রাঙামাটির ছাত্র রাজনীতির আলোচনায় তুঙ্গে থাকা কে এই দীপংকর!

॥ জটায়ু ॥

চলতি বছরের গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের কাউন্সিলে সভাপতির দৌড়ে নাম শোনা যাচ্ছিল বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক দীপংকর দে, যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক কলেজ ছাত্রলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান, বিলুপ্ত কমিটির সহসভাপতি মইনুদ্দিন ইমন এবং সহ-সভাপতি শরীফ হোসেন মুন্নার। কিন্তু এতসব রথী মহারথীর মধ্যে যে প্রার্থী সবচেয়ে এগিয়ে ছিল তিনি হচ্ছেন বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক দীপংকর দে। কাউন্সিল শুরুর আগ থেকেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই ছাত্রনেতা আলোচিত হয়ে আসছেন বিগত বেশ কয়েক মাস ধরেই। তারই ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনেও।

রাজনীতির দুর্বোধ্য মারপ্যাঁচে ২৭ জুলাই দুপুর নাগাদ মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির পূর্বেই আগেকার কমিটি বিলুপ্ত হলেও নতুন কমিটি গঠিত হয়নি ঠিকই! কিন্তু এর মধ্যেই টক অফ দা টাউনে পরিণত হন দীপংকর। কিন্তু কেনইবা তাকে নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা? জেলার এত এত নেতার মাঝে কেনইবা উঠতি বয়সী ছাত্রনেতা দীপংকরকে নিয়েই দলের ভিতরে ও বাইরে একটি চক্রের এত মাথাব্যাথা? এই প্রশ্নদ্বয়ের সমাধানেই আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।

দীপংকর সম্পর্কে জানতে দলের বেশকিছু নেতাকর্মীর সাথে কথা হলে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সম্পুর্ন নাম দীপংকর দে রিখন রাজনীতিতে পা রাখেন ১৬ বছর বয়সে ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে। খুব অল্প সময়ের জন্য ছাত্রদলের সাথে রাজনীতি করা দীপংকর বুঝতে পারে এটা তার সঠিক জায়গা নয়, তার আদর্শ তাকে অন্য আরেকটি দলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বারবার। অতঃপর ২০১৩ সালের মাঝপ্রান্তে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ২৯৯নং আসনের এমপি দীপংকর তালুকদারের হাত ধরে তার ছাত্রলীগে অভিষেক হয়। পরবর্তী সময়গুলো দীপংকরের জন্য ছিল শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে একসময় কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পায় দীপংকর। ২০১৫ এর পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারনায় তার কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মত। এর মধ্যেই কলেজ ছাত্রলীগে শুরু হয় এক কালো অধ্যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে কলেজ ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সমন্বয়হীনতায় পাল্টাপাল্টি দুটি কলেজ কমিটি গঠন করে বিরল ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়। এত কঠিন মুহুর্তেও দলের সঙ্গ ছাড়েননি দীপংকর বরং আরো শক্ত হাতে আগলে ধরেন নিজ দলের নেতাকর্মীদের। এর মধ্যেই তার প্রাপ্তির ঝুলিতে যুক্ত হয় জেলা ছাত্রলীগের সদস্যপদ।

২০১৮ এর জাতীয় নির্বাচনে আসন পুনরোদ্ধারের চ্যালেঞ্জ, ২০১৯ এর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করার চ্যালেঞ্জসহ প্রতিটি চ্যালেঞ্জে নিজেকে যোগ্য প্রমাণিত করা এই ছাত্রনেতা যখন নিজের প্রাপ্য সম্মান চাইলো ঠিক তখনি বাঁধল বিপত্তি। যারা সেই দীপংকরকে এক সময় সাংগঠনিক সম্পাদক বানিয়েছিলেন আজ তাদের মধ্যেই কিছু নেতার হঠাত পুরানো ঢেঁকুর উঠলো। রাজনীতির এতটা পথ তার কাঁধে ভর করে চললেও হঠাত তাদের কাছে এই দীপংকরই হয়ে উঠলো বিরোধীদলের লোক! নিজেদের সিন্ডিকেটকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ তাদের পক্ষীয় মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ফেইক স্ক্রিনশট বানিয়ে গুজব ছড়াতে থাকলো তারা।

হঠাত এইধরনের হীনরাজনৈতিক প্রপাগান্ডার কারণ জানতে চাইলে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজন জানান, তাকে নিয়ে যে ইস্যুতে আলোচনা সমালোচনা বা বিতর্ক হচ্ছে তা নিতান্তই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাই আজকে আওয়ামীলীগে যোগদান করে ভালো পদে আছেন কিন্তু এই পদ তারা এমনি এমনি পাননি। আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিটি নির্দেশ পালন করে তারা তাদের দক্ষতা এবং বিশ্বস্ততার প্রমান দিয়েছেন তাই তারা আজ এই অবস্থানে। দীপংকরও একইভাবে তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিশ্বস্ততার কারণে এই অবস্থানে আসতে পেরেছে। তার বিরুদ্ধে আজ যারাই নানারকম কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করছে তারা সবাই নিজেদের ব্যাক্তি স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে এসব করছে।

দীপংকরের সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে তিনি কতটা সন্তুষ্ট এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শুধু আমি না, রাঙ্গামাটি ছাত্রলীগ পরিবারের প্রায় সবাই তার সাংগঠনিক কার্যক্রমে সন্তুষ্ট। এমনকি জেলা আওয়ামীলীগসহ আওয়ামীলীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছেও প্রিয়পাত্র সে।

রাঙ্গামাটির একটি চক্র আছে যাদের কাজ হচ্ছে ছাত্রলীগের কোন কাউন্সিল আসলেই নানাভাবে তা বিঘ্নিত করা। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ছাত্রলীগকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সংগঠনটির ভাবমূর্তি নষ্ট করা, আওয়ামীলীগের ভাবমুর্তি নষ্ট করা, জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাবমুর্তি নষ্ট করা। কিছুদিন আগেও তারা আমাদের সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে নানা কটূক্তি করেছিল।

এদিকে যাকে নিয়ে এত আলোচনা সমালোচনা সেই দীপংকর দে’র কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমি আসলেই ব্যথিত। ব্যথিত কারণ কখনো ভাবতেও পারিনি নিজের দলের ভিতরেই এইরকম নোংরা রাজনীতির সম্মুখীন হব। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম ঠিক কিন্তু আমার বয়স তখন বেশ অল্প ছিল। বুঝতাম না কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত হয়ে আমাদের দাদা দীপংকর তালুকদারের হাত ধরেই আওয়ামী পরিবারে পদার্পন করি। এর মাধ্যমেই রাজনীতিতে আমার দ্বিতীয় জন্ম হয়। এরপর থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় পদচারনা ছিল আমার। কখনো দলীয় নাম বিক্রি করে নিজের ব্যাক্তিস্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করিনি। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে প্রতিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারনায় সামনের সারিতে থেকেই কাজ করেছি। দলীয় চেইন অফ কমান্ডকে অবমাননা করিনি কখনোই।

মাত্র কয়েকদিন আগেই বাবাকে হারিয়েছি কিন্তু নিজেকে অভিভাবক শূন্য মনে করিনি। জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশকে বেদবাক্য মেনে দলের বড় ভাইদেরকেই অভিভাবক মেনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছি কিন্তু এখন সেই বড় ভাইদের মধ্যেই কয়েকজন যখন আমার অতীত নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিথ্যা বানোয়াট কিছু প্রপাগান্ডা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মিডিয়ায় ছড়াতে থাকে তখন আসলেই নিজেকে এতিম মনে হয়।

এদিকে এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষ-বিপক্ষের ব্যাপক বিতর্ক চলছে এখনো। দলের বেশ কিছু নেতাকর্মী ক্ষোভের সাথে বলেন, ছাত্রদল ও বি.এন.পি থেকে আসা নেতা-কর্মী সরাসরি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পেয়েছে এমন নজিরও আছে। তাদের বেলায় কোন কথা নেই, তাহলে দীপংকরের বেলায় কেন এত কথা? ছাত্রলীগ এর রাজনীতিতে আসার পরে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র বিরোধী এমন কোন কার্যক্রমের সঙ্গে সে লিপ্ত ছিল না।

আবার বেশকিছু হিন্দু নেতাকর্মীকে এমন কথাও বলতে শোনা যাচ্ছে যে দীপংকর হিন্দু হওয়ায় তাকে নিয়ে এত বিতর্ক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনের স্বপ্ন দেখলেও এখনো দলের ভেতর বেশ কিছু সাম্প্রদায়িক উগ্র নেতা রয়ে গেছে যারা প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। দীপংকর তারই করুণ বলী।