ব্রেকিং নিউজ

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রদবদলের রেশঃ কি ভাবছে রাঙামাটির ছাত্রলীগ নেতারা?

॥ সৌরভ দে ॥

নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন এনে আবারও সারাদেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যেন আবারও প্রমাণ করলেন তার প্রতি দেওয়া ‘লৌহ মানবী’ উপাধিটি আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। নানামুখি অভিযোগ, দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করাসহ বেশকিছু ইস্যুতে শোভন-রব্বানীর উপর বিরক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বিরক্তির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, ছাত্রলীগের এই দুই নেতাকে ‘মনস্টার’ বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের অনির্ধারিত আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। এসময় তিনি ছাত্রলীগের এই দুই নেতাকে অব্যহতি দিয়ে তাদের জায়গায় প্রথম সহ-সভাপতিকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন।

দলের সিনিয়র নেতারা এই ঘটনাকে একই সাথে ‘নজিরবিহীন’ ও অন্য নেতাদের জন্য ‘কড়া বার্তা’ বলেও অভিহিত করেছেন। সেই সাথে ছাত্রলীগে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু হওয়ার ইঙ্গিতও দেন তাঁরা। এদিকে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত দুই নেতা আল নাহিয়ান খান ও লেখক ভট্টাচার্য পাচ্ছেন সংগঠনের যাবতীয় সকল ক্ষমতা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই হঠাৎ রদবদলের প্রভাব রাঙামাটিতে কতটুকু পড়বে? শুদ্ধি অভিযানের ফলে রাঙামাটিতে কারো ঝরে পড়ার সম্ভাবনা আছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা বলা হয় রাঙামাটি জেলায় ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সাথে।

   ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন রাঙামাটির উপর খুব একটা প্রভাব ফেলবে’ বলে মনে করেন না জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজন। তিনি বলেন, কেন্দ্রের নেতৃত্বের রদবদল নিঃসন্দেহে জননেত্রী শেখ হাসিনার একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত রাঙামাটি বা দেশের অন্য কোন জেলায় ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না বরঞ্চ এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা সংগঠনে যে নতুন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তাতে ছাত্রলীগ আরো বেশি সুসংগঠিত হবে।

নতুন নেতৃত্বের কাছ থেকে তিনি কি আশা করেন এমন প্রশ্নের জবাবে সুজন বলেন, আশা থাকবে বর্তমান ভুলগুলো শুধরে ১৯৪৮ সালে যে উদ্দেশ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে উদ্দেশ্য যেন সঠিকভাবে পূরণ করা হয়।

ছাত্রলীগে শুদ্ধি অভিযানের ফলাফল কি হতে পারে তা ব্যাখ্যা করে রাঙামাটি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ছাত্রলীগের সদস্য আহমেদ ইমতিয়াজ রিয়াদ বলেন, বিগত বেশ কয়েক বছর হতেই রাঙ্গামাটি ছাত্রলীগে বহিরাগতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং ঘটছে। বিএনপি জামাতসহ আঞ্চলিক দল জেএসএস ও ইউপিডিএফের অনেক কর্মীও এখন রাঙামাটি ছাত্রলীগের ভালো ভালো পোস্টে রয়েছে। শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করলে এদের আসল পরিচয়টা বেরিয়ে আসবে এবং এটা বেরিয়ে আসা উচিত। শোভন-রব্বানী ভাইদের অপকর্মের শাস্তি হিসেবে অব্যহতি দেওয়ার মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনা যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এটা যদি কেন্দ্র হতে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত পরিচালনা করা হয় তাহলে ছাত্রলীগ আগের চেয়ে আরো বেশি স্বচ্ছ ও সুসংগঠিত হবে বলে আমি মনে করি।

রিয়াদ বিষয়টিকে ইতিবাচক ভাবেই দেখছেন জানিয়ে আরো যোগ করেন, শোভন ও রব্বানী ভাইদের অব্যহতির ঘটনা সমগ্র ছাত্রলীগের জন্য একটা বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। এখন তৃণমূল হতে শুরু করে ছাত্রলীগের যেকোন নেতা অপরাধ করতে ভয় পাবে।

ছাত্রলীগের অনেকেই নেতৃত্বের এই পরিবর্তনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। বাস্তবেই এখানে কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের আহবায়ক স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, এখানে কোন প্রকার ষড়যন্ত্রের প্রশ্নই আসে না। এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এসেছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্বের রদবদল হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তকে ষড়যন্ত্র বলে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোন অবকাশ নেই। এটা একটা সাধারণ এবং চলমান প্রক্রিয়া। সংগঠনের সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে গতিশীলতার স্বার্থে নেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সময়ের প্রয়োজনে এটাকে ইতিবাচক ভাবেই নিতে হবে সকলকে এবং আমাদের রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগও সেভাবেই নিয়েছে।

স্নেহাশিস আরো জানান, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যে ডেকোরাম আছে সেটার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ভ্যানগার্ড হিসেবে সারা দেশের সকল ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সুসংহত দিকনির্দেশনা দিবে বর্তমান নেতৃত্ব। সর্বোপরি মেধা এবং যোগ্যতার মূল্যায়ন পাবে এই কামনাই করছি।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হঠাত এই পরিবর্তনে তৃণমূল কি ভাবছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা ছাত্রলীগের সদস্য দীপংকর দে বলেন, নেতৃত্বের এই পরিবর্তনকে তৃণমূল ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে। এটা হওয়ারই ছিল। ছাত্রলীগের আদর্শ হতে বিচ্যুত হলে কেউই যে ছাড় পাবে না এই ঘটনার মাধ্যমে তা আবারো প্রমাণিত হল। ছাত্রলীগকে সঠিকপথে রাখতে জননেত্রী শেখ হাসিনার এই ধরণের সিদ্ধান্ত তৃণমূলকে আরো বেশি উজ্জীবিত করবে।

এদিকে রাঙ্গামাটি জেলার ছাত্রলীগের তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ছাত্রলীগের জন্য এই শিক্ষা খুব বেশি জরুরী ছিল। বড় নেতাদের টেন্ডারবাজী, নিজের স্বার্থে দলীয় প্রভাব খাটানো, দলের তৃণমূল কর্মীদের নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে নিযুক্ত করাসহ নানা কারণে তরুণ মেধাবী ছাত্ররা ছাত্রলীগ হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অধিকাংশ ছাত্রদেরই ধারণা ছাত্রলীগ বা ছাত্ররাজনীতি নষ্টদের কাজ আর এই ভ্রান্ত ধারণার জন্য সংগঠনের উপরের লেভেলের নেতারাই দায়ী।

ভারত বিভক্তির কিছুকাল পরেই ছাত্রলীগের জন্ম জাতির পিতার হাত ধরে। জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ছয় দশকের সবচেয়ে সফল সাহসী সারথি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কালের পরিক্রমায় এখন সেই ছাত্রলীগই নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে আশার আলো এখনো নিভে যায়নি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছাত্রলীগ ও যুবলীগে শুদ্ধি অভিযানসহ বিভিন্ন সাহসী সিদ্ধান্তে পাল্টে যেতে পারে সম্পূর্ণ চিত্র। বলাইবাহুল্য নেতৃত্বের এই হঠাত রদবদল নেতাকর্মীদের জন্য অনেক বড় একটা ঝাঁকি ছিল, সেই ঝাঁকিতে কয়জন জেগে উঠে আর কয়জন ঘুমে নিমগ্ন থাকে তাই এখন দেখার বিষয়।