আজ কর্ণেল শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম’র ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী

॥ ইকবাল হোসেন ॥
আজ ১১ই আগস্ট ২০১৯ইং কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম’র ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৪০ সাল’র ১ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার খড়গমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা এ এইচ এম করিমউল্লাহ এবং মা লায়লা জোহরা বেগম। কর্নেল শাফায়াত জামিল’র পিতা এ এইচ এম করিমুল্লাহ ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস’র (জুডিশিয়াল) অফিসার ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাফায়াত জামিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অকৃত্তিম অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বীর বিক্রম পদক লাভ করেন। কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম ২০১২ সাল’র ১১ই আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবন- কর্নেল শাফায়াত জামিল ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমী থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি যখন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন তখন জেনারেল পারভেজ মোশারফ (পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান’র রাষ্ট্রপতি হন) তার সহপাঠী ছিলেন।
কর্নেল শাফায়াত জামিল রাশিদা জামিল’র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তিনি ৩ পুত্রসন্তান’র জনক ছিলেন।
কর্মজীবনে কর্নেল শাফায়াত জামিল-
কর্নেল শাফায়াত জামিল ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী’র ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন প্রাপ্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে কর্নেল শাফায়াত জামিল চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন এবং এই রেজিমেন্ট তখন কুমিল্লা সেনানিবাস এ অবস্থানরত ছিলো।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প কিছুদিন পূর্বে ১৯৭১ সাল’র ১ মার্চ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ভারতীয়  আগ্রাসনের অযুহাত দেখিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টে’র দুটি কোম্পানিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া (বি-বাড়িয়া) জেলায় পাঠিয়ে দেয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টে’র সেই দুইটি কোম্পানির মধ্যে একটি’র নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল ।
মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল শাফায়াত জামিল-
২৫শে মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট নামে ঢাকায় যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো এর খবর পাওয়ার পর। ২৭শে মার্চ তিনি ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র তাঁর অপর কোম্পানির সকল বাঙালি অফিসার এবং ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র (ডাকনাম বেবি টাইগার্স) সেনাদের সাথে সেনাবাহিনী ছেড়ে চলে আসেন। অফিসারদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন ও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রাথমিক প্রতিরোধপর্বে কর্নেল শাফায়াত জামিল আশুগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া-গঙ্গাসাগর এলাকায় যুদ্ধ করেন। এরপর তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মতিনগরে যান এবং এরপর তাঁকে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর তিনি দেওয়ানগঞ্জ ও সিলেট’র ছাতকসহ আরও কয়েকটি স্থানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কর্নেল শাফায়াত জামিল ১৯৭১ সাল’র ১০ অক্টোবর হটাৎ সিলেট সেক্টরে বদলি হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেক্টর-১১ এর অধিনে বাংলাদেশ ফোর্সের (BDF) অফিসার হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। ১৯৭১ সাল’র জুন মাসে তিনি সেক্টর ১১ এর অধিনে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসাবে নিয়োগ পান, এই সেক্টরের সেক্টর কামান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান।
স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী কর্নেল শাফায়াত জামিল-
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাফায়াত জামিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অকৃত্তিম অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বীর বিক্রম পদক লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে শাফায়াত জামিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল হতে কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং তিনি ৪৬ পদাতিক ব্রিগেড’র ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন । ১৯৭৫ ৩ নভেম্বর তিনি এবং খালেদ মোশাররফ, খন্দকার মোস্তাক আহমদ’র বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটান এবং ৬ নভেম্বর খন্দকার মোস্তাক আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম তার স্থলাভিসিক্ত হন। ১৯৭৫ সাল’র ৭ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থানে খালেদ মোশাররফ কে হত্যা করা হয় এবং কর্নেল জামিল গ্রেফতার হন ।
কর্নেল শাফায়াত জামিল ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হতে অবসর গ্রহণ করেন।
২০১২ সালে কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম ঢাকার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।