বৃষ্টির ঘনঘটায় ভয়ে কুঁকড়ে আছে রাঙামাটিতে ঝুঁকিতে থাকা নিন্ম আয়ের ১৫ হাজার মানুষ

॥ আলমগীর মানিক ॥

আবারো শুরু হয়েছে বৃষ্টির মৌসুম, কখনো থেমে থেমে, আবার কয়েকঘন্টা ধরে লাগাতারভাবে অঝোর ধারায় শুরু হয়েছে বৃষ্টির আগমন। এমনিতর পরিস্থিতিতে বর্তমান সময়ে প্রতিনিয়তই আতঙ্কিত হৃদয়ে দিনযাপন করছে পাহাড়ের পাদদেশে ঘর তৈরি করে বসবাস করা খেটে খাওয়া দরিদ্র শ্রেণীর মানুষগুলো। ছোট্ট পাহাড়ি এই শহরের সামান্য সমতলীয় জায়গাগুলোতে এমনিতেই সরকারী-বেসরকারী প্রশাসন, সামরিক, আধা সামরিক বিভিন্ন বাহিনীর নিজস্ব অফিসের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিজস্ব ভবনে ভরপুর।

যার কারনে শহুরের আশে-পাশেই পাহাড়ের উচু-নীচু ঢালে বসতি গড়ে তুলেছে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষজন। প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় এই মানুষগুলোই ধারাবাহিক ক্ষতির স্বীকার হয়। এসব মানুষজনকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে এবং তাদের জান-মালের ক্ষতি কমাতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে থেমে নেই পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস।

গত কয়েক বছরে বছরে পাহাড়ি এই জেলায় পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানির পরও আবারো একই জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বসতঘর। শহরের ভেদভেদী, কলেজ গেইট, যুব উন্নয়ন এলাকা, মনতলা আদাম, সাপছড়ি, পোস্ট অফিস এলাকা, জয়কালি মন্দির, মুসলিম পাড়া, নতুন পাড়া, শিমুলতলী, মোনঘর, সনাতন পাড়া এলাকায় ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এসব এলাকায় দুই বছরে পাহাড় ধসে নিহতরে সংখ্যা ১৩১। কিন্তু এরপরও ভিটেমাটি ছাড়তে নারাজ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীরা।

বর্তমানে জেলার ৩১টি পয়েন্টকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। যেখানে বাস করছে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। ফলে এবারো বর্ষা মৌসুমে প্রাণহানীর শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনি বসতি স্থাপন। চলমান বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে বসবাসের বিকল্প জায়গা না থাকায় নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারছেন না অনেকেই। পাহাড় ধস এড়াতে পানি নিষ্কাশনের বিকল্প পথ তৈরির দাবি এলাকাবাসীর।

বর্তমানে জেলায় ৩ হাজার ৩৭৮টি পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার লোক পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে। যদিও এসব বসবাসকারী মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও ভিটেমাটি ছাড়তে রাজি নয়। বরং পাহাড়কে ঝুঁকিমুক্ত করে বসবাসের উপযোগী করার দাবি তাদের। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে আবারো পাহাড়ধসে প্রাণহানীর শংকা রয়েছে। তবে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার কাজ জেলা প্রশাসন গত এপ্রিল মাস থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানালেন পার্বত্য রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ।

জেলা প্রশাসক জানান, সামনের বর্ষা মৌসুমে যাতে বিগত বছরগুলোর ন্যায় পাহাড় ধসে মাটি চাপায় ব্যাপক প্রাণহানি না ঘটে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’ নেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিল মাস থেকেই জেলার সংশ্লিষ্ট্য সকলকে সাথে একাধিকবার বৈঠক, ওয়ার্কশপ, এলাকায় এলাকায় গিয়ে মাইকিং, সভা, সমাবেশ, সচেতনতামূলক পোষ্টার, ব্যানার, লিফলেট বিতরণ, ঝুকিপূর্ন এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে সেথায় সাইনবোর্ড লাগানোসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদেরকে সচেতন করার কাজ রাঙামাটি জেলা প্রশাসন এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে মন্তব্য করে পাহাড়ের পাদদেশে যেসব স্থান নিরাপদ নয়, তা চিহ্নিত করে সেখানে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে আশ্রয় কেন্দ্র নির্ধারণ এবং পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করার কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ।

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে রাঙামাটি পৌরসভাসহ ১০টি উপজেলায় মোট তিন হাজার ৩৭৮টি পরিবারের ১৫ হাজারেরও বেশি লোক পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে রাঙামাটি পৌর সদরের নয়টি ওয়ার্ডে ৩৪টি স্থানে ৬০৯ পরিবারের প্রায় আড়াই হাজার লোক ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রিজার্ভ বাজারের চম্পানিমার টিলা, চেঙ্গির মুখ, এসপি অফিস সংলগ্ন ঢাল, পুরাতন বাস স্টেশনের মাতৃমঙ্গল এলাকা, কিনারাম পাড়া, স্বর্ণটিলা, রাজমনি পাড়া, পোস্ট অফিস কলোনি, মুসলিম পাড়া, কিনা মোহন ঘোনা, নতুন পাড়া পাহাড়ের ঢাল, শিমুলতলী, রূপনগর এলাকা পাহাড়ের ঢাল, কাঁঠালতলী মসজিদ কলোনি, চম্পকনগর পাহাড়ের ঢাল, আমানতবাগ স্কুলের ঢাল, কলেজ গেইটস্থ কাদেরিয়া মার্কেটের নীচ এলাকাজালালাবাদ কলোনি পাহাড়ের ঢাল। এর বাইরে রাঙামাটি সদর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ৭৫০ পরিবারের তিন হাজার ৪২৪ জন লোক পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিতে আছে।

এদিকে রাঙামাটি শহরের কলেজ গেইট এলাকায় জনৈক ব্যক্তির কাদেরিয়া বিল্ডিংয়ের নীচে বসবাসরত অর্ধশত পরিবার বৃষ্টি নামলেই চরম আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে। বিগত দুই বছর আগে প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময়ে টানা বর্ষণে এই মার্কেটটির নীচের পিলারগুলোর গোড়ার মাটি সম্পূর্ণরূপে সড়ে যায়। বারংবার তাগাদা দেওয়া সত্বেও এই বিল্ডিংটির মালিকপক্ষ সেটিকে মেরামত করেছি। তেরপাল টাঙিয়ে রেখে দিয়েছে। টানা বৃষ্টি শুরু হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে এলাকাটিতে।

উল্লেখ্য, রাঙামাটিতে ২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড় ধসে পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জন নিহত হয়। পরের বছর ২০১৮ সালের ১১ জুন নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসে মৃত্যু হয় ১১ জনের।