রাঙামাটির ২’শ আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫হাজার আশ্রিত:নিহত-২,সড়কগুলোতে ভারী যান চলাচল সাময়িক বন্ধ!

॥ আলমগীর মানিক ॥

অব্যাহত বর্ষণে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্রমস ব্যাপক ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতি। রাঙামাটিতে বেশ কয়েকটি এলাকায় পাহাড় ধস হয়েছে। বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে জেলার বাঘাইছড়ি, লংগদু, নানিয়াচর ও বরকল উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে দেখা দিয়েছে বন্যা। ইতিমধ্যেই পুরো রাঙামাটি জেলায় প্রায় দুই শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্র খোলেছে জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। জেলার সকল উপজেলাগুলোসহ শহরের অভ্যন্তরে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ ভিটে-মাটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।

গত কয়েকদিনের অব্যাহত বর্ষণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে জান-মালের রক্ষায় জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তাদের একযোগে মাঠে কর্মরত রেখেছেন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ। জেলা প্রশাসনের উদ্বর্তন কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে বৃষ্টি উপেক্ষা করে দূর্যোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেসব এলাকাগুলোতে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে বাসিন্দাদের ঘরে তালা লাগিয়ে তাদেরকে বের করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আনছেন স্বয়ং জেলা প্রশাসক নিজেই। বর্তমানে রাঙামাটির দুইশো আশ্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার আশ্রিতদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ। তিনি জানান, আমাদের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমানে ত্রাণ মজুদ আছে। এছাড়াও জেলার সম্ভাব্য দূর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের সার্বিক সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া আছে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

এদিকে, রাঙামাটির সাথে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সাথে সংযোগ সড়কগুলোকে বারি বর্ষণের কারনে ঝুকিপূর্ন হিসেবে চিহ্নিত করে এসব সড়ক দিয়ে ভারী যান-বাহন চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশনা জারি করেছে রাঙামাটির সড়ক ও জনপথ বিভাগ কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, বিগত ৬ জুলাই থেকে অদ্যাবধি চলমান প্রবল বর্ষনের দরুন রাঙামাটি সড়ক বিভাগের বিভিন্ন সড়ক, বিশেষ করে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি জাতীয় মহাসড়ক, রাঙামাটি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ঘাগড়া-চন্দ্রঘােনা-বাশালহালিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ বর্তমানে ভারী যান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে লোকজন সড়ক মেরামতের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। তবে সড়ক সমূহ মেরামত পূর্বক সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত সড়ক সমূহে ভারী যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, যেকোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে রাঙামাটির সাথে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাঙামাটি সড়ক বিভাগের কাজে ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় বাসিন্দাসহ পরিবহণ সেক্টরের নেতৃবৃন্দ।

এদিকে রাঙামাটির সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান মহসিন রোমান রাঙামাটির সড়ক বিভাগের কচ্ছপগতির কার্যক্রমের সমালোচনা করে জানান, আমাদের রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কসহ তিন পার্বত্য জেলায় যোগাযোগের সড়ক রয়েছে রাঙ্গামাটির সাথে সেই সব সড়ক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার জন্য কারা দায়ী তা খুঁজে বের করা দরকার প্রথমে? যেখানে এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা রয়েছে সেখানে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী রয়েছে রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ির দায়িত্বে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ভূমিধস হওয়ার পরে অদ্যবধি শুধু খুঁটি স্থাপন ছাড়া সড়কের উন্নয়ন এর কি কাজ হয়েছে তাও খতিয়ে দেখা উচিত, ভূমি ধসের পর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দিয়ে ধসে যাওয়া অংশে কাজ করানো হতো তাহলে হয়তো আজ এই ধরণের ঝুঁকির সৃষ্টি হতো না, দেশের স্বার্থে সবাই যদি দুর্নীতি কে বাদ দিয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক স্থায়ীভাবে আগামী আরও 10 /20 বছর কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ শুধু সদিচ্ছা দেশ প্রেম থাকতে হবে এবং দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দিয়ে এসব কাজ করাতে হবে বলে আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি সহ প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না একমাত্র দুর্নীতির কারণে।

এদিকে রাঙামাটি পৌর এলাকায় এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দূর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, পৌর সভার সকল ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করাসহ তাদের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। মেয়র বলেন, বর্তমান বৃষ্টির গতি কিছুটা কমে আসলে পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলেই আমরা পৌর এলাকায় যেসব স্থানগুলোতে সমস্যা হয়েছে, সেগুলোতে কাজ শুরু করা হবে।

এদিকে, টানা ছয়দিনের মত হালকা থেকে মাঝারী বৃষ্টি অব্যাহত আছে। বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়েছে ৮৩ এমএস এল (মীনস সী লেভেল) অবস্থান করছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় প্রতিনিয়ত পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী ও বরকল উপজেলার খালগুলোসহ কাপ্তাই হ্রদের পানি হুহু করে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। অনেকেরই ভিটেমাটি ইতিমধ্যেই পানির তোড়ে ভেসে গেছে।

যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। জেলার লংগদুতে বোট থেকে কাপ্তাই হ্রদে পড়ে পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে মো. রুবেল (২৭) নামে এক বোট চালক মারা গেছেন। বুধবার সন্ধ্যার দিকে এ ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালের দিকে কাপ্তাই হ্রদের কাট্টলি বিল নামক এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মো. রুবেল লংগদু উপজেলার মাইনিমুখ ইউনিয়নের জারুলছড়ি এলাকার বাসিন্দা। লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার সামন্তু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে বুধবার বিকালের দিকে অন্য উপজেলা বরকলের ভুষণছড়া ইউনিয়নের অজ্যেংছড়ি এলাকায় পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে বিজুরাম চাকমা (৬৭) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। স্থানীয়রা জানান, অবিরাম বর্ষণে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামায় ছড়ার পাশে খুঁটিতে বাাঁধা গরু বাাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন বিজুরাম চাকমা। তখন ছড়ার পানির তোড়ে ভেসে যান। ঘন্টা দুয়েক পর ভাটি এলাকার পাহাড়ি ছড়ায় থাকা পাথরে আটকা অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করেন এলাকাবাসী।

গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বাঘাইছড়ির ৬টি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষ। বারিবিন্দু ঘাটের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে ২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পাহাড়ী ঢলে কাচালং নদীর পানি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় আশংকা রয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আহসান হাবিব জিতু। দ্রুতগতিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, বৃষ্টি না কমলে আরও অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

তিনি জানান, তুলাবান, বারিবিন্দুঘাট, মধ্যম ডেবার পাড়া, মুসলিম ব্লক, পুরান মারিশ্যা, মাষ্টার পাড়া বটতলী এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। নদীতে স্রোতের কারণে ত্রাণ এখনও পৌঁছেনি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা নিজ নিজ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবারের ব্যবস্থা করছেন। পৌর এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বাজার থেকে খাবার কিনে সরবরাহ করা হচ্ছে। এলাকাগুলোতে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে, পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের পুর্নবাসনে এখনো হয়নি কোন স্থায়ী ব্যবস্থা। বাস্তবায়ন হয়নি এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটির দেয়া বিভিন্ন সুপারিশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত পাহাড় ধসে প্রাণহানি ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হলেও স্থায়ী কোনো আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়নি। দুর্ঘটনা মোকাবেলার সব উদ্যোগ সাময়িক উচ্ছেদ আর সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ। বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ি জনপদে ছড়িয়ে পড়ে পাহাড় ধসের আতঙ্ক।

২০১৭ সালে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে প্রাণ হারান ১২০ জন। পরের বছর মারা যান ১১ জন। এ বছর মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের পুর্নবাসনে প্রশাসনের কাছে সুপারিশও করে। কিন্তু পুর্নবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হয় না। প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি দেখা দিলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি কার্যালয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। এসব অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণকারীদের যেমন বিভিন্ন অসুবিধায় পড়তে হয় তেমনি ব্যাহত হয় শিক্ষা কার্যক্রম।