চাঁদে অবতরণকারী প্রথম মানবের জন্মদিন আজ!

॥ ইকবাল হোসেন ॥

This is a small step for man, but a giant leap for mankind

অর্থাৎ- “এটি একজন মানুষের জন্য ক্ষুদ্র একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল অগ্রযাত্রা”

পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ’র মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টিকারী নীল আর্মস্ট্রং” চাঁদ’র মাটিতে পা রাখার সময় উপরোক্ত মন্তব্যটি করেন। নীল আর্মস্ট্রং ১৯৩০ সার’র ৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’র ওহাইও তে জন্মগ্রহন করেন। তিনি স্টেফান কনিগ আর্মস্ট্রং ও ভায়োলা লুইসা দম্পতির প্রথম সন্তান। নীল আর্মস্ট্রং’র আরো দুইজন সহোদর ছিলো। বংশানুক্রমে তিনি ছিলেন স্কটিশ ও জার্মান। নীল আর্মস্ট্রং ছেলেবেলা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানে আমেরিকা’র ২০ টি ভিন্ন ভিন্ন শহরে থাকার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। তার বয়স যখন মাত্র দুই বছর তখন তিনি তার পিতার সাথে ক্লীভল্যান্ড এয়ার রেস দেখতে গিয়েছিলেন এবং তিনি ১৯৩৬ সাল’র ২০ জুলাই প্রথম বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

শিক্ষা জীবন- নীল আর্মস্ট্রং প্রথমে পড়াশোনা করেন পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরে ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোনিয়া’তে। প্রথম কর্মজীবন- নীল আর্মস্ট্রং নভোচারী হওয়ার পূর্বে কর্মজীবনের শুরুতে মার্কিন নৌবাহিনীর বৈমানিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তিনি কোরীয় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। এরপর তিনি ড্রাইভেন ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারের পরীক্ষামূলক বিমান চালক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষামূলক বিমান নিয়ে ৯০০ বারের অধিক উড্ডয়ন করেন।
ব্যক্তিগত জীবন- নীল আর্মস্ট্রং তার ব্যক্তিগত জীবনে দুইবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তার প্রথম স্ত্রী জনেত শেরোন কে তিনি ১৯৫৬ সালে বিয়ে করেন এবং ১৯৯৪ সালে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যারোল হেলড নাইট এর সঙ্গে ১৯৯৪ সালে বিয়ে হয় এবং ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তারা একত্রে ছিলেন। নীল আর্মস্ট্রং মোট ৩ সন্তানের জনক ছিলেন তারা হলো মার্ক আর্মস্ট্রং, কারেন আর্মস্ট্রং এবং এরিক আর্মস্ট্রং।

মহাকাশ মিশন ও চন্দ্র অভিযান- নীল আর্মস্ট্রং জেমিনি-৮ নভোযানের চালক হিসেবে ১৯৬৬ সালে তার প্রথম মহাকাশ মিশন করেন। এ অভিযানে তিনি এবং ডেভিট স্কট মহাকাশে প্রথমবারের মত দুইটি ভিন্ন নভোযান কে একত্রে যুক্ত করেন।
নীল আর্মস্ট্রং’র দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ মহাকাশ মিশনে তিনি ‘এপোলো-১১ মিশন’র’ মিশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রথম মানুষ হিসেবে চাদে পা রাখেন। ‘এপোলো-১১’ মিশনে নীল আর্মস্ট্রং ছিলেন মিশন কমান্ডার এবং তার সহকর্মী আরো দুই মহাকাশচারীর মধ্যে মাইকেল কলিন্স ছিলেন কমান্ড মডিউল চালক ও বাজ অল্ড্রিন ছিলেন চাঁদে অবতরণকারী যান লুনার মডিউল’র চালক। তারা চন্দ্র বিজয়ের উদ্দেশ্য ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই আমেরিকার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটার্ন ভি রকেটে করে যাত্রা শুরু করেন। ‘এপোলো-১১’ নভোযানটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিলো তা হলো- কমান্ড মডিউল (যার সাংকেতিক নাম ছিলো কলাম্বিয়া), সার্ভিস মডিউল ও লুনার মডিউল (যার সাংকেতিক নাম ছিলো ঈগল)। যাত্রা শুরুর ৪ দিনের মাথায় তারা চাদের কক্ষপথে প্রবেশ করেন এবং কমান্ড মডিউল কলাম্বিয়া থেকে লুনার মডিউল ঈগল আলাদা হয়ে দুইজন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অল্ড্রিন কে নিয়ে চাঁদের পানে ছুটে যেতে থাকে। এদিকে কমান্ড মডিউল’র চালক মাইকেল কলিন্স এর কাজ ছিলো তার নভোযান নিয়ে চাঁদের চারপাশে ঘুরতে থাকা আর বাকি দুই নভোচারীর ফেরত আসার অপেক্ষা করা। কিন্তু তার উপর এ নির্দেশনা ছিলো যে, যদি চাঁদে অবতরণকারী যান ঈগল দূর্ঘটনাগ্রস্থ হয় তবে তাকে বাকি দুই নভোচারীকে মৃত ঘোষনা করে একাই পৃথিবীতে ফেরত আসতে হবে। এদিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেনন্ট রিচার্ড নিক্সন’র জন্য ওই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটি বক্তব্য লিখে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু ১৯৬৬ সালের ২১ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে পা রাখেন এবং তার ২০ মিনটি পর লুনার মডিউল ঈগল’র চালক বাজ অল্ড্রিন চাঁদে নামেন এবং ২৪ জুলাই তারা পৃথিবীতে ফেরত আসেন।

নীল আর্মস্ট্রং’র ঢাকায় আগমন- ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর বিকেলে তৎকালীন ঢাকা এয়ারপোর্টে (বর্তমানে তেজগাঁও পুরাতন বিমান বন্দর) এ অবতরণ করে চন্দ্র বিজয়ীদের বহনকারী বিমান। নভোচারীদের সঙ্গে ছিলেন তাদের স্ত্রী। বিমানবন্দরে ঢাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’র দূতাবাস’র কর্মকর্তারা আর এক ঝাঁক সাংবাকি সহ প্রচুর সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলো। তুমুল করতালি ও মুহুমুহু আন্দ ধ্বনির মধ্যে তাদের মোটর শোভাযাত্রা করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়ে যাওয়া হয়।
নীল আর্মস্ট্রং’র চন্দ্র বিজয় পরবর্তী কর্মজীবন- নীল আর্মস্ট্রং ‘এপোলো-১১’ মিশনের পর আর কোন মহাকাশ মিশনে যাননি। তিনি ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অফ সিনসিনাটি তে ঊড্ডয়র প্রকৌশল’র অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মৃত্যু- ৮২ বছর বয়সে ২০১২ সালে নীল আর্মস্ট্রং বাইপাস সার্জারি করান এবং এর কিছুদিন পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’র ওহাইও’র সিনসিনাটি তে ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আজ চাঁদের মাটিতে পা রাখা প্রথম মানুষ নীল আর্মস্ট্রং’র ৮৯তম জন্মবার্ষিকী।

নীল আর্মস্ট্রং ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট ওহাইও’র সিনসিনাটি তে মৃত্যু বরণ করেন।