রাঙ্গামাটির পূজা মন্ডপগুলোতে নিষিদ্ধ হচ্ছে শ্রুতিকটু হিন্দি গান!

॥ সৌরভ দে ॥

মা আসছেন। প্রতিবছর আনন্দময়ীর এই  আগমন অভাব-যন্ত্রনা, ক্লিষ্টতা, অগ্নিমূল্য বাজার সবকিছুরই দুঃখ ঘুচিয়ে দেয়। মায়ের আগমনী বার্তা অধিকার করে আকাশ বাতাস হৃদয়-মন কিন্তু স্বভাব দোষে এই আনন্দ তার পবিত্রতা হারিয়েছে অনেকাংশে। প্রতিযোগিতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, নেশাগ্রস্ততা, অবৈধ কার্যকলাপ, হুজুগপ্রিয়তা অনেকটাই এই আনন্দের পবিত্রতাকে খর্ব করেছে।

প্রতি বছর বন্ধুদের নিয়ে শহরের প্রতিটা মন্ডপে ঘুরে বেড়ানোটা এখন পূজোকালীন রুটিন। ষষ্ঠী থেকে নবমী ৪টি দিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত প্রত্যেকটা মন্ডপে যাওয়া চাই। কোন মন্ডপের বাজেট ভালো আবার কোন মন্ডপের কিছুটা কম, বাজেট অনুযায়ী প্রতিমা ভিন্ন হলেও আনন্দময়ীর মহিমায় তা প্রভাব ফেলে না। তবে যে জিনিসটা মনে বেশ প্রভাব ফেলে তা হচ্ছে মন্ডপের আবহ। পূজো মানে বুঝি ঢাকের তাল সঙ্গে কাঁসার ধ্বনি কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ইদানীং অনেক পূজো মন্ডপই ঢাক-ঢোলকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছে। ঢাকের মধুর ধ্বনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে হিন্দি শ্রুতিকটু ডিজে-ডিস্কো গান। অনেক পূজো মন্ডপেই এখন উচ্চস্বরে ডিস্কো গান ছেড়ে দিয়ে ছেলেপুলেদের উচ্ছৃঙ্খল নৃত্য যেন ফ্যাশন! অনেকে আবার মদ্যপান করে মন্ডপেই শুরু করে দেয় নাচ!

বিষয়টি এতটাই সিরিয়াস পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এ নিয়ে উঠেছে ঘোর আপত্তি। পুলিশ সুপার তো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পূজোয় রঙ মারামারি, মদ্যপানসহ কোন ধরণের উচ্ছৃঙ্খলতা বরদাশত করা হবে না।

পুলিশ সুপারের নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাদল চন্দ্র দে জানান, “ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য খর্ব করে এমন কোন গান পূজা মন্ডপে বাজানো যাবে না। আমরা এই বিষয়ে রাঙ্গামাটির প্রতিটি পূজা মন্ডপে লিখিতভাবে নোটিশ প্রেরণ করবো। মদপান করে উচ্ছৃঙ্খলতা করলে তাকে সরাসরি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে সে যেই হোক। এর পাশাপাশি আমি আমাদের মনিটরিং সেলকেও নির্দেশ দিয়েছি এইসব বিষয়ের উপর কঠোরভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য।”

এই বিষয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ রাঙ্গামাটি জেলার সভাপতি অমর কুমার দে বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের মিটিংএ বলেছি পূজো মন্ডপে মদপান করে উচ্ছৃঙ্খলতা করাকে আমরা কোনভাবেই প্রশ্রয় দেবো না। যেসব অশ্লীল গান যা মন্ডপের পবিত্রতা নষ্ট করে সেগুলো সম্পূর্নরুপে নিষিদ্ধ করা হবে, এই বিষয়ে আমরা প্রতিটি মন্ডপে নোটিশ প্রেরণ করবো। পূজা চলাকালীন প্রতিটি মন্ডপে আমি পরিষদের মেম্বারদের নিয়ে ব্যাক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকবো। দশমীর দিনও আমাদের পরিষদের সদস্যরা রাস্তায় থাকবে এসময় কোন ধরণের অনাকাংখিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আমরা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে একযোগ হয়ে কাজ করবো।”

তবে পূজা মন্ডপে অশ্লীল গান নিষিদ্ধের ব্যাপারে পূজা উদযাপন পরিষদের কাছ থেকে এখনো পর্যন্ত কোন নোটিশ আসেনি উল্লেখ করে শ্রী শ্রী রক্ষা কালী মন্দিরের দূর্গা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি স্নেহাশীষ চক্রবর্তী জানান, “আমাদের মন্ডপে কোন ধরণের ডিজে বা অশ্লীল গান বাজানো হবে না। পূজা উদযাপন পরিষদের কাছ থেকে এই সংক্রান্ত কোন নোটিশ না আসলেও আমরা নিজেরাই এই বিষয়টি আমাদের মন্ডপে নিষিদ্ধ করেছি।”

এছাড়াও তিনি জানান, “মাদক সেবন করে কেউ যাতে মন্দিরের পরিবেশ নষ্ট না করতে পারে সে বিষয়েও আমাদের কমিটি তৎপর থাকবে। অনেক সময় দেখা যায় কিছু বখাটে ছেলে মন্দিরের গেইটে দাঁড়িয়ে ইভটিজিং করে বা মোবাইলে মেয়েদের ছবি তোলার চেষ্টা করে। এই ধরণের কাউকে নজরে পড়লে তাকে আমরা সরাসরি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেবো। এই বিষয়ে সতর্কতামূলক একটা নোটিশ মন্দিরের বাইরেও টাঙ্গানো থাকবে।”

এই বছর মোট ৪১টি মন্ডপে হতে যাচ্ছে শারদীয় দূর্গোৎসব। তার মধ্যে সদর উপজেলায় ১৪টি, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ৪টি, লংগদু উপজেলায় ৪টি, বরকল উপজেলায় ২টি, জুরাছরি উপজেলায় ১টি, বিলাইছড়ি উপজেলায় ১টি, কাপ্তাই উপজেলায় ৭টি, কাউখালী উপজেলায় ৪টি, রাজস্থলী উপজেলায় ৩টি, নানিয়ারচর উপজেলায় ১টি। এই ৪১টি মন্ডপে ষষ্টীর দিন থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পোশাকী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাক, মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মিলে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। এছাড়াও পুলিশ বাহিনীর সাথে আনসার ব্যাটালিয়ান এর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবে।