড় মেয়ে’র জামাতা নন্দিত রায়’র মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনী’র সাথে যোগাযোগ’র ব্যবস্থা করেন। নন্দিত রায় ও রতন চাকমা’র বড় ভাই  ডা. কিশলয় চাকমা কে নিয়ে বর্তমান ডিসি বাংলো যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী’র ক্যাম্প ছিলো ওইখানে তার বাবা শহীদ খগেন্দ্রলাল চাকিমা কে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এ নিয়ে যাওয়ার পর তার ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা জানতে চেয়ে একটি দরখাস্ত দেন। যে দরখাস্ত’র উত্তর আর পাওয়া যায় নি কিন্তু দরখাস্ত দেয়ার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে, অতি শিগ্রই শহীদ খগেন্দ্রলাল চাকমা’র অবস্থা সম্পর্কে তাদের জানানো হবে।
পরবর্তী পর্বে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী শহীদ খগেন্দ্রলাল চাকমা’র পরিবার’র মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জীবন জীবন সংগ্রাম তুলে ধরা হবে