পর্দা নামছে সর্বকালের সেরা জনপ্রিয় টিভি সিরিজ “Game Of Thrones”র

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

আট বছরের এক মহাকাব্যিক যাত্রা দেখে এসেছে গেম অব থ্রোন্স ভক্তরা। এখন সময় হয়েছে সমাপ্তির। বছর তিনেক আগে এইচবিওর প্রেসিডেন্ট কেসি ব্লয়েজ বলেছিলেন, “সম্ভব হলে আমি আরো অন্তত ১০টা সিজন বানাতাম।” তবে তা তো আর সম্ভব নয়। তাই অষ্টম সিজনেই পর্দা নামবে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় টিভি সিরিজের। আগামীকাল ২০ মে সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টাই অষ্টম সিজনের ষষ্ঠ এবং লাস্ট এপিসোড প্রচার হবে আর তারপর………সব শেষ!

খালিসীর চরিত্রে এমিলিয়া ক্লার্ক

চলুন জেনে আসা যাক টেলিভিশন সিরিজের ইতিহাসে সর্বকালের জনপ্রিয় এই সিরিজের কিছু তথ্যঃ

গেম অফ থ্রোন্স টিভি সিরিজটি প্রখ্যাত লেখক জর্জ আর আর মার্টিনের দা সং অফ আইস এন্ড ফায়ার বইয়ের টিভি এডাপ্টেশন। গেম অফ থ্রোন্স রুপকথার একটি পৃথিবীর গল্প যার নাম ওয়েস্টোরোস। যার রাজধানী কিংস ল্যান্ডিংস। এই রাজ্যে আছে প্রধান কিছু রাজপরিবার যেমন হাউন অফ স্টার্ক ,হাউজ অফ ল্যানিস্টার ,হাউজ অফ টারগারিয়ান ইত্যাদি।

টিরিয়ন ল্যানিস্টারের চরিত্রে পিটার ডিংল্যাগ

নামে টিভি নাটক হলেও এইচবিও প্রযোজিত এই টিভি সিরিজ আসলে অনেকটা সিনেমার চেয়েও বেশী কিছু। এই সিরিজের বাজেট শুনলে আপনি টাস্কি খাবেন। প্রথম কয়েকটি সিজনে এভারেজ পার এপিসোড বাজেট ছিলো ৬ মিলিয়ন ডলার যেটা ফাইনাল সিজনে এসে ঠেকেছে ১৫ মিলিয়ন ডলার প্রতি পর্ব। সিজন ৭ এর এক একটি এপিসোডের বাজেট ছিলো ১০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এই সিজনে শুধু প্রোডাকশনেই খরচ হয়েছে ৭০ মিলিয়ন ডলার। একটা রাফ হিসেব করে দেখা যায় এখন পর্যন্ত এই শো-এর প্রোডাকশনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী টাকায় সেটা কত শুনতে চান? ৪ হাজার কোটি টাকা। যেটা অনেক বলিউড মুভির বাজেটের সমান। এবং এই বাজেট শুধু সিরিজের সেট নির্মানের। অভিনেতাদের বেতন আলাদা। প্রতি পর্বের জন্য হাইয়েস্ট দুই লক্ষ ডলার।

এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ৮ টি দেশে এই সিরিজের শ্যুটিং হয়েছে যার মধ্যে ক্রোয়েশিয়া এবং আইসল্যান্ডে এই সিরিজের শ্যুটিং হওয়ার পরে তাদের পর্যটন ব্যাবস্থা থেকে আয় বেড়ে গিয়েছে। কারন অনেক গট ফ্যানরা রিয়েল শ্যুটিং স্পটে ট্রাভেল করতে চায়। ২০১৪ সালে স্পেনে এই সিরিজ শ্যুটিং এর পর ১৫% ট্যুরিস্ট আসা বেড়ে যায়। আই উইশ আমাদের দেশে হতো।

জন স্নোর চরিত্রে কিট হ্যারিংটন

ঠিক এ কারণেই বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিম গেম অফ থ্রোন সিরিজকে বিশ্বের সবচাইতে বিস্তৃত (widespread) শিল্পকর্ম (artwork) নাম দিয়েছে যার ফ্যানরা হচ্ছে সবচাইতে লয়াল।

গেম অফ থ্রন এখন পর্যন্ত ৩৮ টি এমি এওয়ার্ডস জিতেছে যেটাকে টিভির অস্কার বলা হয়।

এই সিরিজ বানানোর দরকারে প্রোডাকশন টিমের ভাষাবিদেরা ৫ হাজার শব্দ সমৃদ্ধ একটি সম্পূর্ণ নতুন ভাষার জন্ম দিয়েছেন যার নাম হাই ভ্যালেরিয়ান ভাষা। আরেকটি ভাষার জন্ম হয়েছে ডথরাকি ভাষা যার শব্দ সংখ্যা ৩০০০। চিন্তা করতে পারেন একটি নাটকের জন্য দুইটি নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। কি লেভেলের গবেষণা করা হয়েছে এই নাটক বানানোয়।

গেমের একটি চরিত্র মাদার অফ ড্রাগন দেইনারিশ টারগারিয়ানের ডাকনাম (খালেসি) নামানুসারে ২০১৪ সালে আমেরিকায় ১৮৫ জন মেয়ে বাচ্চার নাম রাখা হয়। জীবন থেকে নেয়া নাম না,নাটক থেকে জীবনে নেয়া নাম। গট প্রসেস টাকে উল্টো করে দিয়েছে। ২০১১ সালে এইচবিওতে যখন গেম অব থ্রোন্সের প্রিমিয়ার হয়, তার আগ পর্যন্ত খালিসি ছিল একদমই অজানা, অপরিচিত একটি শব্দ।

সার্সি ল্যানিস্টারের চরিত্রে লিনা হ্যাইডি

অথচ সেটিই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পর্দা ছেড়ে বাস্তব জীবনের নিত্য-ব্যবহার্য শব্দের একটিতে পরিণত হয়েছে। সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এটি ছিল নবজাতক শিশুকন্যাদের প্রদত্ত ৬৩০তম জনপ্রিয় নাম। এটি জনপ্রিয়তায় এমনকি ‘ব্রিটানি’ বা ‘ব্রিটনি’কেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

সব মিলিয়ে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৭৬ জন নবজাতক কন্যাশিশুর নাম রাখা হয়েছিল খালিসি। আর খালিসি তথা ড্রাগন কুইনের ভূমিকায় অভিনয় করা এমিলিয়া ক্লার্কের প্রকৃত নামটি দর্শকদেরকে আরো বেশি আকৃষ্ট করেছিল। ২০১০ সালে যেখানে মাত্র ৯২৫ জন এমিলিয়ার জন্ম হয়েছিল, সেখানে ২০১৬ সালে জন্ম হয় ৩,০১৯ জন এমিলিয়ার। শিশুদের নামকরণের ক্ষেত্রে খালিসিই সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম নয়। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২,১৫৬ জন নবজাতক শিশুর নাম রাখা হয়েছিল আরিয়া। খালিসি ও আরিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নবজাতক শিশুদের নাম হিসেবে উল্লেখযোগ্য আরেকটি নাম হলো ডেনেরিস। অবশ্য খালিসির তুলনায় খালিসির প্রকৃত নামটি জনপ্রিয়তায় বেশ পিছিয়েই আছে। এছাড়া কেবল ২০১৭ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে ২০ জন সানসা, ১১ জন সার্সেই, ৫৫ জন টিরিয়ন এবং ২৩ জন থিয়ন। পোষ্য জীবজন্তুদের নাম হিসেবেও অনেকের প্রথম পছন্দ গেম অব থ্রোন্সের বিভিন্ন চরিত্র। যেমন অনেকেই তার কুকুরের নাম রাখছে জোরাহ, আশা কিংবা টিরিয়ন, আর বিড়ালের নাম লেডি কিংবা ড্রোগো।

সুখের সংবাদ হচ্ছে এই শেষ কিন্তু শেষ নয়। নির্মাতারা ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন ২০২০ সাল নাগাদ এই সিরিজের প্রিকুয়েল নিয়ে আবার ফিরে আসবেন তারা। এরই মধ্যে এর কাজও শুরু হয়ে গেছে বলে জানা যায়। তাই গেইম অফ থ্রোন্স ভক্তদের মন খারাপ না করে একটু ধৈর্য্য ধরলেই মেওয়া ফলবে।