বন্ধ হোক এই গণপিটুনির বিভৎসতা; গুজব রটনাকারী নিপাত যাক

॥ আনোয়ার আল হক – সম্পাদকীয় ॥

‘দরবেশ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ পবিত্র হলেও আমাদের দেশে এই শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাঙ্গার্থক অর্থেই ব্যবহার হয়। এর অনেক উদাহরণ আছে, তবে আমি সেদিকে যাচ্ছি না, একটি ব্যবহার হলোঃ কোনো সহজ সরল হুজুর টাইপের মানুষকে লোকে ব্যঙ্গ করে দরবেশ বলে। তো এ ধরণের এক দরবেশ মার্কা হুজুর ক্লাসে ছাত্র তালিম দিচ্ছিলেন। এমন সময় তার এক বন্ধু সহজ সরল বন্ধুটিকে নিয়ে মজা করার জন্য আচমকা খবর দিলো- ‘হুজুর আপনি এখানে ক্লাস নিচ্ছেন, আর ওইদিকে আপনার বউ তালাক হয়ে গেছে’। এ কথা শুনেই হুজুর বাড়ির দিকে দৌড় দিলেন, তিনি আবার তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন কিনা তাই। দৌড় দেওয়ার আগে হুজুর চিন্তাও করলেন না তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার একমাত্র অধিকার তারই আছে, তিনি না জানলে স্ত্রী তালাক হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে এমন অবিবেচনা প্রসূত দৌড় হর হামেশাই ঘটে। তাই কবে কে যেন ‘হুজুগে বাঙালি’ শব্দটি চালু করেছিলেন; আর এই শব্দের প্রতি সুবিচার করে বাঙালি হুজুগে মাতছেন প্রতিনিয়ত; আদিকাল ধরেই।

এই হুজুগে বাঙাল নাগরিক সমাজ গত কিছুদিন ধরে ‘ছেলে ধরা’ গুজবের সাথে এতোটাই মেতে গেছেন যে, এখন এটা গোটা জাতির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে গুজবটি গোটা জাতিকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে দুঃখের বিষয় হলো কোথাও এর সামান্যতম সত্যতার উদাহরণ কেউ দেখাতে পারেনি। অথচ শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রামীণ-শহুরে, তরুণ-বুড়া, সকল পর্যায়ের মানুষ এই গড্ডালিকায় তাল মেলাতে কার্পণ্য করছেন না। সমাজে ভালো মানুষ সেজে ঘুরে বেড়ানো অনেক আতেল আবার ফেসবুকে ম্যাসেজ দিয়ে গুজবের স্বপক্ষে একশ’একটা যুক্তি এবং উদাহরণ বিতরণ করছেন বিনা পয়সায়।

এই গুজব এবং হুজুগের রেশ ধরেই গত দু’সপ্তাহে ৯টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। তার মধ্যে তিনজন আবার নারী এবং তিনজনই গণপিটুনীর শিকার হয়েছেন খোদ রাজধানী শহরে। সেখানে বেশিরভাগ মানুষ সচেতন নাগরিক হওয়ার কথা। গণপিটুনিতে ৯ জন নিহত এবং ৪০জনের অধিক মানুষ আহত হবার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর আমি সকলের চোখে-মুখে আফসোস আর সহানুভূতি দেখতে পেয়েছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঘটনা কিন্তু থামছে না। পুলিশ বেশ কিছু মানুষকে আটক করেছে, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আটক হচ্ছে। আবার ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। মঙ্গলবার রাতেও চট্টগ্রাম শহরে এক নারী গণপিটুনীর শিকার হয়েছেন। তবে দৌড়ে একটি ক্লিনিকে আশ্রয় নেওয়ার পর তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন।

ছেলে ধরা সন্দেহে পাহাড়েও কয়েকজনকে পাকড়াও করেছে জনগণ। তবে তারা অল্পতেই পিটুনির হাত থেকে বেঁচে গেছেন। সবাই ছেলেধরা সন্দেহে গোয়েন্দাগিরি করে প্রতিদিন কাউকে না কাউকে আবিস্কার করছেন ঠিকই। কেউ কিন্তু কোনো একটি শিশুকে ছেলে ধরা বা মেয়ে ধরার কবল থেকে সরেজমিনে ধরতে পারেননি। বা এমন কোনো খবর প্রমাণিত হয়নি যে অমুক গ্রামের অমুকের ছেলে বা মেয়েকে তথাকথিত ‘ছেলে ধরা’ নিয়ে গেছে। অন্তত এই গুজব ছড়ানোর পর এমন উদাহরণ পাওয়া যায়নি। প্রতিটি সমাজেই বা প্রতিটি দেশেই ছেলে, মেয়ে, বুড়ো- নানা বয়সী মানুষ বিভিন্ন সময় নিখোঁজ হয়েই থাকে। এটা নানা কারণে হয়, সেটা সমাজের আর দশটি ঘটনার মতো একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ছেলে ধরারা যদি গল্পের মতো বস্তা নিয়ে সত্যিই ঘোরাঘোরি করতো তবে এতদিনে কেউ না কেউ অবশ্যই ধরা পড়তো। এই যুক্তি বিবেচনা করে দেখছেনা বেশির ভাগ মানুষ।

‘উই নীড মোর হেড’ শব্দটাকে পুঁজি করে যারা এই আতঙ্ক ছড়ানোর কাজে না বুঝেই ইন্ধন দিচ্ছেন বা ফেসবুকে ঘি ঢালছেন সকলেই কিন্তু আধুনিক এবং প্রাগ্রসর সমাজের অংশ। এই শিক্ষিত সমাজে এখনও এমন আজগুবি কুসংস্কার বিশ্বাস করার মতো মানুষের অভাব নেই এ কথা ভাবতেও নিজের প্রতি ঘেন্না লাগছে, আমরা সেই সমাজেরই অংশ। দেও, দৈত্ত, কল্লা, মানুষ খাওয়ার রূপ কথার গল্পটা পদ্মা সেতুর ঘাড়ে এত সহজে চাপিয়ে দেওয়া যাবে তা হয়তো এই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনাকারী বা এই গুজবের স্রষ্টা নিজেও উপলব্ধি করতে পারেননি।

ষড়যন্ত্র বললাম এই কারণে যে, ছেলে ধরা পাহাড়ে হিট না করায় এখানে রক্তচোষা বের করা হয়েছে। রক্ত চোষাই বলেন আর রক্ত সংগ্রহকারীই বলেন। এই গুজবটি পাহাড়ে এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে যে, একদিনের ভিতরে তা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিছু মানুষের বুদ্ধিমত্তায় শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও। বিদ্যালয়ের শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের মাঝে শঙ্কা ছড়ানোর কাজটা চালিয়েই যাচ্ছে কেউ না কেউ।

পার্বত্য তিন জেলা এমনিতেই গুজব প্রবণ এলাকা। গুজবে ভর করে বিগত দিনে এখানে অনেক অনাকাক্সক্ষীত ঘটনা ঘটিয়ে অপুরনীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে জাতি। তাই এই এলাকার মানুষের বিশেষ সতর্কতা অত্যন্ত জরুরী। এসব গুজব আটকে দেওয়ার একটাই পন্থা, আইনের প্রতি আস্থা এবং শ্রদ্ধাশীল থাকা। আর কেউ কোনো আজগুবি খবর বলতে চাইলে তাকে সাথে সাথে চুপ করিয়ে দেওয়া। প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু বিশ্বাস করা যে অযৌক্তিক, এই কথাটি প্রত্যেকে প্রত্যেককে মনে করিয়ে দেওয়া। “চিলে কান নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে দৌড় দেওয়া” বোকার কাতারে নিজের নাম লেখাতে না চাইলে সচেতন হওয়া। সন্দেহভাজন কোনো কিছু নজরে আসার সাথে সাথে তাই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসনের গোচরে আনা। পুলিশ আশেপাশেই থাকে, কোথাও পুলিশ না থাকলে সেখানে জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক বা গ্রহণযোগ্য কেউ না কেউ অবশ্যই থাকবেন। বিষয়টি দ্রুত তাকে জানাতে হবে। অথবা নিজের হাতে থাকা সেলফোন থেকে ‘৯৯৯’ বা ‘৩৩৩’ ডায়াল করে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে কেউ কোনো সন্দেহজনক ম্যাসেজ দিলে তাকে ব্লক করে দেওয়া। আমি মনে করি এ ধরণের গুজব ছড়ানোর ইন্ধনদাতা ফেইসবুকার কারো নজরে এলে সাথে সাথে তার বিষয়ে প্রকাশে সবাইকে সতর্ক করে দিলেও ক্ষতি নেই। তবে অবশ্যই তার প্রমাণ নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে হবে। ফেইসবুকে আমরা সবাই একযোগে সচেতন হয়ে ইন্ধনদাতাদের সনাক্ত করা শুরু করলে তারা ভয় পেয়ে যাবে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে এমন আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করেও আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো বোকাদের খাতায় নাম লিখানোর আগে সাতবার ভাবুন, এমন অবিবেচনা প্রসূত কাজ সারাজীবন আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ গণপিটুনির শিকার হয়ে করুণ মৃত্যু বরণ করেছে। প্রতি বছরই এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেই চলেছে, এর আসল কারণ অসচেতনতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকার প্রবণতা। এসব ঘটনায় আমাদের সমাজের যে বা যারাই অংশ গ্রহণ করেছে তারা সকলেই কিন্তু খুনী। মনে রাখতে হবে একজন মানুষ একবার খুনের সাথে জড়িয়ে গেলে তার মানসিকতা যে কোনো সময় বিকৃত হয়ে পড়তে পারে। তাই আপনার আশেপাশের কেউ যাতে এমন কাজে জড়িত হতে না পারে তা দেখে রাখা আপনার আমার সকলের দায়িত্ব। পরিশেষে এটাই বলবো গণপিটুনীর মতো বিভৎসতা এবং পৈশাচিক উল্লাস বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে সচেতনভাবে কঠোর হতে হবে। আর যেন একটি মানুষও হত্যা বা নির্যাতনের শিকার না হয়। তিনি অপরাধী হলেও না। অপরাধী হলে তাকে আইনের হাতে তুলে দিন। নিজে বিচারক হতে গেলে নিরপরাধ ব্যক্তিও আপনার আক্রমণের শিকার হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় আপনার আমার সবার ভাই বন্ধু আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। এমন প্রবণতা চলতে দিলে সমাজ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। আর তখন আপনার প্রতি কারো আক্রোশ থাকলে সে ‘মব’ এর সহযোগীতা নিতে চেষ্টা করবে। ‘গুজবে কান দিবেন না’ শব্দটি কোটি কোটিবার উচ্চারিত হবার পরও কান শরীর পুরোটাই দিচ্ছি। তাই এখন বলতে হবে গুজব রটনাকারীকে প্রশ্রয় দিবেন না। গুজব দেখলেই চাপা দিন, একে খবর হতে দিবেন না।