রাঙামাটিতে নিয়ন্ত্রণহীন স্বাস্থ্যসেবাঃ নার্স-বয় সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও রোগীরা!

॥ আলমগীর মানিক ॥

চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির স্বাস্থ্যসেবা। মানব সেবার ব্রত নিয়ে অত্রজেলায় চাকুরিরত চিকিৎসক থেকে শুরু করে নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের কাছ থেকে নিয়মিতভাবেই দূর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবাপ্রার্থী রোগী ও তাদের স্বজনরা। সিন্ডিকেট চক্রের কাছে নিজেরাও বেশ অসহায় বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা।

মঙ্গলবার ১৬ই এপ্রিল জেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ের শৃঙ্খলা সভায় স্থানীয় সিনিয়র সিটিজেনদের কাছ থেকে উঠে আসা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি হয়ে আসা সদর থানার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সিনিয়র চিকিৎসক ডাঃ বিনোদ শেখর চাকমা নিজেই অকপটে স্বীকার করে জানালেন, রাঙামাটি সদর হাসপাতালে আমি নিজেও অসহায়বোধ করি। হাসপাতালের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূর্ব্যবহারের কথাটি একদমই সঠিক। এদেরকে একাধিকবার শোধরাবার চেষ্ঠা করেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি। উল্টো আমি এখন হাসপাতালে গেলেই তারা বলে উঠেন, ঐ যে বেটা আবার এসেছে।

এদিকে পার্বত্য চুক্তিনুসারে পার্বত্য অন্য দুই জেলার ন্যায় রাঙামাটি জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ রাঙামাটি জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তরিত বিভাগ হলেও জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করাসহ এই ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে উত্তরনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় আইন শৃঙ্খলা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। আইন শৃঙ্খলা সভায় সভার সদস্য সুশীল সমাজসহ রাজনৈতিক পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি নির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগ করে জানান, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত সিনিয়র নার্সসহ শিক্ষানবিস নার্স, ওয়ার্ডবয় এবং ঔষধ সরবরাহের কাজে নিয়োজিতদের মধ্যে বিশাল একটি সিন্ডিকেট চক্র রয়েছে। এদের কাছে কখনোই সেবা পাওয়া যায়না। এরা সবসময় হাসপাতালে আগত রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে চরমভাবে দূর্ব্যবহার করে।

এছাড়া কয়েকদিন আগে একটি নবজাতক বাচ্চাও নার্সদের অবহেলায় মারা গেছে বলেও আইনশৃঙ্খলা সভায় অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এদিকে সভায় জানানো হয়, হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চাকুরিরত নার্সরা অতিমাত্রায় দূর্ব্যবহার করে যা দেখলে মনে হবে যেন তারাই জেলার সিভিল সার্জন।

বছরের পর বছর একই হাসপাতালে চাকুরির সুবাদে কিছু সিনিয়র নার্সসহ ঔষধ বিতরনকারী কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগও উঠে আসে সভায়। কর্তব্যরত অবস্থায় রোগী বা তার স্বজনদের ঔষধ সরবরাহ না করে মোবাইলে ফেসবুক চালানোসহ হাসপাতালে আগত ঔষধ কোম্পানীর এমআরদের সাথে বসে খোশগল্পে মেতে থাকে। কয়েকদিন আগে এ ধরনের একটি ঝামেলাও হয়েছে।

এই ধরনের বিষয়গুলো অত্যন্ত নিন্দনীয় মন্তব্য করে আইন শৃঙ্খলা সভার সভাপতি ও রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ এই বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে জেলার সিভিল সার্জনের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, মেডিকেল কলেজসহ একটি জেনারেল হাসপাতালে বর্তমান সময়ে এই ধরনের অব্যবস্থাপনা নির্ভর দূর্ব্যবহারের শিকার হয়ে স্বাস্থ্য সেবা থেকে রাঙামাটিবাসী বঞ্চিত হবে এটা মানা যায়না। এই থেকে পরিত্রাণে আপনারা ব্যবস্থা নিন, প্রয়োজনে মোটিভেশনাল কার্যক্রম হাতে নিন, কর্মশালার আয়োজন করেন আমি (জেলা প্রশাসক) ও পুলিশ সুপার উভয়েই এতে অংশগ্রহণ করে তাদের সচেতন করে গড়ে তুলবো।

এদিকে, আইন শৃঙ্খলা সভায় আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কসহ রাঙামাটি জেলার অভ্যন্তরীন সড়কগুলো সঠিকভাবে মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সড়ক বিভাগ, এলজিইডি ও পৌরসভাকে নির্দেশনা দিয়েছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, এবছর রাঙামাটিতে আগাম বর্ষাসহ ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। তার জন্য আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে। যে সকল সড়ক এখনো ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে সড়ক গুলো যাতে দ্রুত মেরামত করা হয় তার জন্য প্রতিষ্ঠান গুলোকে ইতিমধ্যেই তাগাদা দেয়া হয়েছে।

এসময় রাঙামাটি পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবির, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ নজরুল ইসলাম, পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী, জেলা পরিষদ সদস্য ত্রিদীব কান্তি দাশসহ রাঙামাটি জেলার সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান/প্রতিনিধি এবং জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যগণ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

সভায় রাঙামাটির এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে রাঙ্গামাটির অভ্যন্তরীন সড়কের বেশ কিছু ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তা আমরা সংস্কার করেছি এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসময় তিনি দৃঢ় কন্ঠেই জানান, আমরা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। অপরদিকে, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী শংকর প্রসাদ পাল বলেন, যে কোন দূর্যোগ মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি। রাঙামাটিতে অতীতের তুলানায় কোন ধরনের যদি দুর্যোগ হয় তাহলে তা মোকাবেলা এবং রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে আমাদের সকল যন্ত্রপাতি হাতে রয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলো মেরামতের কাজ চলছে।