ব্রেকিং নিউজ

রাঙামাটির খাদ্য অফিসে টেন্ডার নিয়ে কারচুপির নানা কিচিম: দুপুর পর্যন্ত অফিসেই থাকেন না কর্মকর্তারা

॥ আলমগীর মানিক ॥

রাঙামাটি জেলার সকল খাদ্য গুদামে সরকারী চাউল লোড-আনলোডের কাজের জন্য শ্র্রমিক সরবরাহকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহবান করার পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত দরপত্র মূল্যের চেয়ে প্রতিটিতে তিনশো টাকা করে বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রোববার রাঙামাটিস্থ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দরপত্র জমা দিতে আসার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ করেন।

এদিকে, প্রায় দুইশো সিডিউল বিক্রি করলেও এসব সিডিউল জমাদানসহ দরপত্র বাক্স খোলার জন্য রোববার নির্ধারিত তারিখ থাকলেও সকাল থেকে দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত সময়কালে রাঙামাটির জেলা খাদ্য অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তার কেউই উপস্থিত ছিলেন না। আগত ঠিকাদারসহ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতে দিনের শুরু থেকে দরপত্র জমাদানের বক্সের নিরাপত্তায় ছিলোনা কোনো পুলিশের উপস্থিতি। এদিকে সাংবাদিকরা যাওয়ার পরে ফোন করে বেলা পৌনে একটার সময় উক্ত অফিসে কোতয়ালী থানার এসআই ওসমান গণির নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম সেখানে গেছে।

বেলা সাড়ে এগারোটা থেকে সরেজমিনে গিয়ে সেখানে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা গেছে, রাঙামাটি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার ব্যবস্থাপনাই ছিলোনা। এসময় চট্টগ্রাম ও নংসিংদী থেকে আগত অন্তত ১০জন ঠিকাদারের সাথে কথা বললে তারা প্রতিবেদককে জানান, রোববার সকালে তারা দরপত্র জমা দিতে এসে দেখেন একটি ছোট বাক্স ছাড়া আর কিছুই নাই। এসময় কোনো পুলিশ বা টেন্ডার কমিটির কাউকে নাদেখে অনেকটা ভয়ে ভয়ে উক্ত ক্ষুদ্র বাক্সটিতে দরপত্র সিডিউলের খাম ড্রপ করেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম থেকে আসা ঠিকাদার জাহেদ।

অপর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সুনাম এন্টারপ্রাইজের সত্তাধিকারী রহিম জানিয়েছেন, আমরা চট্টগ্রাম থেকে অনেকগুলো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এখান থেকে দরপত্র কিনেছি। প্রতিটি দরপত্র নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও ৩শ টাকা করে বেশি নিয়েছে। এসময় খাদ্য অফিসে হিসাব রক্ষক এর দায়িত্বে থাকা জাহিদ ইসলাম বিষয়টি সঠিক নয় জানিয়ে বলেন, ফটোকপি বাবদ ৫০/১০০ টাকা নেওয়া হয়ে থাকতে পারে, তবে তিনশো টাকা নেওয়া হয়নি। এসময় বেশ কয়েকজন ঠিকাদার তার সামনেই চিৎকার করে টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রমান করতে বললে চুপ হয়ে যান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমরা ৭৫০ ও ৪০০ টাকা দামের প্রায় দুইশো সিডিউল বিক্রি করেছি।

এদিকে, উক্ত কার্যালয়ে সিডিউল জমা দিতে আসা অন্তত ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বললে তারা সকলেই জানান, তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে এসে চরম অব্যবস্থাপনার সম্মুখিন হয়েছেন। অফিসের কর্মকর্তাদের কেউ উপস্থিত নেই, তারপর প্রতিটি সিডিউল কিনতে হয়েছে প্রতিটি তিনশো টাকা করে বেশি দিয়ে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাহেদ এন্টারপ্রাইজ, রহিম অটো, সুনাম এন্টারপ্রাইজ, ইমাম এন্ড ব্রাদার্স, রাসেল পরিবহন, নাসিম ব্রাদার্স, তৃশা এন্টারপ্রাইজ, নিউ এসকে ট্রান্সপোর্ট, এসকে ট্রেডিং, ইউনি ট্রেড, তানজিনা এন্টার প্রাইজসহ আরো বেশ কয়েকজন ঠিকাদার এসময় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমরা এখানে চরম অনিরাপত্তার মাঝে এসেছি। এখানে যেকোণ সময় টেন্ডার ছিনতাইসহ আমাদের প্রে-অর্ডার সম্বলিত সিডিউল টি হারিয়ে যেতে বা সরিয়ে ফেলতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এই ধরনের অব্যবস্থাপনা করলো এটা আর কোথাও দেখিনি।

রোববার দুপুরে বেলা এগারোটা থেকে ১২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত রাঙামাটি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সরেজমিনে অবস্থান করে দেখা গেছে, নিয়মানুষারে টেন্ডার জমার শেষ তারিখ ১৫ই সেপ্টেম্বর দুপুর একটা পর্যন্ত এবং জমাকৃত টেন্ডার সিডিউল বক্স খোলার সময় একই দিন বিকেল দুইটা নাগাদ হলেও অফিসের অন্যতম তিনজন গুরুত্বপূর্ন কর্মকর্তার কেউই নিজ নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। এসময় জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অফিসের কয়েকজন জানান, ম্যাডাম (সুমাইয়া নাজনিন) দুপুরে টেন্ডার বাক্স খোলার সময় আসবেন। ইতিমধ্যেই (বেলা ১২.৩১ মিনিট) তিনি গাড়িতে রয়েছেন বলেও মুঠোফোনে জানিয়েছেন। অপর কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা (সহকারি খাদ্য নিয়ন্ত্রক) বেথুয়েন চাকমা ও সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমও তার নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। এসময় অফিসের কয়েকজন কর্মচারি জানিয়েছেন, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছুটিতে রয়েছেন এবং সহকারি খাদ্য নিয়ন্ত্রক নানিয়ারচরে অবস্থান করছেন। আর ম্যাডাম কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন।

এদিকে, টেন্ডার ড্রপের সময় কেন কমিটির কেউ উপস্থিত ছিলো না?, অফিসের কর্মকর্তারা দুপুর পর্যন্ত কেন নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত হননি এবং সিডিউল বিক্রির জন্য অতিরিক্ত টাকা কেন নেওয়া হলো? এসব বিষয়ে জানতে রাঙামাটির জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনিন এর মুঠোফোনে একাধিক নাম্বারে একাধিক বার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অপরদিকে এই বিষয়গুলো জানিয়ে রাঙামাটি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এর উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ মাহবুবুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, বিষয়গুলো আমাকে আগে থেকে কেউ অবহিত করেনি। তারপরও আপনার মাধ্যমে জেনেছি যখন আমি অফিসিয়ালিভাবে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।

জানাগেছে, আগামী দুই বছরের জন্য রাঙামাটিতে প্রায় এক লাখ টন খাদ্য আমদানী ঘটবে। রাঙামাটি জেলার খাদ্য গুদামসহ উপজেলাগুলো খাদ্য গুদামগুলোতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশ থেকে আসা এসব খাদ্যগুলো বিভিন্ন পরিবহনে মালামাল হ্যান্ডলিং (লোড-আনলোড) করার কাজে শ্রমিক থাকে। সাধারণত খাদ্যশস্যের পরিমাণের ওপর এসব শ্রমিকদের চাহিদা নির্ভর করে। তাদের কাজের জন্য একটি নির্ধারিত মজুরি খাদ্য অধিদপ্তর পরিশোধ করে। এক্ষেত্রে টন প্রতি একটি নির্ধারিত মজুরিও আছে। এসব কাজ হ্যান্ডলিং ঠিকাদাররা নিয়ন্ত্রণ করে।