ব্রেকিং নিউজ

রাঙামাটিতে অব্যাহত বর্ষণে সম্ভাব্য দূর্যোগ মোকাবেলায় দিনরাত মাঠ চষে ফিরছেন ডিসি মামুন

॥ আলমগীর মানিক ॥

টানা বর্ষণের রেশ ধরে একটি প্রাণও যেন ঝুঁকিতে না পড়ে এই প্রত্যয়ে মাঠ চষে ফিরছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ। অঝোর ধারায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত চষে ফিরছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। রাঙামটি পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে এসেছেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

যেসব ঘর বেশি ঝুুঁকিপূর্ণ সেখান থেকে লোকজন সরিয়ে নিজ হাতে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। আশ্রয়কেন্দ্রে আনা বিপন্ন মানুষদের সোমবার রাতেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একদিন চলার মতো পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।

রাঙামাটিতে শুরু হওয়া কয়েক দিনের টানা অব্যাহত রয়েছে। বর্ষণের রেশ ধরেই সোমবার দুপুরে কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের কলাবাগান এলাকায় শিশুসহ দু’জন নিহত হয়েছে। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ায় পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে প্রশাসন তৎপরতা চালাচ্ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে চলছে মাইকিং। তৈরি রাখা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ায় বেড়েছে পাহাড় ধ্বসের শঙ্কা। রাঙামাটির পাহাড়ে হাজার-হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। ঝুঁকি থাকলেও মুত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করছে তারা। তাই তারা পাহাড়ও ছাড়তে নারাজ। তবে প্রশাসনও আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ঝুঁিকপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক (ডিসি) একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, আমরা সকল ঝুকিঁ মোকাবেলায় প্রস্তুতি সেরে ফেলেছি। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২১টি আশ্রয় কেন্দ্র। রোববার রাত থেকে আমি নিজে সরেজমিনে বের হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছি।

সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বর্গকে একটি তালিকায় বদ্ধ করেছি এবং যেকোন মূহর্তে তাদের কাজে লাগানো হবে।

ডিসি জানান, প্রত্যোক এলাকায় স্থানীয় কাউন্সিলরদের মাধ্যমে স্বেচ্ছা সেবী কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্রগুলো। জেলা প্রশাসন মাইকিং, পোস্টারিং এর মতো সচেতনতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। এছাড়া যান্ত্রিক সহায়তায় সেনাবাহিনী সবকিছু প্রস্তুতি সেরে রেখেছে বলে জানালেন সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা।

পাহাড়ে বসবাসকারী একাধিক মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোন বছর রাঙামাটিতে বড় ধরণের পাহাড় ধ্বস হয়নি ২০১৭ সাল ব্যাতীত। এছাড়া রাঙামাটি পুরো শহর গঠিত হয়েছে পাহাড়কে ঘিরে। কোন জায়গায় সমতল নেই।

তারা দাবি জানিয়ে বলেন, পাহাড়ি অঞ্চল রাঙামাটি। সমতল পাবো কোথায়? তাই পাহাড়ে বসবাস করি। কোন ঘর ভাড়া করে থাকা আমাদের পক্ষ কোনদিন সম্ভব নয়। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে ঘর বেধে বসবাস করি। কারণ ঘর ভাড়া করে থাকার মতো আমাদের সামর্থ্য নেই।

জেলা শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ির এলাকা শিমুলতলীর বাসিন্দা মো. শাহজাহান জানান, দীর্ঘ বছর ধরে এ এলাকায় বসবাস করছি। কোনদিন পাহাড় ধ্বস দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি। ২০১৭ সালে যে পাহাড় ধ্বস হয়েছে তার কথা আমরা কোনদিন ভুলবো না। কতশত মানুষ যে মাটি চাপা পড়েছে তার কোন হিসেব নেই।

ভেদভেদীস্থ পশ্চিম মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল করিম জানান, বর্ষা আসলে আমাদের ভয় বেড়ে যায়। প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকি কখন পাহাড় ধ্বসে আমাদের ঘরকে চাপা দেয়। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও কেন পাহাড়ে বসবাস করছেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান, আমাদের থাকার কোন জায়গা নেই। ঘর ভাড়া করার মতো সামর্থ নেই। পাহাড়ে না থাকলে কোথায় থাকবো?

রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার মো. রফিক গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, আমরা অতীতের সকল দূযোর্গ মোকাবেলায় স্থানীয় জনগণের পাশে ছিলাম, এখনো আছি। পাহাড় ধসের মতো দূর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিমকে তৈরি করে রাখা হয়েছে বলে যোগ করেন তিনি। প্রসঙ্গত: ২০১৭ সালের ১৩জুন রাঙামাটিতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসে মতে ১২০ জন মানুষ মারা যায়। এছাড়া ২০১৮ সালের ১২জুন নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক্ষং ইউনিয়নে ১১জন মানুষ পাহাড় ধ্বসে নিহত হন।