মারমা পাড়া উচ্ছেদ করে বান্দরবানে যুবলীগ নেতা শামীমের কোটি টাকার রিসোর্ট!

॥ নুরুল কবির – বান্দরবান ॥

বান্দরবান শহরের সিলভান ওয়াই রিসোর্ট এন্ড স্পা নামে তিন তারকা মানের একটি বিলাসবহুল পর্যটন রিসোর্টেও আলোচিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় দুইশ কোটি টাকা বিনিয়োগের বান্দরবান শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক সড়কের পাশে প্রায় ৫০ একর এলাকা জুড়ে বিলাসবহুল এই রিসোর্টটি তৈরি করা হচ্ছে।

খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, রিসোর্টটির মালিকানায় যে ৮ জন শেয়ারদার রয়েছেন তার মধ্যে আলোচিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম জি কে একজন। প্রথম পর্যায়ে ১০ কোটি টাকার বিনিয়োগে রিসোর্টটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নির্মাণ শেষ পর্যন্ত দুইশ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তার জন্য রিসোর্টের পাশে একটি পুলিশ ক্যাম্পও করে দেওয়া হয়েছে। শহরের কাছে জেলা প্রশাসন পরিচালিত পর্যটন কেন্দ্র নীলাচল সংলগ্ন ছাইংঙ্গ্যা পাড়ায় এই সিলভান ওয়াই রিসোর্ট নির্মিত হচ্ছে। স্থাপনা করতে গিয়ে সেখানে এর মধ্যে ছয় পরিবারের একটি মারমা পাড়া উচ্ছেদ হয়েছে। উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে এর পাশে প্রায় দুইশ পরিবারের লাইমি বম পাড়া ও ত্রিপুরাদের ছাইংঙ্গ্যা পাড়া। রিসোর্টের মালিকদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে পাড়ার সীমানায় কাঁটাতার দিয়ে তাদের জমি দখলের পাশাপাশি হয়রানি ও চলাচলে বাঁধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

রিসোর্টের পরিচালকদের জমি ক্রয় সংক্রান্ত একটি সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায় জি কে শামীম ছাড়াও রিসোর্টের মালিকানায় রয়েছেন চেয়ারম্যান পদে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই জসিম উদ্দিন মন্টু, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করিম চৌধুরী, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামিল উদ্দিন শুভ এবং পরিচালক গোলাম কিবরিয়া শামীম, এস.এইচ.এম মহসিন, উম্মে হাবিবা নাসিমা আক্তার, জিয়া উদ্দিন আবির ও জাওয়াদ উদ্দিন আবরাব।

সভার সিদ্ধান্তে দেখা যায়, সেখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি করার জন্য বান্দরবান জেলা পুলিশকে ০.১৮৩৭ একর ( প্রায় ১৮ শতক) জমি বিক্রয় করার জন্য জসিম উদ্দিন মন্টুকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়। পরে জেলা পুলিশের নামে সে জমি দান করেন মন্টু। সেখানে রিসোর্টের পক্ষ থেকে পুলিশ ফাঁড়ির জন্য একটি দ্বিতল ভবনও করা হয়েছে।

বান্দরবান পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার বলেছেন, পুলিশকে জমি দান করার প্রক্রিয়া তিনি যোগদান করার আগে থেকেই শুরু হয়েছে। পুলিশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মাধ্যমে দান করার জমি গ্রহণ করা হয়েছে। বান্দরবান পুলিশ সুপারের পক্ষে তিনি স্বাক্ষর করেছেন মাত্র।

এদিকে তিন পার্বত্য জেলায় জমি কেনায় সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন থাকার পরও কীভাবে ভূমি দখল করে স্থাপনা তৈরি হয়েছে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের জেলা কমিটির সভাপতি জুয়ামলিয়াম আমলাই বলেন, জি কে শামীমের বিনিয়োগের টাকা পাহাড়ে পর্যন্ত গড়িয়েছে। রিসোর্ট করতে গিয়ে পাহাড়িরা ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। তাদের দৌরাত্ম ও ক্ষমতার কাছে প্রশাসনও একভাবে অসহায় মনে হচ্ছে। ভূমিদস্যুদের সরকারে কঠোর নজরদারিতে রাখার আহবান জানান তিনি।

বান্দরবান বোমাং সার্কেল কার্যালয় সূত্রে জানায়, ১৯৯৭-এর পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ জমি কিনতে পারে না। কোনো ব্যক্তি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা কিনা তা যথাযথ তথ্য প্রামাণ সাপেক্ষে জেলা প্রশাসক এবং সার্কেল চীফ সনদ প্রদান করে থাকেন।

বান্দরবান বোমাং সার্কেল চীফ ও হেডম্যান কার্যালয়ে প্রধান সহকারী অংজাই খিয়াং জানান, জমি কেনার কিছু কাগজ দেখেছেন। কিন্তু তা কত একর তা তিনি জানেন না।

জমি কেনার বিষয়ে জসিম উদ্দিন মন্টু রিসোর্টে মালিকানায় জি কে শামীম পরিচালক হিসেবে থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বলেন, রিসোর্টের জন্য ৫০ একর জমি কেনা হয়েছে। পার্বত্য জেলায় স্থায়ী বাসিন্দা না হয়েও জমি কীভাবে কেনা হয়েছে প্রশ্নের জবাবে জসিম উদ্দিন জানান, তিনি বান্দরবানেরই বাসিন্দা। কিস্তু কোন এলাকার বাসিন্দা জিজ্ঞেস করা হলে বারবার এড়িয়ে গেছেন।

রিসোর্টির বিরুদ্ধে জায়গা দখলের অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত কমিটি করা হয়েছে এবং তদন্তের পরই প্রশাসন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।