কোটি টাকা রাজস্ব’র বদলে শ’টাকার চাঁদা দিয়ে রাঙামাটিতে চলছে জোড়া চেসিসের শতাধিক ট্রাক!

॥ আলমগীর মানিক ॥

আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ উপায়ে বানানো ট্রাকে সয়লাব হয়ে পড়েছে দেশের রাস্তাগুলো। পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে এই ধরনের অবৈধ জোড়া লাগানো চেসিস এর ট্রাকই বেশির ভাগ বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। রাঙামাটি থেকে চলাচলকারি এসব ট্রাকের উপর সর্বাত্মক জরিপ চালানো নাগেলেও পরীক্ষা করে দেখা গেছে অনেকগুলো ট্রাকই বে-আইনীভাবে জোড়া লাগানো চেসিস দ্বারা বানানো হয়েছে। এতে যেমন দূর্ঘটনার ঝুকি বাড়ছে, তেমনি সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপকরে জানাগেছে, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভাঙ্গারি হিসেবে বিক্রির উদ্দেশ্যে দেশের পুরাতন বাতিল গাড়িগুলোর চেসিসকে কেটে দুই টুকরো করে সেগুলোকে (ইস্ক্রাব) হিসেবে দেশে প্রবেশ করানো হয়। এরপর দেশীয় চট্টগ্রামের একটি চক্র সেসব চেসিস সংগ্রহ করে সেগুলোকে জোড়া লাগিয়ে নির্দিষ্ট্য সাইজের বাইরে আরো বড় করে বডি বাধিয়ে রাস্তায় নামায়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের একটি অসাধু চক্রের সাথে আতাঁত করে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে উক্ত অবৈধ চেসিস কাটা গাড়িগুলোকে বৈধ ফিটনেস সংগ্রহ করে ট্রাক মালিকদের একটি অংশ। এছাড়াও এসব ট্রাক-মিনি ট্রাক চলাচলে রাঙামাটি থেকে শুরু করে রাউজান, হাটহাজারী, অক্সিজেন, চট্টগ্রাম হাইওয়ে থেকে শুরু করে ফেনী, কুমিল্লা, নারায়নগঞ্জ, যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০ পয়েন্টে চাঁদা দিয়ে এসব ফিটনেসবিহীন অবৈধ গাড়িগুলো চালাচ্ছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য রাঙামাটি জেলায় এই ধরনের অন্তত শতাধিক ট্রাক-মিনিট্রাক রয়েছে, যেগুলো কাটা চেসিস জোড়া লাগিয়ে বানানো হয়েছে। এসব গাড়ি দিয়ে রাঙামাটি থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামে কাঠ পরিবহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল পরিবহন করা হয়। এই ধরনের গাড়ির কারনেই কাঠ ব্যবসায়িসহ অন্যান্য ব্যবসায়িরা প্রায় সময়ই ধরাশায়ী হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ ব্যবসায়ি নেতারা। ক্ষুদ্র কাঁচামাল ব্যবসায়িদের অভিযোগ, ডিস্ট্রিক গাড়ি এবং কাটা চেসিস এর গাড়িগুলো আমরা অনেক সময় চিনি না। যার ফলশ্র“তিতে আমরা যখনই ভাড়া নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাই, পথিমধ্যে আমাদের গাড়িগুলো আটকিয়ে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয় সংশ্লিষ্ট্য চেকপোষ্টের পুলিশ সদস্যরা।

রাঙামাটি থেকে ঢাকা পর্যন্ত পৌছাতে অন্তত ১৫টি স্থানে এই ধরনের চাঁদা দিতে হচ্ছে অভিযোগ করে বেশ কয়েকজন কাঁচামাল ব্যবসায়ি জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ে কাঁচা ফলমূলবাহি গাড়িগুলোকেই বেশি মাত্রায় চেকআপের আওতায় এনে হয়রানী করছে পুলিশ। রাউজান থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকা পর্যন্ত পৌছাতে হাইওয়ে পুলিশের অন্তত ১১টি স্থানে এই বিশেষ চেকপোষ্টে সর্বনিন্ম ২শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। টাকা নাদিলে অযথা হয়রানী করা হয় এতে করে আনারস জাতীয় ফলবাহী গাড়ির মালামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে ব্যবসায়িরা নীরবেই সহ্য করে যাচ্ছেন এসব চাঁদাবাজির। তবে এই ধরনের হয়রানী থেকে সামান্যতম রক্ষা পায় কাঠ বোঝাই ট্রাকগুলো। এসব ট্রাকের জন্য কাঠ ব্যবসায়ি সমিতি ও কাঠ বাহক সমিতির  একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে আগে থেকে প্রতিটি চেকপোষ্টের জন্য নির্ধারিত হারে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়ে যায়। যার ফলে এসব ট্রাক রাস্তায় চলাচলে তেমন একটা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়না বলে জানাগেছে।

স্থানীয়রা গাড়ি ব্যবসায়িরা জানিয়েছেন, প্রভাবশালী সরকারদলীয় এবং পরিবহণ সেক্টরের নেতাদের মালিকানায় চলাচল করছে কাটা চেচিস এবং ফিটনেস বিহীন ট্রাকগুলো। তারা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এবং অবৈধ চক্রের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিআরটিএ থেকে নকল কাগজপত্র সংগ্রহ করে এসব ট্রাক রাস্তায় চালাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে পুলিশকে নির্দিষ্ট্য হারে টাকা পরিশোধ করেই অবৈধ ট্রাকগুলো রাস্তায় নামিয়েছে।

রাঙামাটি কাঠ ব্যবসায়ি সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী আবুল হাশেম আবু জানিয়েছেন, আমরা রাঙামাটি ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেকান্দরকে বিষয়টি আগে থেকেই অবহিত করে স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছি যে, আমাদের কাঠ পরিবহনে কোনো ধরনের আনকম্পিলিট গাড়ি দিবেন না। এসব গাড়ি নির্দিষ্ট্য জেলায় চলাচল করবে, এগুলো ঢাকায় নিয়ে গেলে ব্যবসায়িরা হয়রানির স্বীকার হয়। তিনি এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।

এদিকে, বিষয়টির আংশিক স্বীকার করে রাঙামাটিস্থ জেলা ট্রাক মিনিট্রাক মালিক-শ্রমিক যৌথ কমিটির সাধারণ সম্পাদক টিটু বিশ্বাস বলেছেন, আমাদের সমিতিরে এই ধরনের গাড়ি নাই এটা আমি বলবো না, তবে সেগুলো হাতে গোনা কয়েকটি। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট্য কর্তৃপক্ষকে হয়তো কিছু দিয়ে এসব গাড়ি চালাচ্ছে। এই ধরনের গাড়িগুলোর মালিকরা বেশির ভাগই রাঙামাটির নয় মন্তব্য করে টিটু জানান, এসব গাড়ির মালিকদের বিরাট একটি অংশ রানীরহাট-রাউজান ও হাটহাজারি এলাকার। তাদের গাড়িগুলো রাঙামাটি থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে টিটু জানান, ফিটনেস বিহীন ট্রাকগুলো বিশেষ করে যেসব ট্রাকগুলো জেলায় চলাচলের কথা, সেগুলো কিভাবে রাঙামাটি থেকে ভাড়া নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম চলাচল করে সেটি আমি জানি না। এই ব্যাপারে দেশের প্রচলিত আইনে সংশ্লিষ্ট্য কর্তৃপক্ষ যদি কোনো ব্যবস্থা নেয় তাহলে আমরাও সমিতির পক্ষ থেকে সহযোগিতা করবো।

রাঙামাটির ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মোঃ ইসমাইল হোসেন জানিয়েছেন, এই ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে কেউ করেনি। এছাড়া কাটা চেসিস এর ট্রাকের ব্যাপারে আমরা সুনির্দিষ্ট্য অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিবো।

এদিকে রাঙামাটি বিআরটিএতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক ওসমান সারোয়ার (বর্তমানে চট্টগ্রাম বিআরটিএতে কর্মরত) এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

রাঙামাটি ট্রাক মালিক সমিতির তথ্যানুসারে অন্তত ৬ শতাধিক ট্রাক-মিনিট্রাক রাঙামাটিতে রয়েছে। এসবের বিপরীতে মালিকদের চারটি এবং চালক শ্রমিকদের তিনটি সংগঠন রয়েছে। এই সাতটি সংগঠন এর সবগুলো মিলে রাঙামাটিতে জেলা ট্রাক মিনিট্রাক মালিক-শ্রমিক যৌথ কমিটি নামক আরো একটি সংগঠন করা হয়েছে। জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেকান্দর জানিয়েছেন, রাঙামাটি থেকে সারাদেশে প্রতিনিধি গড়ে দুই শতাধিক গাড়ি চলাচল করছে। তার দাবি তিনি এসব ব্যাপারে কিছুই জানেন না। বর্তমানে রাঙামাটির রুটে ফিটনেস বিহীন কোনো যানবাহন চলাচল করছেনা বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

এদিকে মালিক সমিতির প্রথমসারির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজির কারনেই দূর্ঘটনা বাড়ছে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, ২০ পয়েন্ট থেকে কয়েকটি পয়েন্ট দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে পার হতে পারলেই চালকরা ২ থেকে তিন হাজার টাকা সেভ করতে পারে। এই কারনেই দ্রুতগতিতে পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলো চালাতে গিয়ে দূর্ঘটনার শিকার হয় অনেকে। এই ধরনের চাঁদাবাজি আর হয়রানীর সুযোগ পুলিশ কেন পাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মালিক সমিতির এক নেতা জানান, আমাদেরই কিছু সদস্যের মালিকানাধীন কাগজপত্র বিহীন ট্রাকগুলোকে বৈধতা দিতে গিয়েই পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট্য অনেকগুলো ক্ষেত্রে চাঁদা দিয়ে ঠান্ডা রাখতে হয়।

মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা বৈধ উপায়ে ব্যবসা করতে চাই। তারা বলেন, একটি তিন টনবাহী মিনি ট্রাক সরকারী রাজস্ব দিয়ে আনতে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা খরছ হয়। সে জায়গায় জোড়া চেসিস এর একটি মিনি ট্রাক বানিয়ে রাস্তা চালাতে খরছ হচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। এতে করে সরকারকে প্রায় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই ধরনের অবস্থায় রাঙামাটিতে চলাচলকারি শতাধিক ফিটনেস বিহীন ও জোড়া লাগানো চেসিসের ট্রাকগুলোর কারনেই বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারছেনা সরকার। সরকারী সংশ্লিষ্ট্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় না থাকাসহ আইন প্রয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় এই ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছে মালিক-সমিতির নেতারা।