মানিকছড়িতে আ.লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলকে ঘিরে দলে প্রাণচাঞ্চল্য

॥ মানিকছড়ি প্রতিনিধি ॥

মানিকছড়ির রাজনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ৩ যুগে পর্দাপণ করেছে। ১৯৮৩ সালে তৎকালীণ আ.লীগ নেতা মরহুম খান মুকবুল আহম্মদ(সভাপতি) এবং এস.এম. গিয়াস উদ্দীন(সাধারণ সম্পাদক) এর হাত ধরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শানুসারীরা রাজনীতি শুরু করেন। প্রথমে পাহাড়ের এ জনপদে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকায় দল গোছাতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি তাঁদের। কালের আর্বতে দেশের রাজনীতিতে যখন প্রতিপক্ষ দল সৃষ্টি,সামরিক সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদলে দলের দুঃসময়ে আ.লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের তরুণ নেতা-কর্মীরা রাজপথ দখলে এগিয়ে আসে। স্বৈরশাসক এবং বিএনপি’র আমলে প্রশাসনিক বাধাঁ-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে দলে যারা অবদান রেখেছেন দল তাঁদেরকে পদ-পদবীতে রেখে মূল্যায়ণও করে আসছে। আসন্ন কাউন্সিলে দুর্দিনের সেই কান্ডারীদের আবারও শীর্ষপদ-পদবীতে বহাল রাখতে ইতোমধ্যে তৃণমূল থেকে জোর দাবী উঠছে। কাউন্সিলকে ঘিরে উপজেলা সদরে শীর্ষ দুই নেতা সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাঈন উদ্দীনকে স্বপদে বহাল রাখতে শতশত ব্যানার,ফেস্টুন ও বিল বোর্ডে সয়লাব করা হয়েছে। এদিকে ২২ আগস্ট বিকালে দলের জরুরী বৈঠকে আসন্ন সম্মেলকে ঘিরে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে,১৯৮৩-২০১৯ মানিকছড়ি আওয়ামী রাজনীতির ৩ যুগ। এ দীর্ঘ সময়ে কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে ৫বার। ১৯৮৩-১৯৯৬ পর্যন্ত দুই মেয়াদে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীণ আ.লীগ নেতা মরহুম খান মুকবুল আহম্মদ। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এস.এম. গিয়াস উদ্দীন ও মো.সফিউল আলম চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে দলের ৩য় কাউন্সিলে সভাপতি পদে আসেন সাবেক উপজাতী নেতা ও শিক্ষক এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ¤্রাগ্য মারমা। সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন তরুণ ছাত্রনেতা ও শিক্ষক এম.এ. জব্বার। ১৯৯৬-২০১২ সালের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত তাঁরা দুই মেয়াদে দল পরিচালনা করেন। এর পর ২৯ এপ্রিল ২০১২ তারিখে অনুষ্টিত হয় দলের ৫ম কাউন্সিল। এ কাউন্সিলে শীর্ষপদে(সভাপতি)আসেন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ নেতা ও তরুণ শিক্ষিত যুবক মো. জয়নাল আবেদীন। আর সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে(১৯৯০সালে) রাজপথ কাপানো এবং ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে উপজেলায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাজপথে নেতৃত্বদানকারী তরুণ ছাত্রনেতা ও নির্বাচিত ছাত্রলীগ সভাপতি মো. মাঈন উদ্দীন। শীর্ষ এ দুই পদে, দুই কান্ডারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ থেকে সরাসরি মূলদলের অভিভাবক হয়ে(২০১২-২০১৯)দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর দল পরিচালনা করেন। তৃণমূল আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ,যুবলীগ এবং অঙ্গসংগঠনের সকল নেতা-কর্মীদের দাবী এ সময়ে((২০১২-২০১৯) তৃণমূলে দল সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়েছে। জনপদে সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের পাশাপাশি দলের নেতা-কর্মীরা পেয়েছে মূল্যায়ণ। দলের কোথাও পাওয়া না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস নেই,অভিমান নেই,অবমূল্যায়ণের অভিযোগ নেই। সবাইকে তুষ্ট রেখে দল পরিচালনায় অবদান রাখায় আসন্ন কাউন্সিলে অন্তত সভাপতি ও সম্পাদক পদে এখনো পর্যন্ত কেউই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছ প্রকাশ করেনি। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর রোজ শুক্রবার বাদ জুমা(সম্ভাব্য তারিখ) উপজেলা টাউন হল চত্বরে জমকালো আয়োজনে দলের ৬ষ্ঠ কাউন্সিলের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। দলীয় অফিস চত্বর,দোকান-পাট,রাস্তা-ঘাট ও জনসমাগমস্থলের পরতে পরতে দৃশ্যমান হয়েছে এ দুই নেতার গুনগান সম্বিলিত ফেস্টুন,ব্যানার,বিল বোর্ড। যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এসব দৃশ্য দেখেই প্রতিয়মান হচ্ছে আসন্ন কাউন্সিলে অন্তত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কেউই প্রার্থী হচ্ছে না। কাউন্সিলের আর মাত্র বাকি ১০ দিন। কাউন্সিলের সংবাদ জানাজানির ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোন প্রার্থীর নাম নেতা-কর্মীদের জল্পনা-কল্পনায় আসেনি। সর্বশেষ ২২ আগস্ট বিকালে কাউন্সিলকে ঘিরে দলের বিশেষ বৈঠক অনুষ্টিত হয়। বৈঠকে একবাক্যে,একসূরে সকলে বর্তমান কমিটি পূর্ণবহালের জোর দাবী জানান। ফলে আসন্ন কাউন্সিল সম্পন্ন করতে দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান ফারুককে আহবায়ক ও দলের সাধারণ সম্পাদক মো. মাঈন উদ্দীনকে সদস্য সচিব ঘোষণা করে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে ১২৪ জন, উপজেলার ৬০ জন( মৃত.৭জন ব্যতিত) এবং কো-অপশন ১৫জনসহ মোট ১৯৯ জন ভোটার পূর্বের ৬৭ সদস্যে স্থলে নতুন গঠনতন্ত্রের আলোকে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে ভোট প্রদান করবেন।

বর্তমান কমিটির শীর্ষ দুই নেতার রাজনৈতিক কর্মকান্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মো. জয়নাল আবেদীন ১৯৯০ সালে এসএসসি ও ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাশ করে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগে যোগানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পর্দাপণ করেন। পরে তাঁর নিজ জনপদে ইউনিয়ন পরিষদ সৃষ্টি করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া, যুবলীগের রাজনীতি থেকে সরাসরি আ.লীগের সভাপতি নির্বাচিত এবং বর্তমানে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিতসহ সবই সম্ভব হয়েছে দলে একনিষ্ঠ কর্মকান্ড পরিচালনাসহ নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ণে।

অন্যদিকে মো. মাঈন উদ্দীন মাধ্যমিকের ছাত্র থাকাকালে ১৯৮৮ সালে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহন ছিল তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য অবদান। ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে এইচএসসি পাশ করার পর (১৯৯৩-২০০০) বিদেশ অবস্থান শেষে আবারও সক্রিয় হন ছাত্ররাজনীতিতে। ২০০৩ সালের ১২ জানুয়ারী উপজেলা ছাত্রলীগ কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই দিন উপজেলা ছাত্রলীগের কাউন্সিলকে ঘিরে সমাবেশ স্থলে ১৪৪ ধারা জারি করে তৎকালীণ প্রশাসন। সেই দিন এ নেতার ডাকে ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সম্পাদকের উপস্থিতিতে কাউন্সিল সম্পন্ন করেন ছাত্রলীগ। ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি পদে থেকে তৃণমূলে জনপ্রিয়তা অর্জণ করেন মো. মাঈন উদ্দীন।

যার ফলে ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিলে অনুষ্টিত আ.লীগের ৫ম কাউন্সিলে জননন্দিত এ দুই নেতাকে আওয়ামীলীগের কান্ডারী করা হয়। এ উপজেলার রাজনীতিতে দু’জনের দূরদর্শি চিন্তা-চেতনা ও কলা-কৌশলে আওয়ামীলীগ এগিয়ে গেছে অনেক দূর! বিশেষ করে আ.লীগের ধারাবাহিক রাষ্ট্রপরিচালনার সুযোগে এ দুই নেতা জনপদে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা, নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন,দলকে সু-সংগঠিত করায় তৃণমূলের আস্থা অর্জণে সফল হয়েছে তাঁরা।
তৃণমূলে বর্তমান কমিটির অবস্থান জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তফা কামাল ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম এক বাক্যে বলেন, বর্তমান কমিটির বিকল্প নেতৃত্ব এখনো সৃষ্টি হয়নি। ফলে আবারও এ কমিটি পূর্ণবহাল করা উচিত।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাঈন উদ্দীন এক বাক্যে বলেন, জীবনে শুরু থেকেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে আদর্শিত হয়ে‘বঙ্গবন্ধু’র ক্ষুধা ও দরিদ্র মুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে দলের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করেছি মাত্র। আশা করি দলের তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারবো। আবারও দায়িত্ব পেলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে নিজেকে দলের জন্য আরো উৎসর্গ করবো।