ব্রেকিং নিউজ

নকল ভোজ্য তেলসহ কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল খাদ্যে ভরপুর রাঙামাটির হাট-বাজারগুলো

॥ আলমগীর মানিক ॥

নানামুখি তৎপরতার পরও পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বন্ধ করা যাচ্ছে না কেমিক্যাল মিশ্রিত ভোজ্য তেল ও খাদ্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার উৎপাদন। আবার এসব খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। ভেতরে ভেজাল থাকলেও বাইরে থেকে বুঝার কোনো উপায় নেই। কেননা, বাহারী রঙে ও নান্দনিক ডিজাইনের প্যাকেটের ভেতরে এসব ভেজাল খাবার। শুধু বেকারী পণ্য নয়, বাজারে ভেজাল মসলা, সেমাই ও শিশু খাদ্যে যেনো ভেজালের অন্ত নেই। জেলার বাজারগুলোতে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে ক্ষতিকর পাউডার জাতীয় ক্যামিকেল মিশ্রিত শুটকি মাছ। এসব খাবার অত্রাঞ্চলের পাহাড়ি সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছে অতিপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিতি।

ফলে ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হিমসিম খাচ্ছে রাঙামাটির সংশ্লিষ্ট্য কর্তৃপক্ষ। প্রায় সাত লক্ষ জনসংখ্যা নির্ভর রাঙামাটি জেলায় অন্যান্য উপজেলাগুলোতে ভেজাল বিরোধী অভিযান অনেকটাই নিশ্চুপ অবস্থায় থাকে বছরের পুরোটা সময়। সারাদেশের ন্যায় রাঙামাটি জেলায়ও ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যের কাছে জিম্মি এখন মানুষ। এই জেলা শহরে নাম করা ফাষ্টফুডের দোকানগুলোতে বিদেশী কোম্পানীগুলোর বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে, যার অধিকাংশের গায়ে কোনো ধরনের ট্রেডমার্ক, আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা এবং খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআইয়ের গুনগত মান চিহ্ন নেই। এমতাবস্থায় ভোক্তাদের কাছে পৌছানো হচ্ছে নিন্মমানের এবং বিষাক্ত খাদ্য সামগ্রী।

ইতিমধ্যেই বিষয়টি নজরে আসায় রাঙামাটির ফুলকলি ও বনফুল থেকে আলামত সংগ্রহ করে তাদের প্রদত্ত তথ্যানুসারে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ি মুহাম্মদ শওকত আলী নূর, পিতা: মুহাম্মদ নুরুচ্ছফা, আলহাজ্ব ফারুক সালাম ম্যানসন(২য় তলা),১১/১২৪৮ আব্দুল হামিদ সড়ক, ষোলশহর, শোলকবহর-চট্টগ্রাম ও আরমান, পিতা: আব্দুল মান্নান, এমএ ট্রেডিং, হাজী ছাত্তার মার্কেট, পোষ্ট অফিস গলি, রিয়াজ উদ্দিন বাজার-চট্টগ্রাম এবং মোঃ মাসুদ, মাসুদ ব্রাদার্স, ফলমন্ডি, রিয়াজউদ্দিন বাজার, চট্টগ্রামকে আসামী করে রাঙামাটিস্থ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট এর বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর ৩২(ক) ধারায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মোছাঃ নাছিমা আক্তার খানম।

রাঙামাটির স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত এক কর্মকর্তার মতে, বাজারে যেসব পাউরুটি-বিস্কুট পাওয়া যায় তার অধিকাংশেই ছত্রাক থাকে। অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে তৈরি হয় বলে এসব খাদ্যে কৃমি জাতীয় পরজীবীও থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের হোটেলগুলোর তরকারি রং আকর্ষণীয় করতে জর্দার রং ও নানারকম কেমিক্যাল রং মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। রাঙামাটির হোটেলগুলোতে নোংরা পরিবেশে ময়লাযুক্ত ক্যামিকেল মিশ্রিত করে তৈরি করা মোগলাই-পরোটাসহ নাস্তা সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে অবাধে।

জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জেল-জরিমানা করেও ভেজাল এবং বিষাক্ত খাদ্যসামগ্রীর আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছে না। এমনকি বেশিরভাগ সয়াবিন তেল তৈরি হচ্ছে সাবান তৈরির পাম অয়েল দিয়ে। এসব সয়াবিন তেল অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে রাঙামাটির বিভিন্ন হাট-বাজারগুলোতে। অনগ্রসর উপজাতীয় সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছেই মূলত এসব ভেজাল সয়াবিন তেল ও ভেজাল সামগ্রী বিক্রি করছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ি। ইতোমধ্যেই রাঙামাটি শহরসহ কয়েকটি উপজেলায় বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালণা করে বড় বড় বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আর্থিক জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

রাঙামাটি শহরে দায়িত্বপালনরত স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মোছাম্মদ নাছিমা আক্তার খানম জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই তারা বিগত দেড় মাসে নয়টি মামলার নিষ্পত্তি করেছেন। আরো বেশ কয়েকটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করে সেগুলো থেকে আলামত সংগ্রহ করে ঢাকাস্থ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট আসা মাত্রই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মামলার পূর্নাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।

স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আরো জানান, রিজার্ভ বাজারের লঞ্চঘাট এলাকার একটি দোকানে চিংড়ি, ডবল ডলফিন নামক নকল স্টিকার লাগিয়ে সরিষার তেল বিক্রি করার সময় অভিযান পরিচালনা করে সংশ্লিষ্ট্য ব্যবসায়ি বিজয় দাশকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে রাঙামাটিস্থ বিজ্ঞ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এর ৩৩ ও ৩৯ ধারায় উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরে এই মামলায় আদালত অভিযুক্ত ব্যবসায়িকে এক লাখ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত করেন। গত ২২/০৮/২০১৯ ইং তারিখে এই মামলা দায়ের করা হয়। একইদিনে রিজার্ভ বাজারের অপর ব্যবসায়ি দিলীপ দেওয়ানজীর বিরুদ্ধেও আরেক মামলা দায়ের করেন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নাছিমা আক্তার খানম।

এই ব্যবসায়িও চট্টগ্রাম থেকে খোলা বাজারের ভেজাল তেলভর্তি ড্রাম রাঙামাটিতে এনে চিংড়ি, সূর্যমুখী, ডাবল ডলপিন নামীয় ষ্টিকার লাগিয়ে সয়াবিন ও সরিষার তেল বোতলজাত করে খোলা বাজারসহ সাপ্তাহিক হাট-বাজারগুলোতে বিক্রি করছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভেজাল বিরোধী অভিযানের মাধ্যমে রিজার্ভ বাজারের তালুকদার ভবনের একটি ফ্লোর থেকে তাকে আটক করা হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এর ৩৩ ও ৩৯ ধারায় উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় বিজ্ঞ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট এর বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত কর্তৃক তিন লাখ টাকার আর্থিক দন্ড প্রদান করা হয়।

গত ০১/০৯/২০১৯ ইং তারিখে রাঙামাটি শহরের বনরূপা বাজারের কাশবন রেস্তোরায় অভিযান চালিয়ে নোংরা ময়লাযুক্ত জিনিসপত্র দিয়ে পরোটা ও মোগলাই বানানোর অপরাধে উক্ত রেস্তোরার বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এর ৩৩ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মালিককে তিন লাখ টাকা জরিমানার আদেশ প্রদান করেন রাঙামাটিস্থ বিজ্ঞ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট এর বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত কর্তৃপক্ষ। একই দিন বনরূপা বাজারের ক্যাফে মালঞ্চ ফাষ্টফুডের দোকানে অভিযান পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটিতে তাদের নিজস্বভাবে উৎপাদিত দধি, পাউরুটি প্যাকেটের গায়ে কোনো প্রকার মেয়াদ এর তারিখ উল্লেখ না থাকায় নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর ৩২(গ) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় উক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিককে দুই লাখ টাকার অর্থদন্ডে দন্ডিত করেন আদালত।

এর আগে শহরের রিজার্ভ বাজারের বনকলি বেকারীতে অভিযান চালিয়ে খাদ্যের প্যাকেটের গায়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য লিখার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এর ৩২ এর(খ) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে আদালত বনকলিকে দুই লাখ টাকা অর্থদন্ড প্রদানের আদেশ প্রদান করেন। একই দিনে তবলছড়ি বাজারের শাহেনশাহ হোটেল এ অভিযান পরিচালণা করে খোলামেলা পরিবেশে রাস্তার ধূলোবালি ও ময়লা মিশ্রিত অবস্থায় খাদ্যসামগ্রী বানানোর অপরাধে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এর ৩৩ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলাটিতে আদালত তিন লাখ টাকা জরিমানার আদেশ প্রদান করেন।

শহরের বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিকর পদার্থের মধ্যে খাদ্য সামগ্রীতে আরও ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাকারিন, মোম, ট্যালকম পাউডার, যানবাহনে ব্যবহৃত মবিল, সোডা, আটা-ময়দা, সুগন্ধি। ভেজাল মসলা উৎপাদনকারীরা গুঁড়া মরিচের সঙ্গে মেশাচ্ছেন ইটের গুঁড়া।

রাঙামাটির বিভিন্ন হাট-বাজারগুলোতে বাজারজাত হওয়া বেশিরভাগ খাদ্যপণ্যেই ভেজাল এবং সেসব খাদ্যপণ্য দেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। হাট-বাজারগুলোতে ভেজালমুক্ত খাদ্য সামগ্রী পাওয়াটাই কষ্টকর। একের পর এক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে নানা অঙ্কে আর্থিক জরিমানা করেও এসব অসাধু ভেজাল কারবারীদের ভেজাল ব্যবসা বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। তাই, ভেজাল প্রতিরোধে ভোক্তা ও সুশীল সমাজের লোকজনের দাবী এসব ভেজাল কারখানা সিলগালা ও অসাধু ব্যবসায়ীদেরকে বড় ধরণের আর্থিক জরিমানাসহ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।

রাঙামাটি শহরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট্য স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নাছিমা আক্তার খানম বলেন, ভেজাল খাবার উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমেসহ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট স্যারদের সহযোগিতায় অভিযান চলছে। ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।