শহীদ মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা’র আত্মত্যাগ ও তার পরিবারের জীবনসংগ্রাম (শেষ পর্ব)

॥ ইকবাল হোসেন ॥
১৯৭১ সাল’র ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। পৃথিবীর মানিচিত্রে জন্ম হয় নতুন এক দেশের। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে পরাধীন হয়ে পরে শহীদ খগেন্দ্রলাল চাকমা’র পরিবার। রতন চাকমা’র ভাষ্যমতে ৮ভাই-বোন’র পড়ালেখা’র খরচ বহন করতে গিয়ে তার মমতাময়ী মা স্বর্গীয় প্রকৃতি চাকমা। রতন চাকমা আরো তার বাবা’র স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে প্রচুর দুঃখ কষ্ট সত্যেও তার মা সকল ভাই-বোন কে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন।
বর্তমানে খগেন্দ্রলাল চাকমা’র পাঁচ পুত্র সন্তান ও তিন কন্যা সন্তান মোট আটজন সন্তানাদির বর্তমান অবস্থান নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ-
১. ডা. কিশলয় চাকমাঃ-
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ডা. কিশলয় চাকমা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অধ্যায়নরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে চিফ কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। বর্তমানে তিনি সপরিবারে ঢাকায় বসবাস করছেন।
২. ইঞ্জিনিয়ার সুবীর চাকমা
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইঞ্জিনিয়ার শুবীর চাকমা স্কলারশিপ পেয়ে ভারত এ লুদিয়ানা এগ্রিকালচার ইউনিভারসিটি, পাঞ্জাব এ অধ্যায়নরত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ইউনাইটেড ন্যাশন (ইউএন) এর ভলান্টিয়ার হিসেবে প্রথমে কেনিয়া তে ২ বছর এরপর নেপালে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অষ্ট্রেলিয়া তে সপরিবারে চলে যান এবং অষ্ট্রেলিয়া’র নাগরিকত্ব লাভ করেন। যদিওবা তিনি পরলোক গমন করেছেন কিন্তু তার স্ত্রী ও ২ পুত্র সন্তান বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়াতে বসবাস করছেন।
৩. জয়া চাকমা
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জয়া চাকমা প্রবর্তক বালিকা বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। ঢাকা আর্ট কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় গল ব্লাডার ইনফেকশন এ তিনি পরলোক গমন করেন।
৪. কৃষ্ণা চাকমা
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কৃষ্ণা চাকমা প্রবর্তক বালিকা বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি বিয়ের পর ১ছেলে ও ১ মেয়ের জন্য গৃহিনী হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করেন। কিছুদিন পূর্বে তার স্বামী পরলোক গমন করেছেন বর্তমানে তিনি ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন।
৫. ইঞ্জিনিয়ার রতন চাকমা
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রতন চাকমা ক্যাডেট কলেজে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য তার বাবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা’র সাথেই অবস্থান করছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম কলিজিয়েট স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বর্তমান চুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে ব্যবসায় করছেন।
৬. শিপ্রা চাকমা
 মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চাকমা প্রবর্তক বালিকা বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি রাঙামাটিতে প্রাইমারী টিচার্স ট্রেইনিং ইন্সটিটিউট এ (এসিসটেন্ট সুপারেনটেন্ড) হিসেবে কর্মরত আছেন।
৭. সজীব চাকমা
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সজিব চাকমা চট্টগ্রাম’র এম আই ই স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিলেন। এরপর তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। বর্তমানে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসায়’র সাথে জড়িত আছেন এবং রাঙামাটি তে তিনি ২ ছেলে ও স্ত্রী কে নিয়ে বসবাস করছেন।
৮. অমিত চাকমা রাজু
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রাম’র এম আই ই স্কুলে ১ম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা’র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ’র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ১ ছেলে ১ মেয়ে ও স্ত্রী কে নিয়ে তিনি রাঙামাটিতে বসবাস করছেন।
রতন চাকমা তার সকল ভাই-বোন’র শিক্ষাগ্রহণ’র বিষয়ে বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত কন্ঠে বলেন ” আমার মমতাময়ী মা আমাদের পড়ালেখা’র খরচ বহন করার জন্য অনেক কষ্ট করেছে। মুক্তিযুদ্ধে বাবা শহীদ হবার পরও মা আমাদেরকে সাধ্যমতো সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বহু সংগ্রাম করেছেন”
পড়ালেখা ও পরিবার চালনার খরচের ব্যবস্থা কিভাবে হয়েছিলো জানতে চাইলে রতন চাকমা জানান।
স্বাধীনতার পর জেলা প্রশাসন হতে তারা একটি বেবিট্যাক্সি (টু স্টোক) গাড়ি পেয়েছিলেন ও প্রতি মাসে ২,০০০/- (দুই হাজার টাকা) সম্মানী ভাতা পেতেন যা বর্তমানেও তারা পাচ্ছেন।
পরবর্তীতে তার মা তাদের চট্টগ্রাম’র চকবাজার’র বাড়ি বিক্রি করে ৭৫,০০০/- পান। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন’র সহযোগিতায় তারা জীবন সংগ্রাম চালিয়েছেন। যদিও শহীদ খগেন্দ্রলাল চাকমা স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন প্রায় ১লক্ষ টাকা বিভিন্ন মাধ্যমে খরচ করে ২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র সংগ্রহ করতে পেরেছেন। যদিও উক্ত সনদে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা খগেন্দ্রলাল চাকমা কে মৃত মুক্তিযোদ্ধা দেখিয়ে সনদ টি প্রদান করেছেন।
রতন চাকমা পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার মাধ্যমে প্রশাসন’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে বল
করে বলেন। আমার মা সারাজীবন অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করে আমাদেরকে মানুষ করেছেন। মা’র সুধু একটা আশা ছিলো যে, আমার বাবা’র নামটি শহীদ হিসেবে সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হতে দেখা। কিন্তু এ আশায় আশায় ২০১৪ সাল’র ১৫ই অক্টোবর আমার মা পরলোক গমন করেছেন। এখন আমাদের একটাই দাবি অন্তত আমরা বেঁচে থাকাকালীন আমাদের বাবা’র নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হতে দেখে যেতে পারা।