বান্দরবানে ৩ মাসে ৬ রাজনৈতিক খুনঃ মুখোমুখি অবস্থানে জেএসএস-আওয়ামীলীগ!

॥ নুরুল কবির – বান্দরবান ॥

বান্দরবানে হত্যা ও অপহরন আতঙ্কে দিনের পর দিন ঘর ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছে বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকার আওয়ামীলীগ নেতারা। এমনকি অনেক গ্রাম এখন রাতের বেলা পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। গত তিন মাসে ৩ জন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা হত্যার পর থেকে তাদের মধ্যে এ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অপর দিকে মামলার ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে পাহাড়ের আঞ্চালিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি(জেএসএস) নেতারা। আওয়ামীলীগ নেতা হত্যায় একের পর এক জেএসএস নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করে মামলা দেয়ায় জেলা শহর ও উপজেলার নেতা কর্মীরা এখন এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছে।

সম্প্রতি রোয়াংছড়ি উপজেলার আওয়ামীগ নেতা মং মং থোয়াই হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত ১৫ জেএসএস সন্ত্রাসীকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগে গত ২২ মে পৌর আওয়ামীলীগ নেতা চথোয়াই মং হত্যা মামলায় জনসংহতি সমিতি জেএসএস এর ১৫ নেতাসহ অজ্ঞাত ৭০ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলায় জেএসএস এর কেন্দ্রীয় নেতা ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং, জেএসএস বান্দরবান জেলার সাধারন সম্পাদক সাবেক রোয়াংছড়ির উপজেলার চেয়ারম্যান ক্য বা মং সহ বেশ কয়েকজন কারাগারে রয়েছে। তাই গ্রেফতারের ভয়ে দলটির নেতাকর্মীরা এখন গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আর এ ঘটনার পর থেকে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে জেএসএস ও আওয়ামীলীগ মুখোমুখি অবস্থানে দাড়িয়েছে।

জানা গেছে ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি হওয়ার পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সাথে জনসংহতি সমিতি জেএসএস এর সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। বিভিন্ন সময় জাতীয় নির্বাচনে আ.লীগ প্রার্থীকে সমর্থনও দিয়েছে জেএসএস। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের দাবীতে আন্দোলন সংগ্রামের কারনে ধীরে ধীরে সরকারী দল আওয়ামীলীগের সাথে জেএসএস এর সম্পর্কে দুরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে।

২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীগ থেকে বহিস্কৃত নেতা প্রসন্ন কান্তি তঞ্চগ্যা নির্বাচনে প্রার্থী হলে জেএসএস তাকে সমর্থন দেয়। এর পর আ.লীগের সাথে জেএসএস এর সম্পর্কে প্রকাশ্য দুরত্বের সৃষ্টি হয়।

২০১৬ সালে স্থানীয় আ.লীগ নেতা মংপ্রু অপহরনের ঘটনায় জেএসএসকে দায়ী করে শীর্ষ নেতাদের আসামী করে মামলা দায়ের করায় দূরত্ব থেকে দ্বন্দে রূপ নেয় আ.লীগ জেএসএস এর সম্পর্ক। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে জেএসএস এর দখলকৃত বিভিন্ন উপজেলা চেয়ারম্যানের আসন ভোটের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ নেতারা নিয়ে নিলে দ্বন্দে চরম পর্যায়ে পৌছে। ধীরে ধীরে অশান্ত হয়ে উঠতে থাকে শান্তি সম্প্রীতির জন্য খ্যাত পার্বত্য জেলা বান্দরবান। শুরু হয় খুন পাল্টা খুন। গত ৩ মাসে খুন হয়েছে ৬ জন। এর মধ্যে ৩ জন জেএসএস ও ৩ জন আওয়ামীলীগ নেতা। অপহরন হয়েছে ২ জন।

আওয়ামীলীগ নেতা হত্যায় জেএসএস কে দায়ী করলেও অভিযোগ অস্বীকার করে দলটির নেতারা। অন্যদিকে জেএসএস কর্মীদের হত্যায় মগ লিবারেশন পার্টি নামে একটি সংগঠনকে দায়ী করে জনসংহতি সমিতি জেএসএস। আর এ দলটির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেএসএস’র এক নেতা বলেন চুক্তি বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চুক্তি বিরোধী একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের কর্মীদের হত্যা করছে মগ বাহিনীর সদস্যরা। আর এ মগ বাহিনীকে মদদ দিচ্ছে সরকারী দলের জেষ্ঠ্য নেতা।

তিনি আরো বলেন মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের একটি বিচ্ছন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপ বান্দরবান জেলায় ঢুকে পড়েছে। তাদের সাথে বিপদগামী কিছু মার্মা সম্প্রদায়ের যুবক যোগ দিয়েছে আর এদেরকে এখানে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছে সরকারী দলের নেতারা এবং আওয়ামীলীগ নেতা হত্যার অভিযোগে তাদের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে যাতে চুক্তির আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। বর্তমানে আমাদের সব নেতাকর্মী ঘরবাড়ী ছেড়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে গ্রেফতারের ভয়ে।

অপর দিকে আওয়ামীলীগ সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর বলেন সরকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক, ইতোমধ্যে চুক্তির বেশীরভাগ ধারা বাস্তবায় হয়েছে কিন্তু সরকারের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে শান্তির জেলা বান্দরবানকে অশান্ত করতে জেএসএস এর সন্ত্রাসীরা একের পর এক আওয়ামীলীগ নেতাকে হত্যা, অপহরন ও চাঁদাবাজী চালিয়ে যাচ্ছে। তারা আওয়ামীলীগ নেতাদের একটি হিট লিস্ট তৈরী করেছে এবং সে অনুযায়ী হত্যা করছে। হত্যার ভয়ে আওয়ামীলীগ নেতারা নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে বাসা ভাড়া করে বসবাস করছে। তারা সবাই অমানবিক জীবন যাপন করছে।

এদিকে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকান্ডগুলি ঘটাচ্ছে বলে দাবী আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর। বান্দরবান পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার বলেছেন, সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এ হত্যাকান্ডগুলো ঘটাচ্ছে। আমরা আমাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছি। দূর্গম অঞ্চল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না হওয়ার কারনে আমাদের একটু সময় লাগছে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতেই আসামীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। আওয়ামীলীগ নেতাদের হুমকি বা তালিকার কোন খবর আমাদেরকে কেউ দেয়নি। তবে আমরা সার্বিকভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি। বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছি এবং কারা এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।

উল্লেখ্য, গত মে মাসে আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে বান্দরবানের রাজবিলা ইউনিয়নের তাইংখালী বাজারে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের হামলায় পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সহযোগী সংগঠন যুব সমিতির সদস্য বিনয় তঞ্চঙ্গ্যা (৩৫) কে গুলি করে হত্যা আবার ঐদিন রাতে রাবার বাগানের শৈলতন পাড়া থেকে পুরাধন তঞ্চঙ্গ্যা (৩২) নামে যুব সমিতির আরেক কর্মীকে অপহরণ করা হয়। পরের দিন জেএসএস কর্মী পুত্রকে খুঁজে না পেয়ে পিতা জয়মনি তঞ্চঙ্গ্যাকে (৫২) গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। একদিন পর আওয়ামীলীগের কর্মী ক্যচিং থোয়াই মারমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ২৫ মে বান্দরবান পৌর শাখার আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি চথোয়অই মং মারমাকে অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরপর ২৫ জুন রোয়াংছড়ি উপজেলায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কর্মী অংথুই চিং মারমাকে (৩৮) গুলি করে হত্যা করে অস্ত্রধারীরা।