বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষককে মারধরের প্রতিবাদে মানববন্ধন

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

রাঙামাটিতে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে বখাটে কর্তৃক শিক্ষককে মারধর ও প্রাণনাশ চেষ্টার প্রতিবাদে এবং দোষীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের দাবিতে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টায় রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সামনে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে এলাকাবাসী, ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক, শিক্ষকবৃন্দ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ গ্রহণ করে।

রাঙামাটি মডেল কেজি স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি শিক্ষক আতাউর রহমানকে গত মঙ্গলবার ক্লাস চলাকালীন সময় শ্রেণি কক্ষে ঢুকে মারধর করে মারত্মক জখম করে একদল বখাটে। এসময় তার চোখসহ সারা শরীর জখম হয় এবং শিক্ষকের কাপড় চোপড় ছিঁড়ে লাঞ্ছিত করা হয়। আহত শিক্ষক এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। জীবন ও শাহ পরাণের নেতৃত্বে হামলাকারীরা এখনও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে এবং উল্টা শিক্ষকদের বিরুদ্ধেই মামলা করে তাদের হয়রানী করছে। মানব বন্ধন থেকে অবিলম্বে আতাউর স্যারের উপর হামলাকারীদের শাস্তি দাবি করা হয়।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) মডেল কেজি স্কুলের অস্টম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাসে পড়া না পারায় ক্লাসের ৭/৮জন ছাত্রছাত্রীকে ইংরেজি শিক্ষক সামান্য শাসন করে এবং পরদিন এই পড়া না পারলে তার অভিভাবকদের জানানো হবে বলে শাসিয়ে দেয়। সব শিক্ষার্থীকেই সমানভাবে শাসন করা হলেও ওই ক্লাসের এক ছাত্রী এতে ভয় পেয়ে একফাঁকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায় এবং তার ভাইকে উল্টা-পাল্টা বুঝিয়ে ডেকে নিয়ে আসে।

জানা গেছে, ওই ছাত্রী প্রায়ই ক্লাস ফাঁকি দেয় এবং শ্রেণিপাঠে সাড়া দিতে পারে না। তাই এর আগেও তার বাবা মাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এই ভয়েই সে ভাইকে ডেকে আনে। ছাত্রীটির বখাটে ভাইটি এসে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই শিক্ষককে বেদম মারধর করে এবং তাকে মারাত্মকভাবে জখম ও জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে সবাই হতচকিয়ে গেলেও শিক্ষক মার খাচ্ছে দেখে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা ওই বখাটে যুবকটিকে আটকিয়ে ফেলে। ইতোমধ্যে বিষয়টি বিদ্যালয় অফিসে জানাজানি হলে বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তখনই সবাই জানতে পারে এটি একটি ছাত্রীর ভাই এবং সে দলবল নিয়েই আক্রমণ করতে এসেছে। খবর পেয়ে তার মা বাবাও সেখানে উপস্থিত হয়।

বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য বসলে আলাপ আলোচনায় ছাত্রীর মা জানতে পারে ওই ছাত্রী ইতোপূর্বেও এমন কিছু অনাকাঙ্খীত কাজ করেছে যে, এক পর্যায়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বিদ্যালয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। পরে ছাত্রীটি অনেক অনুনয় বিনয়ে শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ায় তার কাছ থেকে মোছলেকা নিয়ে তাকে শেষ সুযোগ দেওয়া হয়। ছাত্রীর মা তারই হাতের লেখা মোছলেকার কাগজটি দেখে এবং তার আগে ঘটনা জানতে পেরে কন্যার উপর ক্ষীপ্ত হয়ে উঠেন এবং কোনো কিছু না ভেবে সবার সামনেই মেয়েকে থাপ্পড় মারেন। সকলের সামনে মায়ের এমন আচরনে ছাত্রীটি দুঃখ পেয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় এবং বারান্দা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে।

মা বাবা নিজ মেয়ের দোষ বুঝতে পেরে কোনো উচ্চ-বাচ্য না করে তার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে চলে যান। তারা আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় ছাত্রীর চিকিৎসার জন্য বিদ্যালয় থেকে অর্থ সহায়তাও করা হয়। তারা প্রথম দু’দিন নিজেরা লজ্জিত ভাবেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখেন। কিন্তু ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের সাথে জড়িত কারো কারো সাথে ব্যক্তিগত আক্রোশ থাকা একটি পক্ষ বিষয়টি জানতে পেরে ছাত্রীর বাবা মাকে ফুসলিয়ে অনেক পরে থানায় সাজানো মামলা করান। তারাই আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করছেন। এমনকি বিভিন্ন ফেক আইডি থেকে মিথ্যা খবর রটনার মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন।

বিদ্যালয়ের সামনের আসবাবপত্র ব্যবসায়ী ইকবাল জানান, এখন বিষয়টি নিয়ে যেভাবে বাড়াবাড়ি হচ্ছে আমরা ভাবতেও পারিনি বিষয়টা এমন হবে। ঘটনার দিন একজন ছাত্রী লাফ দিয়ে পড়ার পর আমরা ঘটনা জানতে পারি এবং ছাত্রীর মা বাবা আমাদেরকে জানান, তারা ঘটনার জন্য লজ্জিত। আমরা যাতে বিষয়টি লোক জানাজানি হতে না দেই।

ওই এলাকার মুদি দোকানদার খলিলুর রহমান বলেন, ওই শিক্ষক খুবই অমায়িক পক্ষান্তরে যেই ছেলেটি তাকে মারতে এসেছিল, সে এলাকায় একজন বখাটে তরুণ হিসেবে পরিচিত। তাদের পরিবারে কেউ শিক্ষিত নেই। তারা বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কথা নয়। এখানে একটি তৃতীয় পক্ষ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।

বিদ্যালয়ের আয়া আমেনা বেগম জানান, ফেসবুকে এবং দু একটি অনলাইনে ঘটনাটি যেভাবে মিথ্যার জালে জড়িয়ে প্রচার করা হচ্ছে। ঘটনা সম্পূর্ণ এর বিপরীত। বরং একজন ভালো স্যারকে মারধরের জন্য ওই যুবকের বিচার হওয়া দরকার।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান জিল্লুর রহমান জানান, বিষয়টিকে এখন যে রং দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে তা সর্বৈভ মিথ্যা। তারপরও আমরা ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি। কারণ এই এলাকার দরিদ্র মানুষের পড়াশুনা চালিয়ে নেবার মতো ভালো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। আমরা চাই এর প্রভাব যেন অন্য শিক্ষার্থীদের উপর না পড়ে। যারা বাড়াবাড়ি করছে তারা বুঝতে পারছে না যে বিষয়টি কোমলমতি শিশুদের মনে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সব শিক্ষার্থীই তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পবিত্র স্থান বলে মনে করে এবং ভালোবাসে। তাদের চোখের সামনে ঘটনা একরকম মানুষ ছড়াচ্ছে অন্যভাবে এতে তাদের মনে কতটা নেতিবাচক ধারণার জন্ম নিচ্ছে এই মানুষগুলো তা বুঝছে না। তাদের সন্তান হয় এই বিদ্যালয়ে নেই কিন্তু এতে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীরা তো এ দেশেরই ভবিষ্যৎ কারো সন্তান বা কারো ভাই।

ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক রুহুল আমিন বলেন, আমার ভাবতেও খারাপ লাগছে দু’একজন সাংবাদিকও বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে নিজের আক্রোশ মেটাতে চাইছে। অথচ ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা চিন্তিত। তিনি বলেন, এই বিদ্যালয়ে কত ছাত্রছাত্রী বিনা বেতনে এবং অর্ধেক বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে সে বিষয়ে খোঁজ নিলে আমি নিশ্চিত এখন যারা এমন আচরন করছে তারা নিজেরাই লজ্জা পাবে।