আঞ্চলিকদলগুলোর হুমকিতে বন্ধ রাঙামাটির ৪টি হাট: শতকোটি টাকার লোকসানে গ্রামীন অর্থনীতিতে ধ্বস!

॥ আলমগীর মানিক ॥

পিছিয়ে পড়া জনপথের অন্যতম অংশীদার পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা রাঙামাটি জেলা। আঞ্চলিক রাজনীতির গেড়াকলে আবদ্ধ হয়ে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বেশ কয়েকটি উপজেলায় মিলছেনা সাপ্তাহিক হাট। ফলে প্রতি সপ্তাহে অন্তত শতকোটি টাকার লেনদেন বন্ধ হয়ে আছে। আঞ্চলিক দলগুলোর চাপের মুখে বাজার বয়কটের সংস্কৃতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় পিছিয়ে পড়া রাঙামাটি জেলার অর্থনীতি ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। মন্দাভাব দেখা দিয়েছে জেলার বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে। অস্ত্রের ভয়ে রাঙামাটির জেলার বেশ কয়েকটি প্রসিদ্ধ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সাপ্তাহিক হাট মিলছেনা; এতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত শতকোটি টাকার কেনাবেচা বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারগুলো যেন এখন বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। 

অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানির ফলে চলমান উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডগুলো বাধাগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা-বানিজ্যহীন এই অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিকভাবে চরম মন্দা ভাব বিরাজ করছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাজারগুলোতে সাপ্তাহিক হাট বসা বন্ধ থাকার প্রেক্ষিতে পাহাড়ের অর্থনীতি ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ি নেতৃবৃন্দ।

কৃষিপণ্য নির্ভর রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি সদর, বাঘাইহাট, নানিয়ারচর ও সুবলং বাজারে সাপ্তাহিক হাট না বসার কারণে এলাকার প্রান্তিক চাষিরা যেমন নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক কষ্টে পড়েছে।  পাহাড়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপন্য, প্রাণী সম্পদ, মাছ ও হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করতে না পেরে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতির সম্মূক্ষীন হতে হবে এ অঞ্চলের সাধারণ জনতাকে। তাছাড়া এ অঞ্চলে বাজার থেকে আসা চাল-ডাল ও মুদি মনোহরি মালামাল বেচা কেনার বড় হাটগুলো বসে প্রতি সপ্তাহান্তে। এসব বাজারগুলোতে সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার বেচা-কেনা হয়। গ্রামীণ কৃষক ও সাধারণ মানুষের কেনাবেচা ও ব্যবসার পথ রুদ্ধ করে দিয়ে বারবার বাজার বর্জনের প্রবণতায় পাহাড়ের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধস নামছে বলে মত প্রকাশ করেছে পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ।

সূত্রমতে, কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে প্রসিদ্ধ হাট-বাজার বয়কট করতে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠিকে বাধ্য করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলো। বিগত কয়েক বছর ধরে চলে আসা এই বাজার বয়কট সংস্কৃতির কারনে পাহাড়ের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব পড়ছে। অস্ত্রধারীদের অব্যাহত হুমকি, হত্যা, গুম, অপহরণ, আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াসহ নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সংগঠিত করে স্থানীয় নীরিহ পাহাড়ি জনগণকে পরিকল্পিতভাবে মুখোমুখি করে গড়ে তোলার মিশনে নেমেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। এতে ট্যুরিজম সেক্টরসহ স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি পাহাড়ি কৃষি পণ্যের স্থানীয় ঐতিহ্যবাহি বাজারগুলো একের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া মুখ থুবড়ে পড়ছে পাহাড়ের অর্থনীতি। ব্যবসায়িদের অভিযোগ, আঞ্চলিক দলীয় সন্ত্রাসীদের কারনে শত কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হতে হচ্ছে স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ি থেকে শুরু করে পাইকার ও বাহির থেকে আসা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়িরা।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, রাঙামাটি জেলার বড় বাজারগুলোর অন্যতম হলো বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর বাজার। প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস এই উপজেলায় বিগত এক কয়েকটি বছর ধরেই বন্ধ রয়েছে বাঘাইহাট বাজারটি। সম্প্রতি উপজেলা সদরের বাজারেও সাপ্তাহিক হাট মিলছেনা। আঞ্চলিকদলগুলোর হুমকিতে নিজেদের উৎপাদিত ফসলাদি নিয়ে হাটে আসতে পারছেনা স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্ট্যদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, সপ্তাহের প্রতি বুধবার সাপ্তাহিক হাটে স্থানীয় ৪শতাধিক দোকানদারসহ হাজারো ব্যবসায়ি কেনা-বেচায় অংশগ্রহণ করে। প্রতি সপ্তাহে এই হাটে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু বাজার না মেলায় নিদারুন কষ্টে দিনানিপাত করছে স্থানীয় উপজাতীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়িরা। বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় বাজার না মেলার বিষয়টি জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম জানালেন, এটা পাহাড়বাসীর দূর্ভাগ্য যে, এখানকার আঞ্চলিকদলগুলোর নেতৃবৃন্দ সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করেনা। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে এবং প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জনমত শক্তভাবে গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় বাসিন্দারা নির্ভয়ে বাজারে আসতে পারবে।

অপরদিকে জেলার নানিয়ারচর উপজেলা সদরের বাজারটিতে সাপ্তাহিক হাট বসছে না বিগত উপজেলা নির্বাচনের দিন থেকেই। লক্ষাধিক মানুষের বসবাসকৃত নানিয়ারচর উপজেলায় স্থানীয় দেড় শতাধিক দোকানীসহ ছোট-বড় প্রায় ৬ শতাধিক ব্যবসায়ির উপস্থিতিতে সপ্তাহের প্রতি বুধবারে কোটি টাকার লেনদেন হতো। কিন্তু বর্তমানে এই হাটটি বন্ধ থাকায় যেমনিভাবে ব্যবসায়িরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তার চেয়ে বেশি পরিবারে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন এলাকার প্রার্ন্তিক কৃষিজীবি মানুষগুলো। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা বলেছেন, বিগত সংসদ নির্বাচনের দিন থেকেই একটি মহল নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে বাজারটি বয়কট করতে স্থানীয় এলাকাবাসীদের নিষেধ করেছে। রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য যদি হয়, গণমানুষের কল্যাণ সাধন, তাহলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নেই কাজ করতে হয়। কিন্তু আমাদের এই অঞ্চলে একটি পক্ষ মানুষকে জিম্মি করে তাদের অধিকার হরণ করে চলেছে। এটা কোনো রাজনীতি হতে পারেনা।

নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান হাওলাদার বলেছেন, আমরা প্রতিটি মাসিক মিটিংয়ে এ ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি, সংশ্লিষ্ট্যদের অনুরোধ জানাচ্ছি যাতে করে নীরিহ গ্রামবাসীদের বাজারে আসতে দেয়, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাচ্ছিনা।

এদিকে, জেলার শহরের অদূরে মাত্র ৪৫ মিনিটের দূরত্বে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার হাট বসে সুবলং বাজারটিতে। বরকল উপজেলাধীন সুবলংয়ের এই সাপ্তাহিক হাটে কয়েক শতাধিক ব্যবসায়ির পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয়ে অংশ নেন কয়েক হাজার পাহাড়ি-বাঙ্গালী বাসিন্দা। ব্যবসায়িদের সাথে আলাপকালে জানাগেছে, কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হওয়া সুবলং বাজারটি বন্ধ হয়েছে গত জুন মাসের ২৭ তারিখ থেকে। সেদিন সুবলংয়ে আঞ্চলিকদল জেএসএস ও সংস্কারপন্থী জেএসএস) এই দুই গ্র“পের গুলি বিনিময়ে একজন নিহত হয়। এরপর থেকে উক্ত হাটটি বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে জানতে যোগাযোগ করলে বরকল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিধান চাকমা জানান, আমাকে হাট না বসার কোনো তথ্য কেউ দেয়নি। আমি বিষয়টি ভালোভাবে জানিও না। আমাকেতো ইউপি চেয়ারম্যান বলেছে যে, বাজার মিলছে। এক প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বিধান বলেন,কারো অধিকার ক্ষুন্ন হয়ে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করবে। তবেইতো সংশ্লিষ্ট্যরা দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিবে।

এভাবে যদি বাজারগুলোতে সাপ্তাহিক হাট বসা বন্ধ থাকে তাহলে পরিস্তিতি আরো চরম অবনতির দিকে ধাবিত হবে এমন মন্তব্য করে রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, বর্তমান চলমান আধুনিক বিশ্বের সাথে আমাদের দেশ এগিয়ে গেলেও আমরা পার্বত্যাঞ্চলবাসী এখনো পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির পাইপলাইনে ঢুকতে পারছিনা। পাহাড়ের চলমান সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারনে আমরা এগুতে পারছিনা। এমতাবস্থায় বাজারগুলোতে সাপ্তাহিক হাট না বসলে সার্বিক পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে ধাবিত হবে নিঃসন্দেহে।

অহরহ অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, বাজার বয়কট, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক সন্ত্রাসীর কারনে অত্রাঞ্চলের অর্থনীতিতে আঘাত হানা হচ্ছে। এটি আমাদের কারোই কাম্য হতে পারে না। এই সকল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না-নিলে ভবিষ্যতে এখানকার অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ ধারন করবে বলে মন্তব্য করে চেম্বার সভাপতি বলেন, আমরা ব্যবসায়ি নেতৃবৃন্দ মনে করছি, ক্ষমতাসীন দল ও সংশ্লিষ্ট্য প্রশাসন পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আরো জোরালো পদক্ষেপ নিক। আর স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার দিক উম্মোচন করুক। আমরা ব্যবসায়িরা প্রয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করবো।

রাঙামাটিতে উৎপাদিত পণ্যগুলোর অন্যতম হলো, বিভিন্ন প্রকার সবজি, আদা-হলুদ, ঝাঁড়– ফুল, আনারস, জাম্বুরা, আম-কাঁঠাল, লেবু-কমলাসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফল, বাঁশ, কাঠ ও মৎস্য সম্পদ। এসব পণ্য বিক্রি করার লক্ষ্যে প্রতিটি সাপ্তাহিক হাটে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয় পাহাড়িদের মাধ্যমে বাজারগুলোতে এসব পণ্য বিক্রি করা হয়। হ্রদ নির্ভর এই জেলার নদীপথেই অধিকাংশ হাট-বাজারগুলো পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই জেলার হাট-বাজারগুলোতে কয়েকহাজার ব্যবসায়ি লেনদেনের মাধ্যমে অত্রাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিজ পণ্য ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়ে বিক্রি করার ফলে সেসব অঞ্চলের বাজারগুলোকে স্থিতিশীল রাখছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাজার বয়কটের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রামের বড় বড় বাজারগুলোতেও এর প্রভাব পড়বে।